Published : 10 May 2026, 07:14 PM
স্বামীর ‘সন্দেহপ্রবণতার’ কারণে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিহত শারমিন আক্তারের সংসারে নানা অশান্তি থাকলেও তিন মেয়ের জন্য সব সহ্য করে নিতেন বলে জানিয়েছেন তার বড় বোন ফাতেমা।
রোববার সকালে তিন মেয়ে ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে শারমিনের মরদেহও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়ার এসে পৌছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।

বাড়িতে আহাজারি করতে করতে ফাতেমা বলেন, “ফোরকান (শারমিনের স্বামী) অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। শারমিনের হাতে মোবাইল পর্যন্ত রাখতে দিত না। সংসারে অশান্তি থাকলেও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে শারমিন সবকিছু সহ্য করত।”
ফাতেমা বেগমও গাজীপুরে থাকেন। শারমিন ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর তাঁর বাসায় বেড়াতে যেতেন। তখন শারমিন প্রায়ই স্বামীর আচরণ নিয়ে কষ্টের কথা বলতেন বলে জানান তিনি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে ফোরকান মিয়ার সঙ্গে শারমিনের বিয়ে হয়। ফোরকান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভাড়ায় প্রাইভেট কার চালিয়ে সংসার চালাতেন।
বিয়ের পর কয়েক বছর ঢাকায় বসবাস করলেও ছয় মাস আগে তারা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় রাউৎকোনা গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকা শুরু করেন।
শনিবার সকালে বহুতল সেই বাড়ি থেকেই পাঁচজনের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তারা হলেন, শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন মেয়ে- মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২৩)।
বিভিন্ন আলামত ও স্বজনদের ভাষ্য থেকে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ‘পারিবারিক কলহের’ জেরে গৃহকর্তা ফোরকান এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।
কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম বলেন, শুক্রবার রাতের কোনো এক সময়ে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। ‘হত্যাকাণ্ডের পর’ পালিয়ে যাওয়া ফোরকান চাচাতো ভাই আবু মুসা ও শারমিনের ভাই জব্বার আলীকে ফোন করে ঘটনা জানান। স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ দেখতে পান এবং পুলিশকে জানান।
পরে এ ঘটনায় ফোরকানের নাম উল্লেখে অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারজনকে আসামি করে শনিবার রাতে কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা করেছেন শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন।
শাহাদাত হোসেন মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার আগের দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে মেয়ে শারমিন তাঁকে ফোন করেছিল। শারমিন তাকে বলেছিল- ‘আব্বা, আমরা ২৪ মে বাসা ছেড়ে চলে আসব।’
শাহাদাত হোসেন বলেন, শনিবার সকালে ফোরকানের ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে দ্রুত শারমিনের বাসার খোঁজ নিতে বলেন। এরপর তিনি বড় মেয়েকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিছুক্ষণ পর মেয়ের কাছ থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমার মেয়ে-ছেলে, নাতনিদের জীবন শেষ করে দিয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় সবাই

হত্যাকাণ্ডের শিকার একই পরিবারের এ পাঁচজনকে গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়ি পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।
রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিহত পাঁচজনের মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর পর একনজর দেখতে সবাই ভিড় করেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
সকালে সরেজমিনে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশের ওই গ্রামে দেখা যায়, গ্রামে মাতম চলছে। বাড়ির পাশে ছোট সড়কে মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা। পাশের মেহগনিবাগানে পৃথক মশারি টানিয়ে নারী ও পুরুষের মরদেহ গোসল করানো হচ্ছে।
অন্যদিকে বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খোঁড়া হয়েছে। কবরস্থানের প্রবেশপথে বাঁশ কাটতেও দেখা গেল কয়েকজনকে।
এ সময় প্রতিবেশী জগগুল মোল্লা, সাবিনা বেগমসহ কয়েকজন হত্যাকাণ্ডের জন্য নিহত শারমিনের স্বামীকে দায়ী করে প্রশ্ন তোলেন, ‘বাবা হয়ে কীভাবে সন্তানদের হত্যা করতে পারে?’
পরে রোববার বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচজনকে দাফন করা হয়।
আগের সংবাদ
গাজীপুরে ৫ খুনের ঘটনায় মামলা দায়ের
গাজীপুরে ৫ খুন: 'সবাই ভেবেছিল রসুলের ফোনে হয়ত চার্জ নেই'
গাজীপুরে ৫ খুন: যা আছে 'সন্দেহভাজনের খসড়া অভিযোগে'
গাজীপুরে এক পরিবারের ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা, গৃহকর্তা পলাতক