Published : 25 Jun 2026, 07:47 PM
উপজেলায় সংসদ সদস্যদের জন্য যে অফিস রয়েছে সেখানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের একজন করে যোগ্য সদস্যকে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য আনিসুর রহমান।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব করেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
আনিসুর রহমান বাজেটে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের কল্যাণে উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
একই সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পুনর্বাসন ও কল্যাণে বিশেষ বরাদ্দ বিবেচনার আহ্বান জানান এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, “আমরা উপজেলা পরিষদে যে অফিস পেয়েছি, সেই অফিসে জুলাই শহীদ পরিবার ও গুম হওয়া পরিবারের যেকোনো একজন যোগ্য সদস্যকে আমরা যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে তারা উপকৃত হবে।”
আনিসুর রহমান বলেন, তিনি নিজে তার অফিসে এমন একজনকে চাকরি দেবেন। সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরও নিজ নিজ এলাকায় জুলাই শহীদ পরিবার বা গুম হওয়া পরিবারের সদস্যকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।
‘চ্যালেঞ্জিং বাজেট’
নতুন অর্থবছরের বাজেটকে আকারে বড়, উচ্চাভিলাষী ও সংস্কারমুখী বলে মন্তব্য করেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাসের রহমান।
প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে নাসের বলেন, বহু বছর পর বাজেটটি ‘সহানুভূতিশীল’ হয়েছে; কারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর বড় চাপ তৈরি করা হয়নি।
করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা ‘সময়োপযোগী’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, তা ৪ লাখ টাকা করা গেলে আরও ভালো হতো।
ব্যক্তিগত আয়কর ও করপোরেট করের হার পাঁচ বছরের জন্য নির্দিষ্ট করার উদ্যোগকে ইতিবাচক বলেন নাসের রহমান।
তার মতে, “এতে কর কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হবে।”
তবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি, সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং সাড়ে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাসের রহমান বলেন, “এই বাজেট অনেক ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু একটি বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে শুধু ঘোষণার ওপর নয়, নির্ভর করে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা, ব্যয়ের দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের জীবনে বাস্তব স্বস্তি ফিরিয়ে আনার ওপর।”
তিনি বলেন, “বাজেটের সাফল্য সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাবে মাপা হয়; ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নে তার বিচার হয়।”
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে স্পর্শকাতর হিসেবে তুলে ধরে নাসের রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং গ্যাস সংকটের কারণে এ খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে আইপিপি পেমেন্ট (বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে দেওয়া বিল), ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি আমদানির ব্যয়কে বড় আর্থিক চাপ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতার কথাও বলেন নাসের। তিনি বলেন, সুদ পরিশোধ ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনের এই এমপি বলেন, উন্নয়ন যেন ঋণ পরিশোধের চাপে ঢাকা না পড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
উপজেলা হাসপাতালের উন্নয়ন
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম বাজেটকে শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের বাজেট বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও দেশের অধিকাংশ উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা ৩১ থেকে ৫০ শয্যার হাসপাতালের মধ্যে সীমিত।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রত্যেক উপজেলা হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত হবে।
তৈরি পোশাক খাতের প্রসঙ্গ তুলে আবুল কালাম বলেন, এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস; এতে ৬০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
নিজেকে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারি দলের এই এমপি বলেন, দেশে ৫০০টির বেশি স্পিনিং মিল রয়েছে; এর মধ্যে ২৫০টির বেশি বন্ধ।
দেশীয় সুতা শিল্প রক্ষায় বিদেশ থেকে আমদানি করা সুতার ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের দাবি জানান তিনি।
‘বড় প্রকল্পে নারাজ, এলাকায় আবার ব্রিজ চান’
বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে চট্টগ্রাম-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, বড় প্রকল্পের কথা উঠলেই বিরোধীরা বাজেট বড় হয়ে যাচ্ছে বলে আপত্তি করেন; কিন্তু নিজের এলাকার জন্য আবার রাস্তা, ‘ব্রিজ’ ও অবকাঠামো চান।
তিনি বলেন, “উর্দুতে একটা কথা আছে, তুম করো তো চমৎকার, হাম করে তো…।”
বাজেটকে ‘সাহসী’ আখ্যা দিয়ে হুম্মাম বলেন, সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে আলাদা করে না দেখে এগুলোকে একসঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
কারিগরি শিক্ষায় বড় বরাদ্দের জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান হুম্মাম।
নিজ এলাকা রাঙ্গুনিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রসঙ্গ তুলে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বালু খাত থেকে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। কিন্তু নদীভাঙন ঠেকাতে ব্লক বসানোসহ ক্ষতি সামলাতে ৮০ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞদের মতে নদী থেকে তোলা বালুর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই অবৈধভাবে উত্তোলন হয়।
হুম্মাম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন এখন ‘মাফিয়া সেক্টর’ হয়ে গেছে। এই ‘মাফিয়া সেক্টরের’ কারণে তার এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৬ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ানো যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, পুলিশকে আরও প্রশিক্ষিত ও সজ্জিত করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আনতে স্থিতিশীলতা জরুরি মন্তব্য করে চট্টগ্রামের এই এমপি বলেন, করপোরেট কর না বাড়ানো বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
খাগড়াছড়ির জন্য বিশেষ থোক বরাদ্দ দাবি
খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক, সাহসী ও দূরদর্শী’ বলে সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, খাগড়াছড়ি ভৌগোলিক অবস্থান ও বাস্তবতার দিক থেকে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় আলাদা। তিনটি পৌরসভা ও নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দুর্গম এই পার্বত্য এলাকার জন্য সাধারণ আসনভিত্তিক বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, একটি বা দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনের সমান বরাদ্দ দিয়ে নয় উপজেলা ও তিন পৌরসভার দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়।
খাগড়াছড়ির জন্য বিশেষ থোক বরাদ্দ দাবি করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে একটি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল আধুনিকায়ন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বন গবেষণা কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
পাহাড়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পাহাড়কে অনেক সময় ‘পানিশমেন্ট জোন’ হিসেবে দেখা হয়। সরকারি কর্মচারীরা সেখানে যেতে চান না; আবার কেউ পাহাড়কে ভালোবেসে থাকতে চাইলে তাকে সমতলে বদলি করে আনা হয়।
এই প্রবণতা থেকে মন্ত্রণালয়গুলোকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পাহাড়ের চূড়া ও ঢালে বসবাসকারী মানুষের পানির সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, অনেক মানুষকে ১ হাজার ফুট নিচ থেকে পানি তুলে আনতে হয়।
বাজেট ‘জনবান্ধব নয়, দলবান্ধব’
ঢাকা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামাল হোসেন বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “এই বাজেটকে আমরা জনবান্ধব না বলে দলবান্ধব বললে অত্যুক্তি হবে না।”
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন কামাল হোসেন।
বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা অনেক বেশি। পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হলে এ বিষয়ে ভাবতে হবে।
ব্যাংক খাতে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ‘অর্থনৈতিক মাফিয়াদের’ ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিক ঋণগ্রহণ এবং কার্ডভিত্তিক অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি উৎসাহিত করার অভিযোগ তোলেন বিরোধী দলের এ সদস্য।
কর অব্যাহতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কামাল হোসেন বলেন, সংসদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করে আইন পাস করা হয়; অথচ সংসদকে পাশ কাটিয়ে লক্ষ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে প্রশাসক বসানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, মানুষ নিয়মিত কর দিলেও ‘সেবা পাচ্ছে না’।