Published : 12 Dec 2022, 03:32 PM
সরকার ‘হটাতে’ বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনে ১৪ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সাত দলের জোট গণতন্ত্র মঞ্চ।
সোমবার রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদের অডিটোরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
ঘোষিত ১৪ দফার আলোকেই এ জোট বিএনপির সাথে ‘যুগপৎ আন্দোলন’ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে বলে জানান মান্না।
তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের একটা কোয়ালিটেটিভ চেইঞ্জ চাই। এজন্য আমরা ১৪ দফা দিচ্ছি। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না, প্রয়াত আকবর আলী খান বলেছিলেন যে এই সংবিধান আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে একটা জার বা মোঘল সম্রাটের মত ক্ষমতাশালী বানিয়েছে। এখন আমরা দেখছি তিনি তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী, উনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। এটা তো থাকতে পারে, সংবিধান সংশোধন করতে হবে…।”
সেজন্য প্রশাসন ও সংবিধান ‘সংস্কার করতে হবে’ মন্তব্য করে মান্না বলেন, “এ রকম করে সামগ্রিকভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, তার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার নিয়ে আসার সব কিছু করবার জন্য আমরা মনে করি যে, এই রাষ্ট্রের প্রশাসন এবং আইনের বা সংবিধানের যথেষ্ট সংস্কার করতে হবে।”
গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফার মধ্যে সংসদ বিলুপ্ত করে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় নির্বাচনের জন্য অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন, নুতুন নির্বাচন কমিশন তৈরি, খালেদা জিয়াসহ ‘রাজবন্দিদের’ মুক্তির পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ আরও কিছু বিষয় রাখা হয়েছে।
সম্মেলনে মান্না বলেন, নয়া পল্টনে পুলিশি অভিযানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ‘তছনছ’ অবস্থা দেখতে তারা সেখানে যাচ্ছেন।
গত শনিবার গোলাপবাগ মাঠে ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর সারা দেশে মহানগর ও বিভাগীয় সদরে গণমিছিল করবে বিএনপি
গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফা-
১. বর্তমান ‘অনির্বাচিত ও অবৈধ’ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ভোটের অধিকারসহ ‘গণতন্ত্র হরণকারী লুটেরা ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী’ সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।
২. ‘অবাধ, নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বিশ্বাসযোগ্য’ জাতীয় নির্বাচনের জন্য অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে। অন্তর্বতীকালীন সরকার বর্তমান ‘অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন কমিশন বাতিল করে ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য’ একটি স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। এই নির্বাচন কমিশন অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসাবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে নির্বাচনে টাকার খেলা ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ, অগণতান্ত্রিক আরপিও সংশোধন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পরিবর্তন, জনগণের বাঁচার জরুরি সংকটের সমাধান, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল করে পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল করবে। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে সাংবিধানিক ক্ষমতা কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আইন কানুন সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে সহায়তা করবে, যাতে করে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ এই গণতান্ত্রিক সংস্কার করার কার্য্কর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৩. (ক) সংবিধান ‘স্বৈরতন্ত্রের উৎস প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক জবাবদিহিতাহীন স্বেচ্ছাচারী কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ব্যবস্থার’ বদল ঘটিয়ে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা পৃথকীকরণ ও যৌক্তিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ন্যায়পাল ও সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের জন্য সাংবিধানিক কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন করা।
(খ) সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার করে সরকার গঠনে আস্থাভোট ও বাজেট পাস ব্যতিরেকে সকল বিলে স্বাধীন মতামত প্রদান ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার নিশ্চিত করা।
(গ) প্রত্যক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি ও দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
(ঘ) প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ‘যৌক্তিক ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ কার্য্কর স্বাধীনতার নিশ্চিত করাসহ গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা করা।
৪. বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ ‘রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসাবে দণ্ডপ্রাপ্ত’ সকল বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সাজা বাতিল, সকল ‘হয়রানিমূলক মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার এবং সকল রাজনৈতিক কারাবন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দান।
