২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

খালেদা জিয়াকে নেওয়া হচ্ছে লন্ডনে, তারেকের ফেরা আবার অনিশ্চিত

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এখনো ভোটার হননি। প্রবাসে থেকে ভোটার ও প্রার্থী হতে তাকে এখন নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে।

খালেদা জিয়াকে নেওয়া হচ্ছে লন্ডনে, তারেকের ফেরা আবার অনিশ্চিত
ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

বিশেষ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Dec 2025, 01:53 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:15 PM

গুরুতর অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সারিয়ে তোলার চেষ্টায় আবারও তাকে নেওয়া হচ্ছে লন্ডনে, যেখানে ১৭ বছর ধরে নির্বাসনে আছেন তার ছেলে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এমন এক সময়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া হচ্ছে, যখন দেশে শুরু হয়েছে ভোটের আবহ, তফসিল ঘোষণার আর সপ্তাহখানেক বাকি।

ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে প্রার্থী হওয়ার কথা বিএনপি নেত্রীর। তারেক রহমানও প্রথমবারের মত ভোটে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ফেরার আশায় দিন গুনছিলেন নেতাকর্মীরা।

কিন্তু বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে তারেকের দেশে ফেরা এখন অনিশ্চিত হয়ে গেল। 

চার মাস ছেলের সঙ্গে লন্ডনে কাটিয়ে গত ৫ মে লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান। ফাইল ছবি

চার মাস ছেলের সঙ্গে লন্ডনে কাটিয়ে গত ৫ মে লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান। ফাইল ছবি

তিনি এখনো ভোটার হননি। প্রবাসে থেকে ভোটার ও প্রার্থী হতে তাকে এখন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রার্থী হতে হলে তারেক রহমানকে মনোনয়নত্র জমার আগেই ভোটার হতে হবে। ইসি চাইলে তিনি লন্ডনে থেকেও ভোটার হওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিদেশে থেকে বিধি মেনে অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে মনোনয়নপত্রও জমা দিতে পারবেন তারেক। তার প্রস্তাবক ও সমর্থককে বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে বিদেশে থেকে ভোট করতে তার আইনি কোনো বাধা নেই। খালেদার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটবে।

মায়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য যে কারণে এ দফাতেও ২০০৮ সালের পর থেকে লন্ডনে থাকা তারেকের দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে গেল।

গত জানুয়ারির মতই কাতারের আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে লন্ডনে যাবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে দেশ থেকে নিয়ে যেতে লন্ডন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান।

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে গত ২৩ নভেম্বর ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়াকে। 

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে গত ২৩ নভেম্বর ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়াকে।

তিনি শুক্রবার সকালে ঢাকায় পৌঁছে শাশুড়ির সঙ্গে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করেই লন্ডনে ফিরবেন। তাদের সঙ্গে থাকবেন ঢাকায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে থাকা আরেক পুত্রবধূ সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। এর আগে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে গত মে মাসে দেশে ফেরার পথেও শাশুড়ির সঙ্গে তারা দুজন ছিলেন।

৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যেতে মেডিকেল বোর্ডের সবুজ সংকেতের পর সেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। পাশাপাশি তার সুস্থতা কামনায় শুক্রবার বাদ জুমা দেশজুড়ে দোয়া চাওয়া হয়েছে বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে।

সব ঠিক থাকলে ‘কারিগরি ক্রুটি’ সারিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে পুত্রবধূ জুবাইদা ঢাকায় এসে পৌঁছালে শুক্রবার সকাল ১০টার পর খালেদা জিয়ার লন্ডনযাত্রা শুরু হওয়ার কথা বলেছেন বিএনপি নেতারা।

এগার দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ‘অত্যন্ত সংকটজনক’ অবস্থায় চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন। বৃহস্পতিবার তার শারীরিক অবস্থা বিদেশ যাওয়ার মত হয়েছে বলে এক বিফ্রিংয়ে জানানো হয়।

উন্নত চিকিৎসার জন্য এ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার এ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপি নেতা অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন।

কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে গত ৭ জানুয়ারি রাতে লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি।

কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে গত ৭ জানুয়ারি রাতে লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি।

মেডিকেল বোর্ড ও বিদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে লন্ডনের একটি হাসপাতাল ঠিক করার কথা বলেন তিনি। তারেক রহমানও এতে সায় দেন বলে জানান বিএনপির কয়েকজন নেতা। ফলে এ দফাতেও আর ঢাকায় আসা হচ্ছে না দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের।

