Published : 31 Jul 2025, 12:03 AM
বিভিন্ন খাতের সংস্কার নিয়ে ঐক্য আর অনৈক্যের দোলাচলের মধ্যে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো। আর বিএনপি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জায়গা হবে আগামী জাতীয় সংসদ।
সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চলমান সংলাপের শেষ দিকে এসে দলগুলোর দিক থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে। কোন প্রক্রিয়ায় বা কীসের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে নানা মত দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো।
খসড়া জুলাই সনদ হাতে পাওয়ার পর দলগুলো বলছে, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হচ্ছে তা নিয়ে তৈরি এ সনদে সবার স্বাক্ষর করার কথা। তবে কীসের ভিত্তিতে স্বাক্ষর হবে- সেই প্রশ্ন তুলে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আইনি ভিত্তি নিয়ে এর বিরোধীতা করছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সংলাপে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে এ প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কিন্তু কমিশন এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন "জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজের কাছে আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম। জবাবে তিনি বলেন- বিষয়টা তাদের টার্মসে নাই। তখন আমরা বলেছিলাম প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে টার্মস নিয়ে আসেন অথবা আমাদের বক্তব্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে জানান।"
পরে কমিশনের সহসভাপতি দলগুলোকে এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তাহের।
বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দ্বিতীয় দফার ২২তম বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা শুরু হয় দুপুর ৩টায়, সেই সংলাপ শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টায়।
বৈঠকের শুরুতে স্ক্রিনে সাতটি আলোচ্য বিষয় দেখানো হয়। এদিন রাষ্ট্রের মূলনীতি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের কাঠামোসহ অমীমাংসিত সাত বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে কমিশন।
বৈঠকের আলোচনার তালিকায় ছিল আরও ছয়টি বিষয়। সেগুলো হল- সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান; রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব [অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)]; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, ইলেকটোরাল কলেজ ইত্যাদি; উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, এখতিয়ার ইত্যাদি; নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সম্পর্কিত প্রস্তাব; রাষ্ট্রের মূলনীতি।
সংলাপের বিরতিতে সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর আইনগত ভিত্তি না থাকলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের নায়েবে আমির তাহের।
তিনি বলেন, "জনগণের কাছে এর কোনও মূল্য থাকবে না।

”আমাদের দীর্ঘ আলোচনার পর যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে একমত হয়েছি, তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বাংলাদেশে একটি গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু কমিশনের পক্ষ থেকে যে সনদের খসড়া পাঠানো হয়েছে, তা দেখে আমরা খুব হতাশ হয়েছি।
"সেখানে বলা হয়েছে, দুই বছরের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সরকারের মেয়াদ বা কমিশনের এখতিয়ার সম্পর্কিত কোনও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।"
তিনি বলেন, “এই সরকার কী তাহলে দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়? যদি বর্তমান সরকার না থেকে পরবর্তী সরকার এসব বাস্তবায়ন করে, তাহলে এতদিন ধরে আমরা যে পরিশ্রম করেছি তা কী কেবল পরামর্শ দেওয়ার জন্যই ছিল? তাহলে তো এর কোনো মূল্যই থাকল না।
”আমরা শুরু থেকেই ধরে নিয়েছিলাম, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো আইনগত ভিত্তি পাবে এবং তা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু যদি আইনগত ভিত্তি না থাকে, তাহলে এটি কেবল কথার কথা থেকে যাবে–যা জনগণ মানবে না, গুরুত্ব দেবে না।"
নায়েবে আমির বলেন, “কমিশনের চেয়ারপারসন ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে আগে একটি লিখিত চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার কোনও বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। অঙ্গীকার না মানলে সেটি শুধু প্রতারণাই নয়, বরং জনগণের সঙ্গে উপহাস।
“বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই ধরনের পরিস্থিতি বহুবার তৈরি হয়েছে এবং তখনও আইনি গ্যাপ পেরিয়ে সমাধানের পথ বের করা হয়েছে।“
অতীতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, এরশাদসহ অনেক শাসক আইনগত প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় গিয়েছেন, সংসদ গঠন করেছেন, আইন পাস করিয়েছেন। ফলে এখনো আইনি ভিত্তি দেওয়ার সুযোগ আছে।

