Published : 07 Jan 2026, 01:54 AM
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা একেকজন কত টাকা খরচ করতে পারবেন, যে দলের প্রার্থী সেই দলেরই বা কত টাকা খরচের সুযোগ রয়েছে?
ভোটে যে টাকা প্রার্থী খরচ করছেন, তার উৎস এবং কোন খাতে খরচ হচ্ছে জানাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের তরফে কঠোর নজরদারি আশা করছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র রোববার বাছাই শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে ১ হাজার ৮৪২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং অফিসাররা; আর বাতিল হয়েছে ৭২৩ জনের।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ সামনে রেখে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ করেছে ইসি। ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল ও নিষ্পত্তির জন্য সময় রাখা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরদিন থেকে ভোটের প্রচার শুরু হবে।
তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ থেকে ভোট পর্যন্ত প্রার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হয়। নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যে এ খরচ দেখাতে হবে। ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলোরও ব্যয়সীমা রয়েছে নির্বাচনি আইনে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সংসদ নির্বাচনে এবার ভোটার প্রতি ১০ টাকা খরচ নির্ধারণ করে প্রার্থীর ব্যয়সীমানা বাড়ানো হয়েছে।
৩০০ আসনের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে; ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে; ৮ লাখ ৪ হাজারের বেশি।
কে কী তথ্য দিলেন
ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন; এ আসনের প্রার্থীরা নির্বাচনি ব্যয় করতে পারবেন ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ টাকা।
এ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলনসহ ১০ জন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন। ২০ জানুয়ারির পর চূড়ান্ত হবে কজন লড়ইয়ে থাকবেন।
মনোনয়নপত্র জমার সময় তারেক রহমান নিজের কৃষিখাত ও ব্যাংক আমানতের আয় থেকে ৩০ লাখ টাকা নির্বাচনি ব্যয় করবেন বলে রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়েছেন।
বগুড়া-৬ আসনেও তারেক রহমান একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবেন। ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে বগুড়া-৬ আসনে তার ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৩০ টাকা ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে ব্যয় করবেন ৩৫ লাখ টাকা; এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা অর্থ থেকে ব্যয় করবেন, দলের অনুদান নেবেন ২৫ লাখ টাকা।
এ আসনে ভোটার অনুপাতে শফিকুর রহমান ৩৫ লাখ ১৭ হাজার ১৮০ টাকা ব্যয় করার সুযোগ পাবেন।
বিএনপি ও জামায়াত এবার দুই শতাধিক দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে; সেক্ষেত্রে দলও সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে পারবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে ভোটের ব্যয়ের টাকা জোগাড় করছেন ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ৪৪ লাখ টাকা আর ১ লাখ টাকা নিজের আয় থেকে। এ আসনে তিনি সর্বোচ্চ ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ৭৮০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য নিজের অর্থ, আত্মীয়-স্বজন থেকে ধার, আত্মীয়-স্বজনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান, আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ধার, অন্য কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নিলে তা নির্বাচন কমিশনকে নির্ধারিত ফরমে (ফরম-২০) জানাতে হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রার্থী ও দলের ব্যয় বিবরণী জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নিয়ম ভেদে সবাই জমা দেন। কিন্তু নির্বাচনি ব্যয়ের মনিটরিং হয় না; এটাতে জোর দেওয়া উচিত। এবার আশা করবো, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এ বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করবেন।”
প্রার্থী ও দলের ব্যয় কত, দিতে হবে ব্যয় বিবরণী
কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা করতে পারবে সেই দল। প্রার্থী ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ব্যয় করতে পারবে ৩ কোটি টাকা। কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে।
প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট আসনে সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা থেকে ভোটার অনুপাতে ১০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে পারবেন। নির্ধারিত খাতেই এ ব্যয় দেখাতে হবে।
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, সব প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ে ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হবে। ব্যর্থ হলে অথবা এই আদেশ লঙ্ঘন করলে জরিমানাসহ দুই বছর থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় বিবরণী দাখিলের সুবিধার্থে ভোটের পরে এক মাস পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসার (জেলা প্রশাসক) ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় খোলা রাখা হয়।
এবার নির্বাচনি আইন ও বিধিতে সংস্কার আনা হয়েছে। পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সংখ্যক বিলবোর্ড ব্যবহারসহ সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনি ব্যয়ের মধ্যে সার্বিক বিষয় তুলে ধরে নির্ধারিত ছকে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য, নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী দাখিলে অসত্য তথ্য দিলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, “নির্বাচনি ব্যয় রিটার্ন তদারকির বিষয়ে নজর রয়েছে ইসির। যথাযথভাবে আইন-বিধি অনুসরণ না করলে জেল-জরিমানার বিধান রযেছে।”
নির্বাচনি ব্যয় অনুসরণে সবার সহযোগিতা চান এই নির্বাচন কমিশন।
‘ক্রাউড ফান্ডিংয়ে’ বাধা দেখছে না ইসি
স্বজন ছাড়া অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ ভোটে ব্যয় করার কথা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন তাসনিম জারা।
ঢাকা-৯ আসনে ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা নির্বাচনি ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে প্রত্যেক প্রার্থীর।
তাসনিম জারা মনোনয়নপত্র জমার সময়ই নির্বাচনি ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন ‘জনসাধারণ থেকে ক্রাউড ফান্ডিং-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ’।
এটি কতটা বিধিসম্মত? নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ভোটের জন্য ‘ক্রাইউ ফান্ডিং’ করলে ইসির করার কিছু থাকে না।
“বিষয়টি আমরাও দেখেছি। ক্রাউড ফান্ডিং এর বিষয়ে কিছু নির্ধারণ করা নেই। তবে দলের বিষয়টি আরপিওতে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) বলা রয়েছে-নিবন্ধিত দল কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিতে পারবে।”

তিনি বলেন, “নির্বাচনি ব্যয়ের কথা বলে ব্যক্তি যদি চায়, কেউ যদি দেয়, করার কি আছে? তাতে ইসির করার কিছু থাকে না। যদি করার কিছু থাকে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দেখতে পারে।
“মানুষের কাছে কেউ সহায়তা চেয়েছে, মানুষ সহায়তা করেছে-এটা তার বিষয়, ইসির খুব একটা কিছু করার নেই। আমরা দেখবো- প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়, ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করছেন কি না বা ভোটার প্রতি ১০ টাকার বেশি নির্বাচনি ব্যয় করেছেন কি না। ওনার আয়ের উৎস উনি দিয়েছেন, উনি মানুষের কাছ থেকে যদি নেন, আইনে তো কোনো বাধা নেই।”
তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন ১% ভোটারের সঠিকতা না পাওয়ায়।
সোমবার নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিলও করেছেন তাসনিম জারা। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি আপিল শুনানিতে তার ভাগ্য নির্ধারণ হবে, ভোটে ফিরতে পারবে কিনা।
ভোটে ফিরতে না পারলে ‘ক্রাউড ফান্ডিংয়ের’ অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছেন তিনি।
পুরনো খবর:
নির্বাচনি ব্যয়: কোন আসনে কত খরচ প্রার্থীদের
নির্বাচনি ব্যয়: কোন আসনে কত খরচ প্রার্থীদের
হলফনামা: তারেক রহমানের সম্পদ ২ কোটির, মামলা ছিল ৭৭টি
হলফনামা: শফিকুর রহমানের সম্পদ দেড় কোটি টাকার, কৃষির আয় ৩ লাখ