শুরুতে দলের তরফে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি রাতের কোনো এক সময়ে ঢাকায় পৌঁছার পর ভোরের দিকে খালেদা জিয়ার রওনা হওয়ার সূচি ঠিক করা হয়েছিল। তবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ‘কারিগরি ক্রুটি’ ও জুবাইদার ঢাকার পথে রওনা দেওয়ার কারণে তা পিছিয়ে সকাল হয়ে যাবে।

এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটার আসা কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে।”

এর আগে দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে সংবাদ ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য জাহিদ হোসেন বলেন, “লন্ডনে একটা নির্ধারিত হসপিটাল আমরা ঠিক করেছি, সেখানে আমরা উনাকে নিয়ে যাব।”

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিদেশ থেকে আসা দুইজন চিকিৎসক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকবেন বলে তুলে ধরেন তিনি।

যাত্রাপথে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলেন তার ব্যক্তিগত এই চিকিৎসক।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এগার মাস আগে চলতি বছর ৭ জানুয়ারি কাতারের আামির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির দেওয়া এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করেই চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি রেখে কিছুদিন তার চিকিৎসা চলে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে কিছুদিন লন্ডনে তারেকের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন।

অনেকটা সুস্থ হয়ে গত ৬ মে একই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। তখন ডা. জুবাইদা শাশুড়ির সঙ্গে এসেছিলেন। তিনি ঢাকায় এক মাস কাটিয়ে ফিরে যান ৬ জুন।

চার মাস পর লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর খালেদা জিয়াকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য প্রথম দফায় ঘোষণা করা দলের প্রার্থী তালিকায় তার জন্য তিনটি আসন রাখা হয়।

লন্ডন থেকে দেশে ফেরার সময় ৬ মে তারেক রহমান নিজেই গাড়ি চালিয়ে তার মা খালেদা জিয়াকে বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তারেকের মেয়ে জায়মা রহমানও গাড়িতে ছিলেন।

লন্ডন থেকে দেশে ফেরার সময় ৬ মে তারেক রহমান নিজেই গাড়ি চালিয়ে তার মা খালেদা জিয়াকে বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তারেকের মেয়ে জায়মা রহমানও গাড়িতে ছিলেন।

এরমধ্যে গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেওয়া হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে। বিদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করার পাশাপাশি চীন ও যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আসেন তার চিকিৎসা সহায়তায়।

অন্তর্বর্তী সরকার মঙ্গলবার খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ (ভিভিআইপি) ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্য দিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব এসএসএফকে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। সেদিনই এসএসএফ ও পিজিআর সদস্যরা এভারকেয়ার এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়।

তিন বাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মঙ্গলবার রাতে এভারকেয়ারে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে আসেন। পরদিন বুধবার রাতে যান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

২০১৫ সালে খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যান বড় ছেলে তারেক রহমান।

২০১৫ সালে খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যান বড় ছেলে তারেক রহমান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করে শুক্রবার জুমার পর দেশের সকল মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিএনপির পক্ষ থেকেও শুক্রবার সব ধর্মের উপাসনালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনার কর্মসূচি দেওয়া হয়।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বৈঠকে বসে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড। যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকের পর জানানো হয়, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে মেডিকেল বোর্ড।

বিফ্রিংয়ে খালেদা জিয়ার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে ডা. জাহিদ বলেন, “পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। আমরা আপনাদেরকে আগেও বলেছি, মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো অবস্থাতেই উনার পরিবার অথবা আমরা দল (থেকে) কোনো অবস্থাতেই কোনো চিন্তা করছি না।

পরে বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, “কাতারের আমিরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি অত্যন্ত আধুনিক একটা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। এর মধ্যে অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে সব ব্যবস্থাই রয়েছে।”

নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় আছি আমরা, ভোট যথাসময়ে হোক: নজরুল ইসলাম খান

এয়ার অ্যাম্বুলেন্স 'বিলম্বিত', দেশে আসছেন জুবাইদা

খালেদা জিয়াকে নেওয়া হবে লন্ডনে

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় হাসপাতালে চীনা বিশেষজ্ঞ দল

খালেদা জিয়া ছাড়া পরিবারের কেউ এসএসএফ নিরাপত্তা পাবেন না

দেশে ফেরার 'একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের' সুযোগ দেখছেন না তারেক

খালেদা গেলেন, তারেক ফিরবেন কবে

দুই পুত্রবধূকে নিয়ে দেশের পথে খালেদা জিয়া