তিনি বলেন, “আমরা আইনজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠক করতে চাই, যেখানে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো কীভাবে আইনগত ভিত্তি পেতে পারে, তা আলোচনা করা হবে। এখনই সেই আলোচনার সুযোগ দিলে ভালো হয়, না হলে পরবর্তী সময়ে যেন সেই সুযোগ দেওয়া হয়।
“এই সনদের প্রস্তাব যদি বাস্তবায়নযোগ্য না হয়, আইনগত ভিত্তি না থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতীকী দলিল হয়ে থাকবে। তাতে আমরা সই করব না, কারণ জনগণের কাছে যার কোনও বাস্তব মূল্য নেই, এমন প্রস্তাবে সই করে লাভ কী?
এ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, "আমরা চাই এই সনদ ও ঘোষণাকে সাংবিধানিক ঘোষণা হিসেবে প্রকাশ করা হোক। পরবর্তী সংসদে এটি র্যাটিফাই হলে কেউ আর আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যের চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।"
এ প্রসঙ্গে এদিন কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনও। বলেন, "জুলাই সনদকে যদি আমরা একটা আইনি ভিত্তির জায়গায় নিয়ে আসতে না পারি, সেক্ষেত্রে সেই জুলাই সনদ সেটা পূর্বেকার মত তিন দলের রূপরেখার (৯১ সালের ঘটনা) মত শুধু একটা ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে। যার কোনো কার্যকারিতার জায়গা থাকবে না। আমরা একটা অকার্যকর অপূর্ণাঙ্গ মৌলিক সংস্কারবিহীন জুলাই সনদ চাই না।
"লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার করে জুলাই সনদকে কার্যকর করা, আইনি ভিত্তি দান করা, এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ করেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে আমরা অগ্রসর হতে চাই । ৩৬ জুলাইয়ে মধ্যে 'জুলাই ঘোষণাপত্র এবং সনদপত্র' বাস্তবায়ন চাই।"
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "পূর্ণাঙ্গ সনদ পেলে স্বাক্ষর করবে বিএনপি। জুলাই সনদের বাস্তবায়নের জায়গা হবে আগামী জাতীয় সংসদ। বিভিন্ন অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব বর্তমান সময়েই কার্যকর হয়ে যাবে।
"জাতিকে ধোঁকা দেওযার মত কোনো রাজনৈতিক দল আছে বলে মনে করি না।"
তার ভাষ্য, 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্যই হবে ভবিষ্যতের গ্যারান্টি।
“এই সনদ আসলে একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকারনামা, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জাতিকে একটি নতুন দিশা দেখাবে।

খসড়া সনদের বিষয়ে সালাহউদ্দিন করেন, "এই সনদের মূল শক্তি হল এতে থাকা অঙ্গীকারনামা, যেখানে ঐকমত্যে পৌঁছানো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আইন, সংবিধান ও বিধির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
“এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদই হবে মূল মঞ্চ। আমরা একমত হয়েছি যে, সংসদ গঠনের দুই বছরের মধ্যে সব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে। আর তার আগেই অনেক সংস্কার প্রস্তাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “এই সনদের চূড়ান্ত কপি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরসহ কমিশনের সব সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের স্বাক্ষরে প্রকাশিত হবে। এটি জাতির সামনে ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে উন্মুক্ত থাকবে। এরপর কোন রাজনৈতিক দল কী সাহস করবে একে ভাঙার? তাহলে কী বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে, সেই ঝুঁকি কী কোন দল নিবে?
"আমার তো মনে হয় না এর চাইতে বড় বেশি কোনো ঐকমত্য হতে পারে “
জাতীয় ঐকমত্যকে সালাহউদ্দিন একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, “এই চুক্তি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয়, এটি পুরো জাতির সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে, একটি ঐক্যমূলক প্রতিশ্রুতি।”
তিনি বলেন, ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮২৬টি সংস্কারের সুপারিশের মধ্যে ৬৫৯টিতে তার দল একমত পোষণ করেছে এবং ৫১টিতে একমত হয়নি। ১১৬টিতে দ্বিমত পোষণ করা হয়েছে।
”তারপরও বলবে, বিএনপি সংস্কার চায় না। সেটা জাতি দেখেছে।"
খসড়া সনদ সব দলের কাছে দেয়া হবে আজ: আলী রীয়াজ
এদিকে বৃহস্পতিবার জুলাই সনদের গ্রহণযোগ্য খসড়া সব দলের কাছে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজ।
তিনি বলেন, "বুধবারের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তার একটি তালিকা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছে দেব।“
আলোচনার গতি বাড়াতে দলগুলোর সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ”আপনারা যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছেন, তার মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমরা চেষ্টা করছি, এসব বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছাতে এবং বৃহস্পতিবারের মধ্যেই আপনাদের অবহিত করতে পারব।"
সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব–সংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি লিখিত খসড়া অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কাছে তুলে দেওয়া হবে।
"প্রাথমিক পর্যায়ে সব দল মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের নীতিগত অবস্থানে একমত হয়েছে। তবে সংবিধানে এ বিষয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে কিছু ভিন্নমত রয়ে গেছে।
"এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির দেওয়া সুপারিশ ও আপত্তিগুলো স্পষ্টভাবে কমিশনের কাছে তুলে ধরা হয়েছে এবং তা আলোচনাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রস্তাব এখনো প্রস্তুত না হলেও অন্য বিষয়গুলোয় দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।"
আরও পড়ুন
প্রথম পর্বে ৬২ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার তালিকা দিল কমিশন
জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়ায় চব্বিশের অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতির অঙ্গীকার
জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া: ২ বছরে 'পূর্ণ' বাস্তবায়নের 'অঙ্গীকার'