এবার পূজায় বাংলাদেশের ইলিশ পাবে ভারত?
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব বলেছেন, বিষয়টি তিনি জানেন না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নানা রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে সাতবছর পর দুর্গাপূজায় ভারতে বাংলাদেশের ইলিশ না যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শনিবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হবে। তার ঠিক দুদিন আগে, বুধবার মধ্যরাত থেকে ইলিশ মাছ ধরা, কেনা-বেচা, পরিবহন, মজুদ ও বাজারজাতকরণের ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে, যা শেষ হবে ২৯ অক্টোবর।
অথচ এখন পর্যন্ত ভারতে ইলিশ রপ্তানির ব্যাপারে সরকারের তরফে কোনো সিদ্ধান্ত মেলেনি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব বলেছেন বিষয়টি তিনি জানেন না।
২০২৪ সালে গণআন্দোলনের মুখে দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলের পতন ঘটলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই সময় ভারতে ইলিশ পাঠানো নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কিন্তু রপ্তানি বন্ধ হয়নি।
সমালোচনার মুখেও তখনকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছিলেন, ভারতের ‘বিশেষ অনুরোধে’ সেখানে ইলিশ যাচ্ছে।
এদিকে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের জন্য নানা ফোরামে চেষ্টা হচ্ছে, তখনই পূজার মধ্যে ভারতে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হল।
ইলিশ আমদানির জন্য গত অগাস্ট মাসে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠায় ভারতের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামতের জন্য চিঠি পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
চিঠিতে ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমতির বিষয়ে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং এ বছর ইলিশ মাছের উৎপাদন পর্যালোচনা করে মতামত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এরপর এক মাসের মত চলে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মতামত মেলেনি।
ফলে এবছর পূজায় ভারতে ইলিশ মাছ যাচ্ছে না বলেই ধারণা করছেন একাধিক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার তরফে উত্তর মেলেনি।
পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।
“আমি জানি না। আমি জানি না এটার সম্পর্কে সর্বশেষ। অফিসে খোঁজ নিয়ে বলতে পারব। সর্বশেষ আমি জানি না।”
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তবে কোনো অগ্রগতির তথ্য তারা দিতে পারেননি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি শাখার একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তারা বলছেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত ছাড়া ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন বা নাকচ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
তাদের মধ্যে এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত যদি ইতিবাচক হয়, মানে রপ্তানির পক্ষে মতামত মেলে, তখন অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য সাধারণত দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে।
“তখন ফাইল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে (সিসিআইই) পাঠানো হয়। তাদের অনুমোদনের জন্য অন্তত এক দিন সময় লাগে। তারপর শুরু হয় রপ্তানির প্রক্রিয়া। সেজন্য ১০ দিনের মত সময় লাগে পূজোর আগে। ফলে বলা যায়, এবছর পূজার আগে ভারতে ইলিশ রপ্তানি সম্ভব নাও হতে পারে।”
এর মধ্যে ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে ইলিশ ধরা, কেনা-বেচা, বা মজুদ করা যাবে না।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, “ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মা ইলিশ রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। বরিশাল, চাঁদপুর ও ভোলাসহ ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”
সাতবছর পর এবারই প্রথম
২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে আসছিল বাংলাদেশ। সাতবছর পর এবারই প্রথম বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়ল।
এই রপ্তানির মূলে থাকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ত্রিপুরা ও আসামেও বাংলাদেশের ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেখানকার মানুষ চড়া দামে হলেও ইলিশ কেনার জন্য মুখিয়ে থাকেন। পদ্মার ইলিশ বিক্রি নিয়ে মাছ ব্যবসায়ীদেরও প্রবল আগ্রহ থাকে।
মৌসুম এলেই বাংলাদেশের ইলিশের অপেক্ষায় থাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। বিশেষ করে দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি হবে কিনা, তা নিয়ে প্রতিবছর আলোচনা হয়।
২০২৪ সালের অগাস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকলেও ভারতে ইলিশ পাঠায় বাংলাদেশ।
ওই বছর ২২ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে এটা (রপ্তানির অনুমোদন) দিয়েছেন। তারা একটা অনুরোধের প্রেক্ষিতে দিয়েছেন।
"ভারতের দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ অনুরোধ ছিল, সে অনুযায়ী তারা করেছেন। সেটা তাদেরকে তো আমি জোর করতে পারি না।"
ওই সময় দুর্গাপূজার শুরুর দুই সপ্তাহ আগে ভারতে তিন হাজার টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
দুর্গাপূজা ঘিরে প্রতি বছরের মত সেবার বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি করতে চেয়ে ১১ সেপ্টেম্বর চিঠি দেয় ভারত। এর ১০ দিনের মাথায় রপ্তানির সিদ্ধান্ত জানায় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই ধারা চলে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় বছরেও।
তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। ভরা মৌসুমে ভারত থেকেই বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৫৫৩ টন ইলিশ এসেছে; যার আমদানি (এলসি) মূল্য নয় লাখ ১০ হাজার ডলার।
ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ছিল ছয় কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশের আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। আর অগাস্টে তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি মাছের ঘোষিত মূল্য দাঁড়ায় ছয় কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
জুলাই ও অগাস্টে মোট ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ইলিশ এনেছে। জুলাইয়ে তিনটি এবং অগাস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করে।
এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হলে মৎস্য অধিদপ্তর ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করে দেয়। তাতে আমদানি বন্ধ হয়।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে এক হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
উল্টো দিকে বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি অনুযায়ী, ইলিশ শর্তসাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্য। সরকারের অনুমতি নিয়ে এটি রপ্তানি করা যায়। ২০১৯ সাল থেকে দুর্গাপূজার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়ে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতিবছর গড়ে ৫ হাজার টন ইলিশ বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হচ্ছিল। তবে ২০১২ সালের পর থেকে রপ্তানি অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর গত সাত বছর ধরে কেবল দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ যাচ্ছিল।
এরমধ্যে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ৫০০ টন রপ্তানি অনুমোদনের বিপরীতে পুরোটাই ভারতে রপ্তানি হয়েছে; পরের বছর ১ হাজার ৮৫০ টন রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ওই পরিমাণ ইলিশই ভারতে গেছে।
২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন মিললেও রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ২০০ টন; ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টন এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছিল বাংলাদেশ, রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টন।
এরপর ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪২০ টন অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল আর রপ্তানি হয়েছে ৫৭৭ টন। সর্বশেষ গতবছর ১ হাজার ২০০ টন অনুমোদনের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৫০ টন।
