১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছি, এসআইকে জ্বালিয়েছি’ বললেন বৈষম্যবিরোধী নেতা

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানা থেকে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে ওসির সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে এই হুমকি দেন তিনি।

‘বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছি, এসআইকে জ্বালিয়েছি’ বললেন বৈষম্যবিরোধী নেতা
ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Jan 2026, 05:32 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:29 PM

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় গিয়ে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার বিরুদ্ধে। 

শুক্রবার দুপুরে শায়েস্তাগঞ্জ থানা থেকে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে ওসির সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে এই হুমকি দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান। 

এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।  

এক মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভেতরে ওসি মো. আবুল কালামের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন মাহদী হাসান। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিল। 

এসময় নিজেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা দাবি করে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, “আমার পরিচয়টা দিই আমি এই মুভমেন্টে আমি হবিগঞ্জ জেলার প্রধান সমন্বয়ক ছিলাম। আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের বর্তমান সেক্রেটারি।” 

তিনি বলেন, “আমি স্ট্রিক্টলি এখানে এসেছি, আমাকে বলতে হবে আমার ভাইকে কেন গ্রেপ্তার করা হল?  এবং কেন বার্গেনিং করা হলো? আমার এতগুলো ছেলে এখানে কি ভাইসা আসছে নাকি?” 

তিনি আরও বলেন, “এখানে আমার ১৭ জন ভাই শহীদ হয়েছে। আমরা বানিয়চং থানাকে পুড়িয়েছিলাম। তার প্রতিবাদে আমাদের ভাইদেরকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হবিগঞ্জের ছেলে আমরা এখানে দাঁড়ায়ে আছি।”

“আপনি এটার কি মিনিং আমি বুঝি নাই। আমি বুঝতে এসেছি। হবিগঞ্জে ঘুম থেকে উঠে যা পেয়েছি তা পরে চলে এসেছি। আপনি আমাকে বুঝান এটা আসলে। যে এই কথা আপনি কেন বলেছেন? যে আন্দোলনকারী হয়েছে তো কি হয়েছে? ও ডেভিল ছিল।”

এ সময় ওসি কমিটি নিয়ে কিছু বলতে চাইলেও তার কথা কেড়ে নিয়ে মাহদী হাসান বলেন, “আপনি কমিটিতে দেখেছেন, আপনি কি মানে এই ছবি ভিডিও দেখেন নাই? এতগুলো পাঠানো হয়েছে- আপনি দেখেন নাই। সার্কেল ওসি পাঠায় নাই, আমি পাঠাই নাই।”

তিনি বলেন, “আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের গভর্নমেন্ট এখানে ফর্ম করছে। আমরা আমরাই গভমেন্টকে ফর্ম করেছি। ওই জায়গা থেকে আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছেন, আবার আপনি আমাদের সাথে বার্গেনিং করতেছেন এবং বলতেছেন যে আন্দোলনকারী হয়েছে কি হয়েছে?” 

এ সময় পাশ থেকে কেউ মাহদী হাসানকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে থামাতে চাইলেও তিনি বলেন,  “১৭ জন ভাই আমি জানিনা কাদের কি পরিচয়। আমাদের এখানে ১৭ জন শহীদ হয়েছে এবং হবিগঞ্জে মোস্ট, যেখানে সবচেয়ে ক্রুশাল ইম্পর্টেন্ট আন্দোলন হয়েছে এটা হবিগঞ্জ এদের মাঝে একটা।  

“বানিয়াগঞ্জ থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম।” 

“ওই জায়গা থেকে কোন সাহসে নিয়ে এই কথাটা বলল, আমি জানতে চাই আজকে। আমি এখানে এসছি, আমি স্ট্রিক্টলি এখানে এসছি। আমার বলতে হবে আমার ভাইকে এখানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কেন বার্গেনিং করা হলো? আমার এতগুলো ছেলে এখানে কি ভাইসা আসছে নাকি?”

এর আগে শুক্রবার ভোরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হাসান নয়নকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।  পরে তাকে ছাড়িয়ে আনতে নেতাকর্মীদের নিয়ে থানায় হাজির হন মাহদী হাসান।

এক পর্যায়ে সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শহিদুল হক মুন্সীর মধ্যস্থতায় এনামুল হক নয়নকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে মাহদী হাসান বলেন, “এনামুল হাসান নয়ন ইতিপূর্বে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের সময় দল থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে সম্মুখ সারিতে লড়াই করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “শুরুতে তারা থানার ওসিকে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য বললেও তিনি গুরুত্ব দেননি। পরবর্তীতে সহকারী পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় এনামুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়।”

বানিয়াচং থানা পুড়িয়ে দেওয়ার বক্তব্যে বিষয়ে তিনি বলেন, “ওসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার মুখ ফসকে একটি স্লিপ হয়েছে, এতে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।” 

এ ব্যাপারে ওসি আবুল কালাম বলেন, “এনামুল হাসান নয়ন শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিল। ভোরে তাকে আটক করা হয়। পরে বৈষম্যবিরোধী নেতৃবৃন্দ এনামুল হাসান নয়নের জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার ছবি ও ভিডিও দেখালে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। ”

জুলাই আন্দোলন চলার সময় হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার জেরে ৫ অগাস্ট প্রায় ১০ ঘণ্টা থানা ঘেরাও করে রাখেন স্থানীয় জনতা। পরে রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে পুলিশের এসআই সন্তোষকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ থানার সামনে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরদিন দুপুরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে।

মাহদী হাসানের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত

এদিকে, এ ঘটনায় মাহদী হাসানের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় বৈষম্যবিরোধি ছাত্র আন্দোলন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

 শনিবার দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেইসবুক পাতায় দেওয়া এ নোটিশে বলা হয়, “গত ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মাহদী হাসানের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ওই বক্তব্যগুলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জনপরিসরে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে বলে কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করে।

এর প্রেক্ষিতে আজ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানোর নোটিশে মাহদী হাসানকে তার বক্তব্য প্রদানের কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে লিখিত জবাব আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি রিফাত রশিদ বরাবর দপ্তরের মাধ্যমে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ”