Published : 13 Aug 2025, 06:07 PM
বরেণ্য বুদ্ধিজীবী যতীন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেত্রকোণায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সেখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী নেত্রকোণা জেলা সংসদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ময়মনসিংহ থেকে যতীন সরকারের মরদেহ প্রথমে সরাসরি তার বাসস্থান শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ‘বানপ্রস্থে’ যাবে। সেখানে পরিবার ও স্বজনদের শ্রদ্ধার নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এই বাড়িতেই তিনি আড়াই দশকের বেশি সময় বসবাস করেছেন।
এরপর সেখান থেকে রাত ৮টায় যতীন সরকারকে নিয়ে যাওয়া হবে নেত্রকোণা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে নেত্রকোণাবাসীর পক্ষ থেকে তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো হবে। শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ময়মনসিংহ ও ঢাকা থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরা এই শিক্ষাগুরুর প্রতি তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।
এরপর রাত ১১টায় বারহাট্টা রোডে নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য হবে। পরিবার, স্বজন ও সুহৃদদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান উদীচী জেলা সভাপতি।
প্রগতিশীল বাম ধারার বুদ্ধিজীবী, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, শিক্ষক যতীন সরকার বুধবার বিকাল পৌনে ৩টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এ তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সভাপতি এমদাদুল হক মিল্লাত জানান, ৮৯ বছর বয়সী যতীন সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। এর মধ্যে গত জুন মাসে পড়ে গিয়ে উরুর হাড়ে আঘাত পান। ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত সপ্তাহেরই তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

যতীন সরকার দুই মেয়াদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ বিকাল ৪টা থেকে উদীচীর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ময়মনসিংহ শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও অসংখ্য মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। যতীন সরকারের কর্ম-রাজনীতি-সাংগঠনিক তৎপরতার প্রায় পুরোটা জীবন কেটেছে এই শহরকে কেন্দ্র করেই। প্রায় ছয় দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা, বক্তৃতায় মোহবিষ্ট করার দক্ষতার কারণে তিনি এই জনপদের সব ধরনের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং এক ‘অবিস্মরণীয়’ চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন।
১৯৩৬ সালের ১৮ অগাস্ট নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে যতীন সরকারের জন্ম। আর্থিক অনটনের কারণে শিক্ষা জীবন টেনে নিতে কৈশোর থেকেই তাকে টিউশনসহ নানা কাজে যুক্ত হতে হয়েছে।
নেত্রকোণা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যতীন। পরে ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহে গিয়ে ভর্তি হন আনন্দমোহন কলেজে।
বিএ পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন নেত্রকোণার আশুজিয়া হাইস্কুলে। বারহাট্টা সিকেপি পাইলট হাই স্কুলেও পড়িয়েছেন কিছুদিন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সেখান থেকে এমএ পাস করে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর হাই স্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন যতীন সরকার। ১৯৬৪ সালে বাংলার প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে।

১৯৬৭ সালে কানন আইচের সঙ্গে যতীন সরকারের সংসার জীবনের শুরু হয়। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে তাদের।
পঞ্চাশের দশকে কমরেড জ্যোতিষ বোস ও অজয় রায়ের কাছ থেকে মার্কসবাদের দীক্ষা পাওয়া যতীন সরকার ২০০৭ সালে সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেছিলেন। ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবেরও সদস্য ছিলেন তিনি।
ময়মনসিংহে তার ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও একজন মানবতাবাদী লেখক, প্রাবন্ধিক ও সাম্যবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে তিনি গুরুত্ব পেতে শুরু করেন ১৯৯০ এর দশকে।
১৯৮৫ সালে তার প্রথম বই ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ যখন প্রকাশিত হল, বয়স তখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে।
২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃতু-দর্শন’ যতীন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তার ‘বাংলাদেশী কাবি গান’।
‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘সংস্কৃতির সংগ্রাম’, ‘মানবমন, মানবধর্ম ও সমাজবিপ্লব’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান-চেতনা’, ‘সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার’, ‘সাহিত্য নিয়ে নানাকথা’ তার প্রকাশিত আড়াই ডজন বইয়ের অন্যতম।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ বই 'প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা'।
তার লেখায় পুরান আর দর্শন মিলে মিশে গেছে, রবীন্দ্র-নজরুলের মানবতাবাদ আর মার্কসবাদকে তিনি মিলিয়েছেন লৌকিক জীবনের সঙ্গে।
তার রচনায় রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষণ যেমন আছে, তেমনি আছে বিস্মৃতপ্রায় সাহিত্যকে নতুন করে উপস্থাপনের সফল প্রচেষ্টা।
২০০৮ সালে তিনি গবেষণা ও প্রবন্ধের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০১০ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
এছাড়া ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, মনিরুদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা সম্মাননায় তিনি ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।
চার দশকের বেশি সময় শিক্ষকতা করার পর ২০০২ সালে নাসিরাবাদ কলেজ থেকে অবসরে যান যতীন সরকার। ২০০৫ সালে স্ত্রীকে নিয়ে নিজ জেলা নেত্রকোনায় ফিরে যান। শহরের সাতপাই এলাকার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তার শেষকৃত্য হবে।