Published : 15 Jun 2026, 01:08 AM
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পদে নির্বাচিত হয়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এ সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নেতৃত্বগুণ ও সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন প্রবাসীরা। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় ছাত্র সংসদ বা ‘স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশ নয়, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের বাইরে থেকে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সংস্থা হিসেবে কাজ করে।
এ সংসদগুলো শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভোটে পরিচালিত হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ‘সাবাটিক্যাল অফিসার’ হিসেবে পরিচিত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা এক বছরের জন্য পড়াশোনা থেকে বিরতি নিয়ে পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট পরিচালনা, আবাসন সংকট নিরসন, টিউশন ফি নির্ধারণ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের মতো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করার ক্ষমতা রাখেন। মূলত শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং ক্যাম্পাসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ বজায় রাখাই সংসদের প্রধান কাজ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। অ্যাঙ্গলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটির লন্ডন ক্যাম্পাসে ১ হাজার ৬২৭ ভোট পেয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন নোয়াখালীর সন্তান নাঈম হাসান। আইন তৃতীয় বর্ষের এ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশবিষয়ক নানা কর্মকাণ্ডেও যুক্ত।
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড (ইউডব্লিউই) ব্রিস্টলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খাদিজা হোসেন অড়লা। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর এ প্রতিনিধি শিক্ষার মানোন্নয়ন, আবাসন ও রেন্টার্স রাইটস বা ভাড়াটিয়াদের অধিকার ইস্যুতে কাজ করছেন।
কুষ্টিয়ার শায়েখ হাসান ইউনিভার্সিটি ফর দ্য ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ)-এর এপসম ক্যাম্পাসে টানা দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের এ শিক্ষার্থী নেতৃত্বের কারণে পুনরায় শিক্ষার্থীদের আস্থা পেয়েছেন।
ওয়েলস অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাংলাদেশিদের জোরালো অবস্থান তৈরি হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কম্পিউটার সায়েন্সের স্নাতক ইরফান রহমান, যিনি আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্বকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) নির্বাচিত হয়েছেন এ বি এম রাহাত মুবাশশির।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ওয়েলফেয়ার) এম ইমাম হোসাইন টানা দুবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নর্থ ওয়েলসের ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বাংলাদেশি ও দ্বিতীয় এশীয় শিক্ষার্থী হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন হাসিব লগ্ন। তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন।
এছাড়া রেক্সহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের সন্তান হাফসা আজমারি ফারজু, যিনি ‘সাসটেইনেবিলিটি চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত।
লন্ডনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নীতিনির্ধারণী পদে রয়েছেন। লন্ডন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭৬ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রাজ্য মন্ডল, যিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা দুবার ভাইস প্রেসিডেন্ট (অ্যাকটিভিটিজ অ্যান্ড অপরচুনিটিজ) নির্বাচিত হয়েছেন নাহিদ বিনতে ইসলাম এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইকুইটি অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার) হিসেবে কাজ করছেন নোয়াখালীর সৌমিত্র পাল। সৌমিত্র মূলত বর্ণবাদবিরোধী কার্যক্রম ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করছেন।
ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি লন্ডনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র নাফি হাসান খান। চট্টগ্রামের সন্তান রায়াস বিন নিজাম রেভেন্সবর্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন; এর আগে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
সোলেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকার মোহাম্মদ আশরাফুল গালিব। তিনি টিউশন ফিতে নমনীয়তা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে কাজ করছেন। গাজীপুরের টঙ্গীর সন্তান মো. সাইফ মোল্লা চঞ্চল গ্রিনউইচ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।
বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীনেতারা ভূমিকা রাখছেন। ইউনিভার্সিটি অব গ্লস্টারশায়ারে প্রায় এক দশক পর পড়াশোনায় ফিরে ৬৭৬ ভোট পেয়ে ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ডাইভারসিটি অফিসার নির্বাচিত হয়েছেন ইফফাত জাহান। তার উদ্যোগে সেখানে শিশু পরিচর্যা সুবিধা, মাতৃদুগ্ধ কর্নার ও নামাজ কক্ষ স্থাপিত হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের প্রথম বাংলাদেশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করছেন জুবায়ের আহম্মেদ। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসপেকস অফিসার ও বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রংপুরের মুহতাসিম সাদাত নিবিড়, যিনি ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি পরিবহন সেবার মানোন্নয়নে কাজ করেছেন।
নির্বাচিত এ প্রতিনিধিরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে। হাফসা আজমারি ফারজু বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। আমি সমতা, ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী রেখে যেতে চাই।”
অন্যদিকে খাদিজা হোসেন অড়লা বলেন, “শিক্ষার্থী নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জননীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, মানসম্মত শিক্ষা, সমান সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গঠনের ভিত্তি। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখি।”
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ নির্বাচনি প্রক্রিয়া মূলত ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যম। এ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জয়লাভ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সক্ষমতাকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে বলে মনে করেন প্রবাসীরা।