Published : 22 Jul 2026, 12:19 AM
হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের এক মাস পার হলেও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ইউনিটে নতুন নতুন রোগী আসছে প্রতিদিন।
মঙ্গলবার যে ৪৮ শিশু সেখানে ভর্তি ছিল, তাদের মধ্যে টিকা পেয়েছে মাত্র ছয়জন টিকা; যা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না চিকিৎসকরা।
হাসপাতালে শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, “হাম আইসোলেশন ইউনিটে এখন যারাই আসছে তাদের বেশিরভাগই টিকা নেয়নি বা পায়নি। অভিভাবকরা কেউ বলছেন তারা পায়নি, কেউ বলছেন নেয়নি।
“কিন্তু টিকা না নেওয়ার সংখ্যাটা যদি এরকমই থাকে তাহলে সংক্রমণ হার কমবে না। এই অবস্থায় টিকা নেওয়া অনেকেই আক্রান্ত হতে পারে আবার।”

মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, “যারা পায়নি তারা আবার কীভাবে টিকা পাবে সে বিষয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। কুমিল্লার দেবিদ্বার, মুরাদনগর, চান্দিনা এলাকায় আবারও টিকাদান কর্মসূচি দেওয়া প্রয়োজন।”
চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট তিন হাজার ৪০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। ল্যাব পরীক্ষায় ৪৯৬ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩ জন এবং হামে আক্রান্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট দুই হাজার ৫৮৬ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এবং দুই হাজার ৫১৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
মঙ্গলবার হাম আইসোলেশন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, আট মাস বয়স থেকে শুরু করে ১১ মাস বয়সী শিশুরা হামের উপসর্গ কিংবা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
কম বয়সী শিশুদের অবস্থা নাজুক। একই সঙ্গে নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত শিশুদের অতিরিক্ত অক্সিজেন দিতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, বেশিরভাগের বাড়ি মুরাদনগর, দেবিদ্বার ও চান্দিনা উপজেলায়। এই তিন উপজেলায় শুরু থেকেই সংক্রমণ বেশি ছিল।
মুরাদনগর উপজেলার ছোট আলীর চর এলাকার কৃষক মনির হোসেনের ১১ বছর বয়সী মেয়ে মারুফা আক্তার আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি।
মনির বলেন, তার মেয়ে জীবনে কোনোদিন কোনো টিকা নেয়নি। এমনকি জন্মের পর বাধ্যতামূলক টিকাগুলোও তার দেওয়া হয়নি। এখন হামে আক্রান্ত হওযার পর মেয়ের অবস্থা খুবই খারাপ।
সময়মত মেয়ের টিকা না নেওয়ায় নিজেকে দোষারোপ করছেন মনির হোসেন।
একই উপজেলার রাজনগর এলাকা থেকে এসেছেন গৃহবধূ খাদিজা আক্তার। তার ১৪ মাস বয়সী শিশু তাসনিয়া হামে আক্রান্ত।
খাদিজা বলেন, “টিকা দিয়েছে তখন শুনেছি, কিন্তু টিকা নেওয়া হয়নি। আর আমাদের গ্রামে টিকা দিতে যায়নি কেউ। এজন্য উপজেলাতে গিয়ে আর টিকা দেওয়া হয়নি।”
নাঙ্গলকোট পৌরসভার হরিপুর থেকে আসা গৃহবধূ স্বর্ণা আক্তার বলেন, “আমার মেয়ে শেফা আক্তারের বয়স চার বছর। জ্বর, কাশি-সর্দিতে আক্রান্ত হওয়ায় প্রথমে তাকে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে সেখান থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে।”

স্বর্ণা আক্তার বলেন, “এক মাস আগে যখন টিকা দিয়েছে তখন নিতে পারিনি। এখন টিকা দেব, কিন্তু কোত্থেকে দেব সেটাও জানি না।”
এদিকে যেসব শিশুরা টিকা পায়নি কিংবা টিকা নিতে পারেনি তাদের অভিভাবকরা বলছেন, সরকারিভাবে আবার কোনো কর্মসূচি দিলে বাদ পড়া শিশুরা টিকা নিতে পারবে।
অনেকেই অসুস্থতা কিংবা অসচেতনতার কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তারাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে, ফলে সংক্রমণ ততটা কমছে না।
দেবিদ্বার থেকে আসা পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর বাবা রাজিব মিয়া বলেন, “আমার মেয়ে ভালো হলেই আমি টিকা দিতে চাই। আমি চাই, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকার মজুদ থাকুক। যেন বাদ পড়া শিশুরা যেকোনো সময় টিকা নিতে পারে।”
জেলার সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, যারা টিকা নিতে পারেনি তারা সরকারি স্যাটেলাইট ক্লিনিক বা নির্ধারিত টিকা কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে টিকা পাবে।
“অনেকেই অসচেতনতা ও গোঁড়ামির কারণে টিকা নেয়নি। তারাই এখন ভুগছে। আমরা ক্যাম্পেইনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছি। যারা টিকা নেয়নি এখন তারাই আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যান্যদের সংক্রমিত করছে।”