Published : 08 Jun 2026, 11:39 PM
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বেনাপোল প্রতিনিধি মোহা. আসাদুজ্জামানকে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তাকে কারাগারে পাঠানোর যে আবেদন পুলিশ করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, তিনি শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান আসাদ।
আইনজীবী ও পরিবার বলছে, যে আসাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি একসময় শার্শা সরকারি মহিলা কলেজের প্রদর্শক ছিলেন; এখন শুধু সাংবাদিকতা করেন।
এক সময় তিনি আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তবে কলেজ সরকারি হওয়ায় পরে তিনি আর ওই পদে ছিলেন না। সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও কখনো ছিলেন না।
তবে শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের নামও আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিনের এপিএস ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, নামের মিল থাকায় রাজনৈতিক নেতা আসাদুজ্জামান আসাদের পরিবর্তে সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে পুলিশ ২০২৫ সালে এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।
সোমবার বিকালে তাকে যশোরের আদালতে তোলা হলে অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আছাদুল ইসলাম জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সাংবাদিক আসাদুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তারা শার্শা থানা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।
গভীর রাতে গ্রেপ্তার
রোববার রাতে শার্শা উপজেলার জামতলার বাড়ি থেকে আসাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে শার্শা থানার এএসআই অহিদ জানান। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি থানার ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

আসাদুজ্জামানের বোন শিল্পী বেগম বলেন, “রাত ২টার দিকে পুলিশ দেয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করে। এরপর তারা দরজা খুলতে বাধ্য করে।”
আসাদুজ্জামানকে আটকের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি এবং সদুত্তরও দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তার বোন।
তিনি বলেন, “কোনো মামলা ছাড়া কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সেজন্য প্রতিবাদ করেছিল আমার ভাগনে শাহরিয়ার সাদাব তরঙ্গ। তখন পুলিশ মারধর করে তাকেও আটক করে নিয়ে যায়। পুলিশ বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরাও নিয়ে যায়।”
এদিকে আসাদুজ্জামানকে আটকের খবরে শার্শা ও বেনাপোলের সাংবাদিকরা সকালে থানার সামনে অবস্থান নেন। তারা তার মুক্তির দাবি জানাতে থাকেন।
একুশে টিভির বেনাপোল প্রতিনিধি জামাল হোসেন বলেন, “সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে যশোর-১ (শার্শা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিনের এপিএস আসাদুজ্জামান আসাদ মনে করে আটক করেছে পুলিশ। এখন তারা (পুলিশ) ভুল বুঝতে পেরেও তাকে ছাড়ছে না।”
শিল্পী বেগম বলেন, আসাদুজ্জামান এক সময় কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি উপজেলা কমিটিতে একসময় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক পদে ছিলেন।
“২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে কলেজটি সরকারিকরণ হওয়ার পর তাদের রাজনীতি করার আর কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি করেননি, নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তার অনেক আগেই ওই কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়।
“পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ত্যাগ করে। যশোর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি হলফনামাও তার আছে।”
শিল্পী বেগম বলেন, পুলিশকে তারা সেসব কাগজপত্র দেখিয়েছেন। কিন্তু তারপরও পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শার্শা থানার ওসি মারুফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আসাদুজ্জামান আসাদ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
যে মামলায় আসাদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর শার্শা থানায় সেটি দায়ের করেন শার্শা ইউনিয়ন বিএনপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আয়নাল হক।
সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় ছাত্রলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা ওই বছর ২৮ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপন করতে গিয়ে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়, সড়ক ও কালভার্টের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করে।
মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়। ওই সাতজনের মধ্যে আসাদুজ্জামান নামে কেউ নেই।
সোমবার রাতে ঢাকা থেকে মামলার বাদী আয়নাল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মামলায় যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেসব তিনি নিজে দেখেননি। তাকে থানায় ডেকে নিয়ে ওসি ও বিএনপি নেতারা ফেইসবুকে ঘটনার কিছু ভিডিও দেখান এবং মামলা করতে বলেন। সে অনুযায়ী তিনি মামলা করেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সাংবাদিক ও সাবেক কলেজ শিক্ষক আসাদুজ্জামানকে তিনি চেনেন না। তবে শেখ আফিল উদ্দিনের এপিএস আসাদুজ্জামান আসাদকে তিনি চেনেন এবং তিনিই মামলার ওইসব ঘটনার মূল ব্যক্তি। তবে ৫ অগাস্টের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই।
জামিন নাকচ করে কারাগারে
শার্শা থানায় সাংবাদিকদের অবস্থানের মধ্যেই সোমবার দুপুরের দিকে পুলিশের গাড়িতে করে সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে যশোরের আদালতে পাঠানো হয়। বেলা ৩টার দিকে তাকে আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়।
২০২৫ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিকাল ৪টার দিকে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
আসাদুজ্জামানের আইনজীবী সাজ্জাদ হোসেন পাপ্পু এ সময় জামিন আবেদন করেন। অপরদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যশোর থানার এসআই চিরঞ্জিত মণ্ডল তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করেন।
অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আছাদুল ইসলাম শুনানি শেষে আসাদুজ্জামানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর পুলিশ তাকে যশোর জেলা কারাগারে নিয়ে যায়।
আইনজীবী সাজ্জাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, “সাংবাদিক আসাদুজ্জামান চক্রান্তের শিকার। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আমরা আগামী বৃহস্পতিবার মামলার পরবর্তী দিনে তার জামিন আবেদনের সঙ্গে রাজনীতি থেকে তার অব্যাহতি নেওয়ার পত্রও আদালতে দাখিল করব।”
এদিকে একই মামলায় ও একই রাতে কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান ফিরোজ আহমেদ টিংকুকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সোমবার দুপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামানের সঙ্গে তাকেও আদালতে পাঠানো হয়। সে সময় তাদের একইসঙ্গে হাতকড়া পরানো ছিল, যা নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সাংবাদিকদের প্রতিবাদ ও নিন্দা
সাংবাদিক আসাদুজ্জামানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শার্শা থানা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন উপজেলার সাংবাদিকরা।
বেনাপোল বন্দর প্রেস ক্লাব, শার্শা প্রেস ক্লাব, প্রেস ক্লাব বেনাপোল, সীমান্ত প্রেস ক্লাব এবং উপজেলা সাংবাদিক ঐক্য পরিষদ সাংবাদিক আসাদুজ্জামানের গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তার মুক্তি দাবি করে।
বেনাপোল বন্দর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সময় টিভির স্টাফ রিপোর্টার আজিজুল হক বলেন, “সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া-এ দৃশ্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সমাজের নানা অসঙ্গতি ও অনিয়ম তুলে ধরতে সাংবাদিকরা যে হাতে কলম ধরেন, সেই হাতে হাতকড়া পরানোর ঘটনা সাংবাদিক সমাজের জন্য যেমন দুঃখজনক, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও প্রশ্নের জন্ম দেয়।”
নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের বেনাপোল প্রতিনিধি এবং বেনাপোল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বকুল মাহবুব বলেন, “এ ঘটনায় সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় এএসপি আরিফ হোসেন বলেন, “আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”