Published : 15 Sep 2026, 10:39 PM
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোটের সম্ভাব্য সময় ঘোষণার পর এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে সরকারের কয়েকজনের তরফে; অসন্তুষ্টির সুরও দেখা গেছে তাদের কারও কথায়।
সরকারকে না জানিয়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার ‘এখতিয়ার’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা। এমন সমালোচনার পর সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো টানাপোড়েন নেই বলে মন্তব্য এসেছে একজন নির্বাচন কমিশনারের তরফে।
স্থানীয় নির্বাচনের ভোটের তারিখ ঘোষণার বিধান স্থানীয় সরকারের নির্বাচনি আইনের পরিচালনা সংক্রান্ত ধারায় রয়েছে। তবে ভোটের তারিখ জানানোর ‘এখতিয়ার’ নিয়ে তোলা হয়েছে প্রশ্ন।
স্থানীয় সরকারের ইউপি ভোট সাত ধাপে করতে নভেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে সম্ভাব্য সাতটি দিন নির্ধারণ করেছে ইসি। ১২ নভেম্বর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদগুলোতে ধাপে ধাপে ভোট করার সিদ্ধান্তের কথা সোমবার ঘোষণা করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি।
পরদিন সোমবার স্থানীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি বলে তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাদের কথায় অসন্তুষ্টির সুরও প্রকাশ পেয়েছে।
সাংবিধানিকভাবে সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা, সীমানা পুনর্বিন্যাস, সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতির নির্বাচনই ইসির মূল দায়িত্ব; স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভোটের আয়োজন করে থাকে সাংবিধানিক সংস্থাটি।
এবার ইউপি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে সরকারের উপদেষ্টার বক্তব্য ও ইসির এখতিয়ারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, “এখতিয়ার নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। তবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। নির্বাচন করার জন্য ক্ষমতাটা দেওয়া হয়েছে ইসিকে। সরকারের অনুরোধের পর ইসি ভোটের উদ্যোগ নেয় এবং তফসিল দিয়ে থাকে।”
এ বিষয়ে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা তফসিল ঘোষণা করিনি; ভোটের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছি। এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হবে। সম্ভাব্য তারিখগুলো নিয়ে আলোচনা হবে, এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।”
এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, স্থানীয় সরকার আইন অনুসারে স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে। এখানে আইনে এমন কিছু নাই যে সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা ব্যাতিরেকে করতে পারে। এটা সমন্বয়ের ব্যাপার।
নির্বাচন কমিশনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা একটা সম্ভাব্য পরিকল্পনা। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
“আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা ১৭ সেপ্টেম্বর আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে সচিবরা মতামত দেবেন। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ভবিষ্যতের নির্বাচনের তফসিলগুলো সাজাবেন। মনে হয় অন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে।"
এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ইসি ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন, মে মাসে সংরক্ষিত ৫০ নারী আসন ও অগাস্টে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ করে এবার মেয়াদোত্তীর্ণ স্থানীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে।
জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন রেখে সবার আগে ইউপি শুরু করতে চলতি মাসে তফসিল দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ধারাবাহিকতায় সাড়ে চার হাজার ইউপির বিষয়ে সোমবার নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি সাত দফায় নির্বাচনের সাতটি তারিখের ঘোষণা দেন।
এগুলো হল- প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চর্তুর্থ ধাপ ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে।
ইসির সম্ভাব্য ভোটের দিন নির্ধারণের ঘোষণার পরদিন মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন তারিখ জেনেছেন তিনি।
“আমি দেশবাসীকে জানাতে চাই, এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি।”
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, এই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইসিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কবে নাগাদ নির্বাচন করবে।
কার এখতিয়ার কতটুকু
