Published : 03 Nov 2025, 11:58 PM
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আর গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে মতবিরোধ দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আট মাসের সংলাপেও যে বিরোধের সুরাহা হয়নি, তা সাত দিনে কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া কোন দলই বা নতুন করে আলোচনার ডাক দেবে, আর কোন দলই বা তাতে সাড়া দেবে, সে প্রশ্নও আছে।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আর গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষমেশ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকেই নিতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে মোটা দাগে দুই ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রথমত, সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া; দ্বিতীয়ত, গণভোটের দিনক্ষণ।
বিএনপিসহ কয়েকটি দল চায়, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হোক। আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পূর্ণ ভার থাকুক নির্বাচিত সংসদের ওপর।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল দাবি তুলেছে, নভেম্বরেই গণভোট আয়োজন করতে হবে। আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ আসতে হবে প্রধান উপদেষ্টার হাত ধরে।
দলগুলোর এমন অনড় অবস্থানের মধ্যে গেল মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ জমা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। সেখানে সংসদ নির্বাচনের দিন বা আগেই গণভোট করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সোমবার গণভোট প্রশ্নে দলগুলোর আলোচনায় বসার আহ্বান জানায় সরকার।

কে কাকে কোথায় ডাকবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের তো একটা দায়িত্ব আছে। এখন আপনি যদি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা নিজেরা আলাপ করে ঠিক করে দেবে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার কেন?
“এতদিন ঐকমত্য কমিশন একটা রেফারির ভূমিকা পালন করেছে। এখন যেহেতু ঐকমত্য কমিশন কাজ সম্পন্ন করেছে, তাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে একটা ‘রেফারির’ ভূমিকা পালন করতে হবে।”
এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, এখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা আলাপ করবে কীভাবে, কীভাবে সিদ্ধান্তে আসবে, কে কাকে ডাকবে ,কারা কোথায় বসবে? কার মাঝখানে বসবে? কারা এখানে যাবে, কেন যাবে?
“এখানে একটা সমন্বয়কারীর ভূমিকার জন্য সরকার আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজটাই হলো কিন্তু সবার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।”
দলগুলো এখন আর আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে না, সেজন্য সরকাররকেই দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে বলে মনে করেন এ অধ্যাপক।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা আলাপ করে হয়ত সিদ্ধান্ত নিতে পারত, কিন্তু সেটা সম্ভব হত ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পরেই।”
এ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা তো ইতোমধ্যে হয়েছে এবং নানা কারণে দলগুলোর মধ্যে কিছুটা দূরত্বও তৈরি হয়েছে।
“সেই দূরত্বটা পূরণ করার জন্য তো রেফারি লাগবে। অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে রেফারির ভূমিকা রাখছে। তারা যদি বলে, অন্যরা একমত হয়ে আসবে, এটা কঠিন কাজ।”

এক সপ্তাহের আশায় সরকার
সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গণভোট কখন হবে, গণভোটের বিষয়বস্তু কী হবে, জুলাই সনদে বর্ণিত ভিন্ন মতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবগুলোর আলোকে জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ।
“এসব ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।”
এই ‘ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা’ কীভাবে মিলবে তা খোলাসা করেননি তিনি।
‘এখনও এক হওয়া সম্ভব’
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবির বলেন, “ঐকমত্য করাটাই তো উদ্দেশ্য। আমি মনে করি, সেক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা আবারও সুযোগ দিলেন রাজনৈতিক দলগুলোকে। তারা আলাপ-আলোচনা করে মোটামুটি যদি একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সবাই সহমত হয়, তাহলে সে ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে। এটা ইতিবাচক।”
দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান থাকলেও কাছাকাছি আসা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
“দলগুলো নিজেরা বসতে পারে; একটা ‘কমন’ জায়গায় আসার চেষ্টা করতে পারে। অনেক বিষয়ে তো নিষ্পন্ন হয়ে আছে। নিজেদের মধো আলোচনা করলে এখনও এক হওয়া সম্ভব বলে মনে করি।”

বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন মনে করেন, এ উদ্যোগটা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে নেওয়াটা কঠিন। কারণ, তাদের মধ্যে দ্বিমত, ভিন্নমত রয়েছে। এখন সরকার ডেকে বসাতে পারে; ঐকমত্য কমিশন তো নেই।
ঐকমত্য কমিশন সবশেষ যেভাবে ভূমিকা রেখেছে, তাতে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
মুশতাক হোসেন বলেন, “ঐকমত্য কমিশন ডাকলে আমরা নাও বসতে পারি। তাদের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এখন সরকার থেকে বসতে হবে।”
দলগুলোকে বসার আহ্বান জানানো হলেও কে উদ্যোগ নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক এ জিএস।
তিনি বলেন, “কে (উদ্যোগ) নেবে, বিএনপি নেবে না জামায়াত নেবে; কারা ভূমিকা রাখবে? এবার ডাকলে সবাই চলে আসবে, এমন সম্ভাবনা কম। বিভিন্ন ভাগে ভাগে হয়ত আলোচন হতে পারে। বিএনপি ডাকলে একদল যাবে, জামায়াত ডাকলে আরেক দল যাবে।”
কারো ডাকে সব দল একসঙ্গে বসবে না বলে মন্তব্য করেন মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকেই আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। ঝগড়াটা লাগানো হল, ঐকমত্য কমিশন কেন এটা করল? দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ সমন্বিত করে ঐকমত্য কমিশন খুবই ভালা কাজ করেছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে তারা সর্বনাশ করেছে। সমস্যা রয়ে গেল; সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে বল ঠেলে দিলেন।”
এখন সরকার যদি উদ্যোগ না নেয়, খুব একটা এগোবে বলে মনে করেন না মুশতাক হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “এ কাজগুলো শুরু থেকেই করা দরকার ছিল। দলগুলো সিদ্ধান্ত দিতে পারবে কিনা সংশয় রয়েছে। আলটিমেটলি দলগুলো হয়ত দিতে পারবে না; সরকারকেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে।”
দলগুলোয় নিজেরা আলোচনার জন্য স্বল্প সময় পেয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দলের ওপর দায়িত্বটা যে তিনি দিলেন, এ বিষয়ে তাদের একমত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। দলগুলোকে দায়িত্ব দিলে বহু আগেই এটা করা দরকার ছিল। গণভোট কবে হবে, শেষমেশ সরকারকেই সিদ্ধান্তটা দিতে হবে।”
দলগুলোকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়াকে কৌশলী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন এ বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “গণভোট কবে, সেই প্রশ্নে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যের জায়গায় যেতে পারবে না। কৌশলগত দিক থেকে প্রধান উপদেষ্টা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগে রাজনৈতিক দলকে ইনভল্ভ করিয়েছেন, রাজনৈতিক দল যখন ব্যর্থ হবে, তখন সরকার সিদ্ধান্ত দিলে তা সবাই মানবে বলে আমি মনে করি।”
সেক্ষেত্রে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
অধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, “গণভোট দেবে দেশের নাগরিক। এ জন্য তাদের মধ্যে স্পষ্ট পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে যে, জুলাই সনদে কী আছে, আর কিসের ভিত্তিতে তারা ‘হ্যাঁ-না’ বলবে।”
এ মানবাধিকারকর্মী মনে করেন, মানুষকে বুঝতে হবে তারা কীসের ওপর জুলাই সনদে ভোট দিচ্ছে। অনেক দল তো এ আলোচনার মধ্যে নেই।
সব দল নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় এবং যে কটি দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তাতে ঐকমত্য না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

যা বলছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আগামী সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে নাকি আগেই হবে— এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতসহ কয়েকটি দলের মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় বলে জানান আসিফ নজরুল।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কিছু সুপারিশ নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিএনপি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দেওয়া সুপারিশমালা ‘প্রতারণামূলক’ অভিযোগ করে অবিলম্বে তা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঐকমত্য কমিশনের বিরুদ্ধে ‘সংকট’ সৃষ্টির অভিযোগও তোলেন।
নভেম্বরে গণভোটের দাবি তোলা জামায়াতে ইসলামী চাইছে, সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা ‘রেফারির’ ভূমিকা পালন করুক।
এদিকে দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বানকে সংস্কার বানচালের ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে এনসিপি।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন “ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনায় অনেকগুলো বিষয়ে ঐক্যমত তৈরি হয়েছে এবং ঐকমত্য কমিশন কিছু সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছে। তারপরেও এখনো পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি করা হয় নাই।
“আজ সরকারের তরফ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আবারো সংস্কারের বিষয়টাকে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে নিজেরা উদ্যোগী না হয়ে বরং গাছাড়া মনোভাব ব্যক্ত করছেন। আমরা এর মধ্য দিয়ে সংস্কারকে বানচালের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করছি।”
আরও পড়ুন:
গণভোট: দলগুলোর 'ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা' চায় সরকার
জুলাই সনদ আদেশ জারির এখতিয়ার কার? গণভোট কোন আইনে?
জুলাই সনদ আদেশ জারির এখতিয়ার কার? গণভোট কোন আইনে?
আরপিও: জোট প্রার্থীর মার্কা নিয়ে সরব তিন দল, ইসি নীরব