Published : 30 Aug 2025, 08:01 PM
আগের দিনের সংঘর্ষের জেরে রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। দুই দফা হামলায় দলটির তিনতলার কার্যালয়ের নিচতলার একটি অংশ পুড়ে গেছে।
দেশের কয়েকটি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীতে এ ঘটনা ঘটে।
লাঠিচার্জ করে ও জলকামান থেকে পানি ছুড়ে পুলিশ হামলাকারীদের জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। পরে জলকামানের পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এতে নিচ তলায় থাকা দলীয় কার্যালয়ের লাইব্রেরির বই, গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ও আসবাবপত্র পুড়ে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে জাতীয় পার্টির তরফে। তবে হামলার সময় দলটির নেতাকর্মীদের কেউ সেখান না থাকায় আহত হওয়ার কোনো তথ্য মেলেনি।
আগের দিন দলের সভাপতি নুরুল হক নুরকে লাঠিপেটায় আহত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি শেষে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে এসে প্রথম দফায় হামলা হয়। মিছিলে থাকা ব্যক্তিরা বাইরে থেকে জাতীয় পার্টির কার্যালয় ভাঙচুর করে। সেসময় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এর ঘণ্টা খানেক পর দ্বিতীয় দফায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উল্টো দিকের গলি থেকে এসে এক দল ব্যক্তি আবার হামলা চালায় এবং আগুন দেয়। পরে সেখানে উপস্থিত পুলিশ তাদের হটিয়ে দিয়ে জলকামান দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

দুদফা হামলার সময়ের আগে-পরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্যকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এরমধ্যে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ হামলাকারীদের সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভাঙচুর ও হামলার পর সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।
এ হামলার জন্য জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণঅধিকার পরিষদকে দায়ী করেছেন।
তার অভিযোগ, “গতকালের (শুক্রবার) ঘটনার জের ধরে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা দলবল নিয়ে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, আগুন ও ভাঙচুর চালাচ্ছে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সদস্যরা বলেন, জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের উল্টো দিকেই বিজয়নগরে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল বিকাল ৪টা থেকে।
সেখানে সমাবেশ শেষে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, মৎস্যভবন, কাকরাইল ঘুরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে আসে। তখন তারা সেখানে অবস্থানের চেষ্টা করলে পুলিশের বাধায় ফিরে যায়। তবে এর কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুরে এসে তারা হামলা চালায়।

রমনা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওদের (গণঅধিকার পরিষদের) একটা কর্মসূচি ছিল, কর্মসূচি শেষে ওরা আগুন দিয়েছিল। পরে আমরা তাদের সরিয়ে দিয়ে আগুন নিভিয়ে দিয়েছি। এখন পরিবেশ শান্ত।”
এর আগে এদিন বিকাল ৪টার দিকে রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম বাদের বাসার সামনে জড়ো হয় একদল ব্যক্তি। তারা নুরকে লাঠিপেটা করে গুরুতর আহত করার প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তারা সেখানে তার কুশপুত্তলিকা পোড়ায়।
জাতীয় পার্টির অভিযোগ, ওই ব্যক্তিরা দলের প্রধানের বাসায় কয়েক দফা হামলা চালাতে চেষ্টা করে।
এর আগে দিনের বিভিন্ন সময় ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, গাইবান্ধায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ে হরিপুরে ও রাজশাহীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে।
আগের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় সংঘর্ষে জড়ান উভয় দলের নেতাকর্মীরা।
এ ঘটনার প্রতিবাদে রাত সাড়ে ৯টার দিকে মশাল মিছিলের কর্মসূচি শেষে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ের সামনে প্রেস ব্রিফিং করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের লাঠিপেটা করে। এসময় দলের সভাপতি নুরুল হক নুর লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হন। এখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
আগের দিনের ঘটনার জের ধরে শনিবার সন্ধ্যায় দলের কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়ার আগে বিকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পার্টির মহসচিব শামীম পাটোয়ারী বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। পরিস্থিতি শান্ত হলে নুরকে দেখতে হাসপাতালে যাবেন তারা।

