Published : 01 Apr 2026, 07:36 PM
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে আনা মূলতবি প্রস্তাবে ‘প্রতিকার’ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল।
বুধবার বিকালে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে ৫টা ৪০ এর দিকে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
এদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে আনা মূলতবি প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত না পাওয়ার অভিযোগ তোলে বিরোধী দল। তাদের প্রস্তাব চাপা দিতেই একই বিষয়ে আরেকটি নোটিস আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
এর আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে ত্রয়োদশ সংসদ শুরুর প্রথম দিন ১২ মার্চ প্রথম দিনেই বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছিল।
ওয়াকআউটের আগে শফিকুর বলেন, আগের দিনের আলোচনায় তাদের নোটিসের বিষয় ছিল ‘মূলত গণভোট এবং গণভোটের সংস্কারের যে প্রস্তাব গিয়েছিল এর আলোকে যে পরিষদটা গঠন হওয়ার কথা সেই পরিষদের সভা আহ্বান সম্পর্কে’।
তিনি বলেন, “আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবের জবাবে আমি বলেছিলাম, ‘যেহেতু আলোচনাটা হয়েছে সংস্কার পরিষদের ওপর যদি এইটাকে কেন্দ্র করে কোনো কমিটি- বিশেষ কমিটি গঠন হয় তাহলে আমরা ইতিবাচকভাবে সেটা ভেবে দেখব এবং একই সাথে বলেছিলাম যে সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিলে এটা অর্থবহ একটা কমিটি হিসেবে রূপ নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি’।
“যেহেতু আমরা এখানে এসেছি সংকট নিরসনের জন্য, সংকট তৈরির জন্য নয়।”
এরপর তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, “কিন্তু যেহেতু এটা জন আকাঙ্ক্ষার বিষয়। গণভোটের বিষয় প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়ের বিষয়। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম যে আপনার মাধ্যমে প্রতিকার পাব এবং সিদ্ধান্তের জন্য আমি আপনাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হলো কিনা আমি বুঝতে পারি নাই। এই বিষয়টা আপনার কাছ থেকে আমি স্পষ্ট জানতে চাই।”
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আগের দিনের প্রস্তাবটি ছিল একটি মূলতবি প্রস্তাব এবং তা তার অনুপস্থিতিতে গৃহীত হয়েছিল।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে মাত্র তিনটি মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একটি জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। অপরটি ছিল গ্রেনেড হামলা সম্পর্কিত। আরেকটি ছিল নুরুল ইসলাম মনির কোস্টগার্ড সম্পর্কিত। বছরের পর বছর চলে যায় কোন মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয় না সংসদে।”
স্পিকার বলেন, “তারপরেও প্রাণবন্ত আলোচনার জন্যে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে মূলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছিল।”
মূলতবি প্রস্তাবের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “যেই সমস্যার সমাধান আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই কেবল করা যায় সেটি নিয়ে মূলতবি প্রস্তাব হতে পারে না।”
তবে বিরোধী দলকে আরও কথা বলার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেন স্পিকার। বলেন, “আজকেও আপনারা যদি প্রয়োজন হয় সেই নোটিসটি সম্পর্কে যখন আলাপ আলোচনা করব আপনাদের আরো যদি বক্তব্য থাকে কথা বলার অবারিত সুযোগ আপনারা পাবেন।”
তিনি বলেন, “এটি একটি জাতীয় সমস্যা যত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে আমরা আশা করি ট্রেজারি বেঞ্চ এবং বিরোধী দল মিলে খোলাখুলিভাবে কথাবার্তা বলে সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনার মাধ্যমে আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। সেই সুযোগ আপনাদের রয়েছে। এটি মহান হাউজ অফ দি পিপল। আপনারাই ডিসাইড করবেন।”
