Published : 06 Dec 2023, 09:39 PM
ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন ২ হাজার ৪২ শতাংশ কৃষি জমির মালিক বলে মনোয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, যা ৬২ বিঘার কাছাকাছি।
এ আসনের সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের কাজী জাফর উল্যাহর সঙ্গে গত কয়েকদিন ধরে যে বাগযুদ্ধ চলছে, সেখানে নিক্সন দাবি করেছিলেন, তার জমির পরিমাণ দুই হাজার বিঘা।
আর আগে জাফর উল্যাহ দাবি করেছিলেন, ২০১৪ সালে প্রথমবার নির্বাচন করার সময় নিক্সনের কোনো কৃষিজমি ছিল না এই নির্বাচনি এলাকায়, কিন্তু এখন তার ১১০০ বিঘা জমি আছে।
জমির পরিমাণ নিয়ে এই পার্থক্যের বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিক্সনের বক্তব্য জানতে পারেনি। একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা কেটে দেন। বিষয় উল্লেখ করে এসএমএস পাঠানো হলেও জবাব আসেনি।
নিক্সনের বাড়ি মাদারীপুরে, তার বড় ভাই নুরে আলম চৌধুরী লিটন ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়া প্রতিটি নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে আসছেন। বর্তমান সংসদের চিফ হুইপও তিনি।
নিক্সন চৌধুরী ২০১৪ সালে ফরিদপুর-৪ আসনে মনোনয়ন চান। না পেয়ে তিনি নৌকার প্রার্থী জাফর উল্যাহর বিরুদ্ধে ভোটে অংশ নেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে; জিতেও যান। পরের নির্বাচনেও একই চিত্র।
দুইবারের সংসদ সদস্যকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতার পদ দেওয়া হয় ২০২০ সালে। কিন্তু এবারও জোটেনি মনোনয়ন। আবার সেখানে নিক্সন চৌধুরী ও জাফর উল্যাহর লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত।
ভোটের লড়াইয়ের আগে শুরু হয়েছে কথার লড়াই, সেখানে কার কত সম্পদ তা নিয়ে একে অপরকে করা হচ্ছে আক্রমণ।
তবে নিক্সনের সম্পদ কত, সেই বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা দিয়েছেন, সেখানে গত ১০ বছরের তুলনারও সুযোগ মিলেছে।
তুলনা করে দেখা যায় দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে তিনি যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেই তুলনায় এবার ফ্ল্যাট, প্লট ও কৃষি জমি বেড়েছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর দাখিল করা হলফনামায় স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট দেখিয়েছিলেন নিক্সন। তবে নিজের নামে কোনো ফ্ল্যাট বা প্লট সে সময় দেখানো হয়নি।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে গত ২৮ নভেম্বর দাখিল করা হলফনামায় রাজধানীর বনানীতে দুটি ও গুলশানে দুটি ফ্ল্যাট আর ঢাকার পূর্বাচল, আদাবর ও শিবচর হাউজিংসহ চারটি স্থানে প্লট থাকার তথ্য দিয়েছেন নিক্সন।
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় একজন প্রার্থীকে আট ধরনের তথ্য দিতে হয়। সেগুলো হলো- শিক্ষাগত যোগ্যতা, অতীতে কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ড ছিল কি-না, বর্তমানে কোনো মামলা আছে কি-না। এর পাশাপাশি নিজের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদের হিসাবও জমা দিতে হয়।
হলফনামায় অনুযায়ী, দুইবারের এমপি নিক্সনের লেখাপড়ার গণ্ডি মাধ্যমিক পর্যন্ত। তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। তবে অতীতে তার বিরুদ্ধে যেসব ফৌজদারি মামলা ছিল, সেগুলো নিস্পত্তি হয়েছে।
১০ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালের হলফনামায় তার মালিকানাধীন কৃষি জমির পরিমাণ ৩৮ শতাংশ উল্লেখ ছিল। এবার জানানো হয়েছে জমির পরিমাণ ২ হাজার ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ বেড়েছে ২ হাজার ৪ শতাংশ।
এই হিসাবে নিক্সনের কৃষি জমি আসলে ৬১ দশমিক ৮৭ বিঘা।
এই জমির মধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গার আজিমনগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় ৯৭৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৫১০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ, ২৩৪ শতাংশ, ২৯০ শতাংশের প্লট আছে। ঢাকার সাভারে ৩ দশমিক ২৮২৫ শতাংশ জমির মালিকও তিনি।
নিক্সন যে অকৃষি জমি দেখিয়েছেন, তার মধ্যে ৫ কাঠার প্লট আছে মাদারীপুরের শিবচর হাউজিংয়ে, দত্তপাড়ায় ০.৩৮ একর, ঢাকার পূর্বাচল রাজউক ৭.৫ কাঠা এবং আদাবরে ০.০১২১৫ একর।
২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বরের দশম সংসদ নির্বাচনে নিক্সনের দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, কৃষিখাতে আয় হতো ২ কোটি ৫ লাখ টাকা। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত ছিল ২ কোটি ১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯৩ টাকা।
নিজের নামে সে সময় নগদ অর্থ দেখিয়েছিলেন ২৮ লাখ ১০ হাজার ২২০ টাকা। তবে স্ত্রী নামে অর্থ দেখানো হয়নি। এবার দেখিয়েছেন ১ কোটি ৫২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা।
তখন তিনি অকৃষি জমির পরিমাণ দেখিয়েছেন ১৭ দশমিক ১০ কাঠা। স্ত্রীর নামে ছিল ৭ দশমিক ৫ কাঠা আর স্বর্ণ ছিল ২৫ তোলা। স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন নিক্সন।
২০১৩ সালে কৃষি খাতে নিক্সনের আয় দেখানো হয় ২ কোটি ৫ লাখ টাকা। এবার তা দেখানো হয় ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তিনি নিজের নামে ব্যাংক ঋণ দেখিয়েছেন ১৬ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৮ টাকা।
নিক্সনের হলফনামায় নগদ ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ টাকা, ব্যাংকজমা ৭ লাখ ৪৫ হাজার ২৫৯ টাকার উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া স্বর্ণলাকার রয়েছে ৩০ তোলা, স্ত্রীর রয়েছে ৫০ তোলা।
এর আগে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চারটি প্রতিশ্রুতির কতভাগ পূরণ করেছেন, সেটিও উল্লেখ করেছেন হলফনামায়।
এর মধ্যে জননিরাপত্তার শতকরা ৭২ শতাংশ, সেতু, কালভার্ট, রাস্তা পাকাকরণের প্রতিশ্রুতির ৭৯ শতাংশ, বিদ্যুতায়ন ও সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতিশ্রুতির ৯৫ শতাংশ ও স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মন্দির (অবকাঠামোগত) ৮৫ শতাংশ পূরণের কথা দাবি করেছেন।
আরও পড়ুন:
যুবলীগের পদে এলেন নিক্সন চৌধুরী
গণমাধ্যমে বেশি লেখে বলেই শোকজ দেওয়া হয়েছে: নিক্সন চৌধুরী
ওই অডিও ‘সুপার এডিটেড’: নিক্সন চৌধুরী