স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের মধ্যে ৬৩টি জেলা পরিষদ, পাঁচ শতাধিক উপজেলা, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৪৫৮১টি ইউপি রয়েছে।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, যখন যে নির্বাচন হবে সেটির আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচন উপযোগী প্রতিষ্ঠানের সার্বিক তথ্য, কবে মেয়াদ শেষ হবে, কোনটিতে সীমানা/মামলা নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে, কোনগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ এসব বিষয় তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
“এবার সাত ধাপে ইউপি ভোট নিয়ে যে তারিখগুলো ইসি জানিয়েছে-আমার মনে হয় এটা একটা কর্মপরিকল্পনা; এক ধরনের রোডম্যাপ বলা যায়। এখনওতো ভোটের জন্য বিস্তারিত সময়সূচি বা তফসিল নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেনি। ইসির আগাম কর্মপরিকল্পনা দেওয়ায় সামনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের জন্য ভালো হবে; এরপরই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”
এই নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করতে সরকারের সব ধরনের সহায়তা দরকার রয়েছে। এখন আলোচনা হবে। ইসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও দেশের ভেতরের একটি সংস্থা; সেক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই স্থানীয় নির্বাচনটি করতে হবে।
১৯৮৭ সালে ইসি সচিবালয়ে যোগ দেওয়া সাবেক আরেক কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে একবারই ইউপি নির্বাচন করেছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সরকারের অনুরোধের পরও তৎকালীন সিইসি ইউপি ভোট করতে রাজি হননি। তখন মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে নির্বাচন করেছিল, তাতে ইসির কোনো কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন না।
এরশাদের আমলে একদিনে চার হাজার ইউপি নির্বাচন আয়োজনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একবারই একদিনে সব ইউপিতে ভোট হয়েছিল। তাতে সহিংসতায় প্রাণহাণিও ছিল সহস্রাধিক। ২০০০ সালে সিইসি এমএ সাঈদের আমলে উপজেলা নির্বাচনের জন্য সরকার অনুরোধ করলেও তা যথাসময়ে করেনি ইসি; বছর খানেক পরে ভোট করা হয়।
মিহির সারওয়ার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে ইসি বরাবরই যে কাজটা করে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় সরকারকে জানিয়ে দেয় ভোটের সময় হয়েছে। নির্বাচনের উদ্যোগ না নিলে আইন-বিধি মেনে বা সংশোধন করে করণীয় নির্ধারণ করে সরকার। ১৯৯১ সালেও স্থানীয় সরকারের মেয়াদ ছিল তিন বছর। পরে সরকার আইন করে মেয়াদ বাড়ায়, ভোট হয় পরে।
“সংবিধানে বলা রয়েছে ইসি কোন কোন নির্বাচন করবে। চারটি কাজ ছাড়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করার কথা সংবিধানে বলা নেই। আর ইউপিসহ সব কবে হবে তা নির্ধারণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সরকার যখন অনুরোধ করে তখন ইসি এসব নির্বাচন পরিচালনা করে। এবার কমিশনও আলোচনা করে করতে পারত।”
প্রস্তুতি কতদূর?
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরেই নানা উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। মার্চে মাঠ পযায় থেকে তথ্য নেওয়া শুরু করে।
সবশেষ জুলাইয়ে পৌর, উপজেলা, ইউপি, সিটি করপোরেশনের হালনাগাদ তথ্য চেয়ে দ্রুত সীমানা জটিলতা নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়।
এরইমধ্যে ভোটার তালিকা ও সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত হয়েছে অগাস্টে। সেপ্টেম্বরে তফসিল দেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ভোট শুরুর কথা জানায় ইসি।
এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ইসির তারিখ ঘোষণা নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাই। এজন্য সরকারের সহযাগিতা দরকার, সবার সহযোগিতা দরকার। ইসি যে সম্ভাব্য তারিখ দিয়েছে, তা নিয়ে সরকারের সাথেও কোনো টানাপোড়েন নেই, থাকার কথাও নয়। নভেম্বরে ভোটটা শুরু করতে চাই আমরা।
“এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হবে, সেখানে মতামত পাওয়ার পর চূড়ান্ত হবে।”
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি ইসি সচিবালয় দেখবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে ‘স্পষ্টভাবে’ কিছু বলেননি ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
এ বিষয়ক প্রশ্নে তিনি বলেন, “উনি (প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম) যেটা বলেছেন সেটা শিরোধার্য। এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।
“আলোচনাতো একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।”
তিনি বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।
আরও পড়ুন
৭ ধাপে ইউপি নির্বাচন, প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ওয়ার্ড ও সীমানা বিন্যাস দ্রুত শেষ করার তাগিদ ইসির
সরকার সিদ্ধান্ত নেবে ভোট কবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা
ইউপি নির্বাচন: ভোটের খবর জানেন না প্রতিমন্ত্রী, ইসি সচিব বললেন, ‘নো কমেন্টস’
স্থানীয় নির্বাচন: মাঠ প্রস্তুতির অগ্রগতির তথ্য পর্যালোচনা করছে ইসি
ইউপি নির্বাচন: নির্দলীয় ভোটে দলের সহায়তা চেয়ে মতবিনিময় করবে ইসি