পাশাপাশি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নুরের দ্রুত সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে বলেও তাদের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণঅধিকারের কোনো সংঘর্ষ হয়নি। বরং উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গণঅধিকারের নেতাকর্মীরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের রক্ষা করেছে।”
এর কিছু সময় পরই জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে দুই দফায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ দাবি
এ হামলার ঘটনার আগে বিজয় নগরে আল রাজী কমপ্লেক্সের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে গণঅধিকার পরিষদ।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলে সমাবেশে দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান শনিবারের মধ্যে সরকারের তরফে তদন্ত কমিটি গঠন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন।
তিনি বলেন, “নুরকে হত্যার উদ্দেশে তাকে বুটজুতা দিয়ে পেষা হয়েছে। গতকাল (শুক্রবার) অনেকে বলেছেন আমরা না কি জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের গিয়েছিলাম, সেজন্য মেরেছে। অথচ আমরা সেখান থেকে আমাদের কার্যালয়ের সামনে আসার পরই নুরসহ নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা হয়েছে। হামলায় জড়িত সেনাবাহিনীর সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

নুরকে হত্যার ’মাস্টারপ্ল্যান’ অনুযায়ী নির্দয়ভাবে তাকে পেটানোর অভিযোগ করে তিনি পুলিশ ও প্রতিরক্ষা সংস্কার কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি।
রাশেদ বলেন, “নুরের ওপর হামলার ঘটনাকে অনেকে নির্বাচন পেছানোর অজুহাত। আমরা মনে করি এর সঙ্গে নির্বাচন বানচাল বা এক এগারো হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।”
এর পরই সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ বের করে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে সামনে যান নেতাকর্মীরা।
‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ মিছিল নিয়ে ’আগুন সন্ত্রাস’ চালায়-জাতীয় পার্টি
কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার পরপরই জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ভাঙচুর ও হামলার জন্য গণঅধিকার পরিষদকে দায়ী করেন।
তবে রাতে দিনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী যে বিবৃতি দেন তাতে এ হামলার পেছনে যারা জড়িত তাদের কোনো দল বা কারও নাম বলেননি।
বিবৃতিতে সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেন।

এতে বলা হয়, ”অগ্নিসংযোগে নিচতলায় লাইব্রেরির বই, গুরুত্বপূর্ণ কাগজ এবং আসবাবপত্র পুড়ে গেছে। আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ, জলকামান এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে সন্ত্রাসীদের হটিয়ে দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে।
”গতকালও (শুক্রবার) কয়েক দফা সন্ত্রাসী হামলা এবং মশাল মিছিল নিয়ে আগুন দিতে চেয়েছিল তারা। জাতীয় পার্টি নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিরোধে গতকাল তারা আগুন দিতে পারেনি।”
ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, শনিবার বিকালে দলের কর্মসূচি শেষ করে জাতীয় পার্টি নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয় ত্যাগ করলে একটি ’সন্ত্রাসী দল’ পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে কাকরাইলের জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে।
“বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় পার্টি মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ময়মনসিংহ বিভাগীয় নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয় মিলনায়তনে গণমাধ্যম কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
”সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টির কর্মসূচি শেষ হলে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নেতাকর্মীদের শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্য কার্যালয় ত্যাগ করতে বলেন। এরপর জাতীয় পার্টি নেতাকর্মীরাও দলীয় কার্যালয় ত্যাগ করেন। সন্ধ্যায় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মিছিল নিয়ে জাতীয় পার্টি কার্যালয়ে আগুন সন্ত্রাস চালায়।”
বিবৃতিতে এদিন বিকালে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উত্তরার বাসায় কয়েক দফা হামলা চালানোর চেষ্টার অভিযোগও করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি নিরাপত্তার কারণে সেখানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে এতে তুলে ধরা হয়।
আরও পড়ুন
নুরকে লাঠিপেটা: ৫ জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা, ভাঙচুর
জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকারের সংঘর্ষ, ঢাকা মেডিকেলে নুর
আইনি দিক যাচাই করে জাপা নিষিদ্ধের পদক্ষেপ: অ্যাটর্নি জেনারেল
নুরের ওপর 'হামলাকারীদের প্রভাব' যাই হোক, দ্রুত বিচার হবে: সরকারের বিবৃতি
বিজয়নগরে সড়ক অবরোধ করে গণঅধিকারের বিক্ষোভ