Published : 08 Jun 2026, 11:53 PM
রপ্তানি কমে যাওয়ায় এবং আমদানি বাড়ায় দেশে বাণিজ্য ঘাটতি আরো খানিকটা বেড়েছে, যা চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এসে ঠেকেছে ২ হাজার ২২১ কোটি ডলারে।
এই ঘাটতি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি।
ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল; তার ফলও মিলেছিল। আমদানি ব্যয় কমে এসেছিল; তাতে বাণিজ্য ঘাটতিও অনেকটা কমে আসে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে চলে। এতে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাণিজ্য ঘাটতিতে নিম্মমুখী প্রবণতাই দেখা যায়। কিন্তু রপ্তানি আয়ের বড় ধাক্কায় পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ফের বাড়তে শুরু করে।
চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) ১১ মাস পার হয়েছে। সোমবার ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তাতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২১ কোটি (২২.২১ বিলিয়ন) ডলার।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮২৩ কোটি (১৮.২৩ বিলিয়ন) ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৫ হাজার ৮২২ কোটি ৫০ লাখ (৫৮.২২ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এই ব্যয় ছিল ৫৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৩৬ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১০ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়।
এ হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরের ১০ মাসে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ৯ শতাংশের মতো কমে ২ হাজার ৪৫ কোটি (২০.৪৫ বিলিয়ন) ডলারে নেমেছিল। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি (২২.৪৩ বিলিয়ন) ডলার।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি (২৭.৩৮ বিলিয়ন) ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২৯৫ কোটি ৮০ লাখ (২.৯৬ বিলিয়ন) ডলার।
তিন মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এই ঘাটতি বেড়ে ৫৭১ কোটি ২০ লাখ (৫.৭১ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়ায়। চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) শেষে ঘাটতি ছিল ৭৫৭ কোটি (৭.৫৭ বিলিয়ন) ডলার। জুলাই-নভেম্বর শেষে ঘাটতি ছিল ৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার।
ছয় মাসে অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। নয় মাষ শেষে (জুলাই-মার্চ) ছিল ১৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি ১ বিলিয়ন ছাড়াল
বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট-বিওপি) ঘাটতি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে ১০৭ কোটি ৩০ লাখ (১.০৭ বিলিয়ন) ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
নয় মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ঘাটতি ছিল ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার। তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ঘাটতি ছিল ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
এই আর্থিক বছরের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-অগাস্ট সময়ে এই সূচকে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। এক মাসে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। আর অর্থবছর শেষ হয়েছিল ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত নিয়ে।
আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার
ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। তবে ঘাটতি নিয়ে শুরু হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছর। ওই আর্থিক বছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১৭ কোটি ১০ লাখ (১.১৭ বিলিয়ন) ডলার।
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই সূচকে ৭৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দেয়। নয় মাস শেষে (জুলাই-মার্চ) সেই উদ্বৃত্ত বেড়ে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ১৩০ কোটি ৭০ লাখ (১.৩১ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়ায়।
দশ মাস শেষে (জুলাই-এপ্রিল) তা কমে ১১২ কোটি ৫০ লাখ (১.১২ বিলিয়ন) ডলারে নেমে আসে। ১১ মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে তা কমে ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমে আসে।
বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির বাজেট সহায়তার ঋণে শেষ পর্যন্ত আর্থিক হিসাবে ৩২০ কোটি (৩.২০ বিলিয়ন) ডলার উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল।
তবে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছর ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়। প্রথম মাস জুলাইয়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-অগাস্ট সময়ে এই ঘাটতি কমে ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৬৬ কোটি (১.৬৬ বিলিয়ন) ডলার। চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এই উদ্বৃত্ত ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২১৭ কোটি ২০ লাখ (২.১৭ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়ায়।
পাঁচ মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-নভেম্বর সময়ে অবশ্য উদ্বৃত্ত ১২৩ কোটি ৩০ লাখ (১.২৩ বিলিয়ন) ডলারে নেমে আসে। ডিসেম্বর শেষে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই উদ্বৃত্ত বেড়ে ২ দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
আট মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৪ দশমিক শূন্য আট বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। নয় মাস শেষে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে।
১০ মাস শেষে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সামগ্রিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ৩২৯ কোটি (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। আর ৪৩০ কোটি (৪.৩০ বিলিয়ন) ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছর।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরও ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়। প্রথম মাস জুলাইয়ে ঘাটতি ছিল ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তবে দুই মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-অগাস্ট সময়ে সেই ঘাটতি ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারে নামে।
তিন মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শেষে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত হয়। চার মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-অক্টোবর সময়ে সেই উদ্বৃত্ত ১০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে ওঠে।
পাঁচ মাস শেষে (জুলাই-নভেম্বর) উদ্বৃত্ত দাঁড়য় ৭৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ছয় মাস শেষে (জুলাই-ডিসেম্বর) সেই উদ্বৃত্ত আরও বেড়ে হয় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) উদ্বৃত্ত বেড়ে ৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
সবশেষ ১০ মাসে (জুলাই-মার্চ) এই উদ্বৃত্ত আরও বেড়ে ৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অথচ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১০ মাসে এই সূচকে ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।