Published : 12 Mar 2026, 06:03 PM
ইফতারের সময় শেরপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী মাইসাহেবা জামে মসজিদে মিলনমেলা বসে; যেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে ইফতার করেন।
দশ বছর ধরে রোজার মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ এখানে একসঙ্গে ইফতার উপভোগ করেন। কখনও কখনও এ সংখ্যা আটশ থেকে এক হাজার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।
এখানে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, দিনমজুর, আইনজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অটোরিকশা চালক, ভিক্ষুক, পথচারী, সাংবাদিক ও ফকির-মিসকিনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে বসে ইফতার সারেন। যোগ দেন মসজিদের খতিব ও ইমাম এবং মসজিদ কমিটির সদস্যরাও।
ইফতারের আগে রোজা কবুলের জন্য দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সুশৃঙ্খল পরিবেশে প্রতিদিন নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইফতার পরিবেশনের কাজ পরিচালিত হয়।
মাইসাহেবা জামে মসজিদে গত দশ বছর ধরে ইফতার খাওয়ানোর কাজ ধারাবাহিকভাবে চলছে বলে মসজিদ কমিটির সহকারী কোষাধ্যক্ষ ও ইফতার পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ঈমান আলী হীরা জানান।
তিনি বলেন, “এটা পুরো রোজার মাসে চলে। মসজিদ কমিটির সদস্যরা নিজেদের অর্থ দিয়ে এ কাজে অংশগ্রহণ করেন। তবে ইচ্ছুক যে কেউও এতে সহযোগিতা করতে পারে।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদের দোতলার বিশাল জায়গায় এ আয়োজন করা হয়। ইফতারের আগে রোজাদাররা সারিবদ্ধভাবে বিশুদ্ধ পানির বোতল নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। এরপর ইফতার সামগ্রী দিয়ে সাজানো থালা হাতে নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বসে পড়েন।
মসজিদ কমিটির সহকারী কোষাধ্যক্ষ ঈমান আলী হীরা বলছিলেন, “প্রতিদিন গড়ে প্রায় ছয় শতাধিক রোজাদার এখানে ইফতার করেন।
“মসজিদ কমিটির সদস্য ও মসজিদের স্টাফ এবং মুসল্লিরা সবাই মিলে রোজার মাসের ইফতারির সেবা পর্যায়ে কাজটি দক্ষতা সঙ্গে করেন।”
মসজিদের সাত সদস্যের ইফতার আয়োজন উপ-কমিটি ও মসজিদের কর্মীসহ অন্তত ২০ জন এই কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।
ইফতারের পদের মধ্যে থাকে পেঁয়াজু, বেগুনি ও সবজি খিঁচুড়ি। এসব রান্না ও অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য সজিদ প্রাঙ্গনে একটি রান্নাঘর স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে দুজন বাবুর্চিসহ চারজন দায়িত্ব পালন করেন।
রান্নার কাজে নিয়োজিত বাবুর্চি আবুল কালাম আজাদ বলছিলেন, “দশ বছর ধরে এই মসজিদের ইফতার আয়োজনের কাজ করছি। এ কাজ করে আমি তৃপ্তি পাই।”
বাবুর্চি মকবর আলী বলেন, “পয়সার স্বার্থে না আল্লাহর ঘরে কাজ করে খুশি থাকার জন্যেই আমরা এ কাজ করছি”
তাদের সাহায্যকারী মোহাম্মদ খোকন মিয়া বলেন, “বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ মাই সাহেবা জামে মসজিদ। এখানে কাজ করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
“ইফতারির সালাদ কাটা, থালা ধোয়া, সবজি খিচুড়ি মসজিদের দোতলায় তোলা সব ধরনের কাজ করছি। এতে খারাপ লাগে না বরং আনন্দ এবং তৃপ্তির সঙ্গে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “এই মসজিদে ইফতারের কোনো অভাব হয় না। মসজিদ কমিটির সদস্যরা ছাড়াও মসজিদের ভক্তরা ইফতারের আয়োজনে অংশ নিয়ে থাকেন।
“এছাড়া অনেক সময় বাইরে থেকে অনেক ভক্ত ইফতার সামগ্রী পাঠিয়ে দেন।”
মসজিদ কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইফতার পরিচালনা উপ-কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমাম হোসেন ঠান্ডু বলেন, “১৮৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী মাই সাহেবা জামে মসজিদের ইতিহাস ঐতিহ্য রয়েছে। দশ বছর ধরে এই এখানে ইফতার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে। এখানে কোনো ভেদাভেদ নাই।
তিনি বলেন, “এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের পথচারী, দোকানদার ও শ্রমজীবী মানুষ সুবিধার্থে ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। মসজিদ কমিটির সদস্যরাই আয়োজন করেন।”
মসজিদে ইফতার করতে আসা ঠেলা গাড়ি চালক মোস্তফা বলেন, “বড় পরিসরে সবাই মিলে ইফতারের আগে দোয়া এবং ইফতার শেষে নামাজ আদায় করে। সবকিছু মিলায় এখানে যে পরিবেশে সৃষ্টি হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
অটোরিকশা চালক আবুল কাশেম বলছিলেন, “আল্লাহর রহমতে অন্যরকম এক ধরনের অনুভূতি এখানে কাজ করে।”
মসজিদের খাদেম ও খতিব মুফতি আকরাম হোসেন শেরপুরি বলেন, “এটা আমাদের মসজিদ কমিটির বড় উদারতার একটি নজির। এখানে প্রতিদিন ৬০০ থেকে শুরু করে ৮০০ এমনকি কখনো এক হাজার জনও ইফতার করেন।”