তবে এতে সন্তুষ্ট হননি বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, “প্রতিকার চেয়েছিলাম এ বিষয়টা কোনো দলের সাথে সম্পর্কিত না। যে বিষয়টা নির্বাচনের আগে সরকারি দল বিরোধী দল সবাই একমত হয়েছিলাম। এর স্বপক্ষে কথাও বলেছি ক্যাম্পেইন করেছি।
“আমরা প্রতিকার যে পেলাম না এতে আমরা না এতে দেশবাসীর তাদের রায়ের প্রতিফলন হলো না মূল্যায়ন হলো না। আমরা বিরোধীদলে এ অপমূল্যায়ন আমরা মেনে নিতে পারি না। এজন্য তার প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।”
ওয়াকআউটের ঘোষণা দেওয়ার পর স্পিকার তাকে থামিয়ে বলেন, “মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা আপনি আমার বক্তব্যতো সম্পূর্ণ করতে দিলেন না। আপনার পুরো বক্তব্য শুনেছি। ওয়াকআউট করা আপনাদের অধিকার। কিন্তু আমি বলতে চাই যে আজকে একটু পরে আরেকটি মূলতবি প্রস্তাব বিবেচিত হবে। সেখানে আমার মনে হয় যে আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং সেখানে মন খুলে আপনারা আরো কথা বলতে পারবেন।

“সুতরাং আমার অনুরোধ হলো আপনারা ওটা শোনেন। তারপর যদি ওয়াকআউট করতে পারেন প্লিজ ফিল ফ্রি। তবে প্রস্তাবটির ভাগ্য কি নির্ধারণ হয় সেটি আপনি দেখার জন্য একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।”
এসময় বিরোধীদলীয় নেতা আরেকটি অভিযোগ তুলে বলেন, “হ্যাঁ ওই নোটিসটাও আমাদের নজরে আগে কিছুটা এসেছে। এবং আমরা মনে করি যে মূল নোটিসকে চাপা দেওয়ার জন্য ওই নোটিসটা সামনে আনা হয়েছে। এইজন্য দুইটার প্রতিবাদেই এই সংসদ থেকে আপাতত ওয়াকআউট করছি।”
এর জবাবে স্পিকার বলেন, “মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা নোটিসই তো উত্থাপন হয়নি। আপনি কি করে বুঝলেন কোনটা চাপা দেওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে। আমি অনুরোধ করছি একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। নোটিসের বিষয়বস্তু শুনেন তারপরে আপনারা ফিল ফ্রি।”
তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “মাননীয় স্পিকার আপনার অনুপস্থিতিতে এই হাউজে এই নোটিস পড়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সদস্য এটা পড়েছেন। আমরা শুনেছি এইজন্য আমরা বুঝে শুনেই বলছি যে এই দুই কারণেই এখন ওয়াকআউট করছি, আপনাকে ধন্যবাদ।”
এরপর স্পিকার বলেন, “নিশ্চয়ই সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আপনারা ওয়াকআউট করতে পারেন।”
এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
বিরোধী দল বেরিয়ে যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের দিনের মূলতবি প্রস্তাবটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তখনই তিনি আপত্তি তুলেছিলেন।
“যেটা ৬৮ বিধিতে হতে পারে। কিন্তু মূলতবি প্রস্তাব যে রুলস অব প্রসিডিউরে আছে তার মধ্যে আপনি সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন সেটা আমি আগে উত্থাপন করেছি। যে বিষয়টি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে সেরকম কোনো বিষয় মূলতবি প্রস্তাবে আলোচনা করার বিধান নাই।”
তিনি বলেন, “এটা আপনাদের উদারতা হাউজের অভিভাবক হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। আপনি আলোচনার জন্য রেখেছেন এবং সেটা দুই ঘণ্টা আলোচনার জন্য সময় নির্ধারিত হয়েছে। উভয় পক্ষে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।”
আলোচনা শেষে ভোটাভুটির সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, স্পিকার চাইলে কোনো মূলতবি প্রস্তাব বিবেচনা করবেন কি করবেন না, সেটি তার এখতিয়ার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নজির অনুসারে তারা ট্রেজারি বেঞ্চের আলোচনা যাতে এগিয়ে না যায় সেজন্য মূলতবি প্রস্তাব তোলে।”
তবে একই বিষয়ে একজন বেসরকারি সদস্য নতুন প্রস্তাব আনতে পারেন বলেও তিনি তুলে ধরেন।