৫. সাংবিধানিক অধিকার হিসাবে সভা,সমাবেশ, মিছিল, মিটিংয়ে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা। বিরোধী দলসমূহের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ‘পুলিশি বাধা, হামলা, গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা’ বেআইনি হিসাবে গণ্য করা। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ‘দলীয় পেটুয়া বাহিনী হিসাবে’ ব্যবহার না করা। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনীগুলোকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ‘হয়রানির উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার না করা। স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠস্বর ‘দমন’ করতে নতুন কোনো মামলা না করা এবং ‘গায়েবি মামলায়’ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ন করা।
৬. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ সহ ‘মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল নিবর্তনমূলক কালাকানুন’ বাতিল করা এবং ‘গুম, খুন, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ করা। ইতোপূর্বে সংঘঠিত সকল ‘বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুনের’ যথাযথ তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ব্যবস্থার নামে শ্রমিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ‘হয়রানি’ বন্ধ করা।
৭. (ক) জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে খাদ্যপণ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্য্কর ব্যবস্থা গ্রহণ। বিদ্যমান অভাবের পরিস্থিতিতে গ্রাম-শহরের গরীব ও স্বল্প আয়ের পরিবারসমূহের জন্য ‘রেশন’ ও নগদ অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
(খ) গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানিসহ সেবাখাতসমূহে ‘স্বৈরাচারী পন্থায়’ মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। বিদ্যুত খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ডুবে থাকা রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রকল্প এবং এ খাতে দেওয়া ‘দায়মুক্তি’ আইন অবিলম্বে বাতিল করা।
(গ) সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত, সুলভে গণপরিবহনের ব্যবস্থা এবং বাসা ভাড়া যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করা।
৮. বিগত বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত ১৫ বছর ধরে বিদেশে ‘অর্থ পাচার’, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, শেয়ার মার্কেট, বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতসহ রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে সংগঠিত ‘রোমহর্ষক নজিরবিহীন দুর্নীতি’ এবং এর দায়দায়িত্ব চিহ্নিত করতে শক্তিশালী কমিশন গঠন করা। দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে দ্রুত কার্য্কর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৯. গত ১৫ বছরে ‘গুমের শিকার’ সকল নাগরিকদের উদ্ধার করা। ‘বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘হস্তক্ষেপমুক্ত’ প্রশাসন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে ‘বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন নিপীড়নের’ প্রতিটি ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
১০. সাম্প্রদায়িক উসকানি সৃষ্টি করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১১. (ক) স্বাস্থ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা ও বিনা চিকিৎসায় কোনো মৃত্যু নয়– এই নীতির ভিত্তিতে সমগ্র স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানো। স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতে মুনাফার লাগাম টেনে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
(খ) শিক্ষা অধিকার, বাণিজ্যিক পণ্য নয়- এই নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সবার জন্য একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত; মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে জিডিপির ন্যুনতম ৬ শতাংশ বরাদ্ধ করা।
১২. রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বেকারদের আত্মকর্মসংস্থানের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ।
১৩. কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত, পাটকল, চিনিকলসহ বন্ধ কলকারখানা চালু, শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের বাঁচার মত মর্যাদাপূর্ণ মজুরি ঘোষণা ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা।
১৪. জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বর্থের স্বীকৃতি ও স্বীকৃত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান করা।
বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, বহ্নিশিখা জামালী, গণসংহতির আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, আবুল হাসান রুবেল, জেএসডির শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, রাশেদ খান, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাউযুম, ইমরান ইমন, ভাসানী অনুসারী পরিষদের শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, হাবিবুর রহমান রিজু, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার সংবাদ সম্মেলনের উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৫ নভেম্বর এক বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধে ‘বৃহত্তর ঐক্যের’ ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায় বিএনপি।
পুরনো খবর:
নয়া পল্টনের কার্যালয় খুলেছে, ঢুকে ‘হতভম্ব’ বিএনপি নেতারা
যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপি-গণতন্ত্র মঞ্চ ঐকমত্য
ঢাকার সমাবেশ থেকে বিএনপি দিল ১০ দফা
গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে সংলাপে বিএনপি
বিএনপি অফিস থেকে প্রিজন ভ্যানের মিছিল
অফিসে ঢুকতে পারলেন না ফখরুল, বললেন ‘সমাবেশ হবে’
বিএনপি কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানকে ‘জঘন্য’ বললেন ফখরুল
জামিন মেলেনি, ফখরুল ও আব্বাস কারাগারে
বিএনপি কার্যালয় ‘ক্রাইম সিন’, নিরাপত্তার কারণেই প্রবেশ নিষেধ: পুলিশ