Published : 13 Jul 2026, 08:08 PM
টানা ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে ফের তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার থেকে ৫২ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী।
এদিন সন্ধ্যা ৬টায় এ পয়েন্টে (খালিশাচাপানি বাইশপুকুর) নদীর পানি বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং বেলা ৩টায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার তথ্য দেন তিনি।
তিনি বলেন, “তিস্তার পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে; যা বড় বন্যার বার্তা দিচ্ছে।”
তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে দুই মাসের ব্যবধানে পঞ্চমবারের মতো তিস্তায় পানি বৃদ্ধির কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে তিস্তাপারের বাসিন্দারা।
বাসিন্দারা জানান, উজান হতে নেমে আসা তিস্তা নদীতে প্রবাহিত পানি এখন ঘোলা (কাঁদা-মাটি)। সঙ্গে গাছের ডালা, কাঠ ও কচুরিপানাও ভেসে আসছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপ নুরুল ইসলাম বলেন, এদিন সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় ৫২ দশমিক ০০ সেন্টিমিটার, বেলা ১২টায় ৫২ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার ও বেলা ৩টায় ৫২ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল; যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তিন ঘণ্টায় পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার রংপুর কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার (২৯ দশমিক ৩০) ৪০ সেন্টিমিটার (২৮ দশমিক ৯০) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে মধ্য রাতে কাউনিয়া পয়েন্ট পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
তিনি বলেন, রোববার রাত ৯টার দিকে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার (৫১ দশমিক ৯৩) নিচে ছিল। ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে এদিন সন্ধ্যা ৬টায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে উজানে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দো-মোহনী ও কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তায় কমলা সংকেত জারি করা হয়েছে বলে ভারতীয় সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন ওয়েবসাইডে প্রকাশ করা হয়েছে।
সেখানে জানানো হয়, তিস্তা নদীর উজানে ভারতের দো-মোহনী পয়েন্টে বিকাল ৫টায় বিপৎসীমার (৮৫ দশমিক ৯৫) ৩ সেন্টিমিটার (৮৫ দশমিক ৯৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ অংশের ডালিয়ায় তিস্তার ব্যারেজ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে বিকাল ৫টায় বিপৎসীমার (৬৫ দশমিক ৯৫) ৭ সেন্টিমিটার (৬৬ দশমিক ০২) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বরত) মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে।

এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এ ছাড়া এ সময় গাইবান্ধায় তিস্তা নদী ও কুড়িগ্রামের ধরলা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তা অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রবাহিত পানি লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাতে পারে বলে তিনি জানান।
ঝাড়সিংহেশ্বর চর গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, দুই মাসে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যে থাকায় এ বছর আমন ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া চরের অনেক কৃষকের বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টাসহ অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
তিস্তাপারের বাইশপুকুর এলাকার বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। সন্ধ্যা ৬টায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে এলাকার নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এ ছাড়া উজানের পানি প্রচুর ঘোলা ও সঙ্গে বড়-ছোট গাছের ডালা, কাঠ ও কচুরিপানাও পানিতে ভেসে আসছে।
তিস্তায় পানি বাড়ায় লালমনিরহাটে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি আবার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে লালমনিরহাটের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েকদিন ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করলেও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় নদীতে পানির চাপ বাড়ছে। এতে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা, ফসলি জমি ও কাঁচা রাস্তায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার আজিজুল ইসলাম বলেন, “ব্যারাজে পানি বাড়লে তো আমাদের এখানে পানি বাড়বে। রাতের মধ্যেই আমাদের এখানে পানি আসবে। সেই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম।”
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানান হাতীবান্ধা গড্ডিমারী এলাকার রহমত আলী। তিনি বলেন, “বিকাল থেকে পানি বাড়তে শুরু করায় রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।”
তিস্তা তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অনেক অংশ টেকসই সংস্কার না করায় পানি বৃদ্ধি পেলেই ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বর্ষাকালে জরুরি ভিত্তিতে নামমাত্র মেরামতের কারণে কার্যকর সুরক্ষা মিলছে না।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে তাদের টিম সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।