Published : 14 Jan 2026, 09:33 PM
ইসলামপন্থিদের ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটে আসন ভাগাভাগির মীমাংসা এখনো হয়নি।
টানা কয়েকদিন বৈঠকের পরও সমঝোতা না হওয়ায় বুধবার সব দলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আবার বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনে জোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার কথা বলেছিল জামায়েত ইসলাম।
তবে সেই সংবাদ সম্মেলন হঠাৎ স্থগিত করা হয়েছে। এদিন দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিতে দিয়ে এ কথা জানিয়েছেন।
কেন স্থগিত করা হয়েছে, এ বিষয়ে জামায়াত নেতা আযাদের বক্তব্য মেলেনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলছেন, জামায়াতকে নিয়ে ‘অবিশ্বাস’ দানা বেঁধেছে।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় পার্টির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে দেশের আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা থেকেই নতুন করে ইসলামন্থি ১১ দলীয় জোটে ‘বিভেদ’ তৈরি হয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রত্যাশিত আসনে ছাড় না পেলে এবং মূলনীতির বিষয়ে একমত না হলে শেষ পর্যন্ত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আপিল নিষ্পতির ধাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০ জানুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি নিয়ে আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আটটি ধর্মভিত্তিক দল এই জোটের সূচনা হয়।
জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) সে সময় এই মোর্চায় ছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটের রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে আসার ঘোষণা দেয়।
তখন থেকেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের মতপার্থক্যের খবর সংবাদমাধ্যমে আসতে শুরু করে। ইতোমধ্যে জামায়াত ২৭৬টি এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, নিজেদের দাবি অনুযায়ী কমপক্ষে দেড়শ আসন না পাওয়ায় চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন ‘অসন্তুষ্ট’। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৫টি আসনে নির্বাচন করতে নাখোশ দলটির নেতা-কর্মীরা।
আসন নিয়ে আরো কয়েকটি দলেও ক্ষোভ রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৫০ আসন চাইলেও পরে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী তাদের ১৩ আসনে ‘রাজি করিয়েছে’ বলে পত্রিকায় খবর এসেছে।

একইভাবে খেলাফত মজলিস ২৫টিরও বেশি আসন চাইলেও পাঁচটি আসন নিয়েই তাদের তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন দুটো করে এবং বিডিপি ও জাগপা একটি করে আসন নিশ্চিত করতে পেরেছে খবরে প্রকাশিত হয়েছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, জোটে নতুন আসা এনসিপি অর্ধ শতাধিক আসন চাইলেও ৩০টি আসনের বিষয়ে তাদের প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল। তবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত মীমাংসা এখনো হয়নি।
মীমাংসার বিষয়টি জানাতেই বুধবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল ১১ দলীয় জোট।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আযাদ বলেছিলেন, “আমরা বৈঠক করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়ে দেব।”
এদিন দুপুরে হঠাৎ এই জামায়াত নেতা সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান, বুধবারের ১১ দলীয় জোটের সংবাদ সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়েছে।
জোটের সবশেষ অবস্থা এবং ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে গড়ে উঠা ‘বিভেদ’ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
১১ দলীয় জোটে ইসলামী আন্দোলন থাকছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা তো এটার (জোটের) উদ্যোক্তা, তাই না? আমাদের শক্তি সামর্থ্য কি, এটা আমরাও জানি, দেশের মানুষও জানে। আমরা চেষ্টা করছি, আমরা যাতে ঐক্যটাকে টিকিয়ে রাখতে পারি এবং ন্যূনতম একটা সমঝোতা বা সমন্বয় যাতে থাকে, আমরা সেই চেষ্টাটাও করে যাব। যদিও নানা প্রতিকূলতা আছে, নানাবিধ সংকট আছে তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাব।”
দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর বলেন, “সমস্যা তো আছেই, সংকট তো আছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন আমরা তো স্বাধীনভাবে রাজনীতি করি, আমরা তো কারো চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয়, আমাদেরকে মেনে নিতে হবে? সেটা তো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অতীতেও সেই রাজনীতি করে নাই।
“আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত অবস্থায় তো আমরা আছি। এখানে কেউ যদি আমাদের প্রতি কোনো অবিচার করে বা কেউ যদি অসম্মান করে, অবহেলা করে তাহলে সেটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবে তো নিতে পারি না। আত্মসম্মানবোধ তো সবারই আছে। তাই না?”
উল্টো জামায়াতকে নিয়ে ‘অবিশ্বাস’ তৈরি হয়েছে দাবি করে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, “ওইদিন জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে সেখানে ঘোষণা দিয়ে আসলেন যে তারা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন, নির্বাচনের পরেও। তারপরে জাতীয় সরকারের ব্যাপারে তিনি একটা কথা বলে আসলেন। তারপরে আরেকটা কথা বললেন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে বেগম খালেদা জিয়া যে ঐক্য তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের উপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন।
“তো এখন সেই ঐক্যের পাটাতনটা তো বেগম জিয়া জীবদদশাতেই ভেঙে দিলেন। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য এখানে জামায়াতের আমির বললেন।

“এটা আমাদের কাছে একটু সংশয় তৈরি হল। তাহলে কি জামায়াতে ইসলাম জাতীয় পার্টির মত ভূমিকা পালন করবে? জাতীয় পার্টি যেমন আওয়ামী লীগের সাথে সরকারেও ছিল, আবার বিরোধী দলেও ছিল। তাহলে কি এই জাতীয় কোন ডিজাইনে তারা যাচ্ছেন? এটা নিয়েও কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা শঙ্কা আছে।”
তিনি বলেন, “যেহেতু চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঠিক হয় নাই। গতকাল পর্যন্ত আমরা সেটা পারি নাই। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আমাদের গোটা বাংলাদেশের আমাদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমাদের যে জনশক্তি আছে, নির্বাচনটা আমরা কীভাবে করব এবং ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এই বিষয়টার রূপরেখা আগামী দুই-একদিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিব।
“সমঝোতা মানে হলো এখানে কেউ কারো উপর আধিপত্য করবে না, তাই না? কেউ কারো উপর চাপ প্রয়োগ করবে না, এখন সেই পরিবেশটা যদি থাকতো, আসন কম বেশি এটা বড় কোনো সমস্যা, আমার মনে হয় এখানে থাকতো না। এখানে আসনটা খুব বড় একটা ‘ফ্যাক্টর’ না। অযৌক্তিক কোনো বিষয় নিয়ে আমরা, এখানে আমাদের অবস্থান থাকবে না। আমরা যৌক্তিকভাবেই আমাদের নির্বাচনি যাত্রাটা শুরু করবো। এখানে ভালোবাসা শ্রদ্ধার সম্পর্ক না থাকলে এক সাথে পথ চলাটা কঠিন হয়ে যাবে।”
ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, “তবে আমরা কি করব সেই সমাপ্তির জায়গায় আমরা এখনো যাই নাই। সেটা আমরা আপনাদেরকে জানাবো। এই ব্যাপারে অনেকের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, কথাবার্তা হচ্ছে।”
তবে হুট করে তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না তুলে ধরে গাজী আতাউর বলেন, “আমরা মানে যৌক্তিক হতে চাই এবং আমরা সবার সাথে আলোচনা করি। সবকিছু বুঝে শুনেই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি। আমরা একটা পথে অগ্রসর হবো।”
১১ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে অন্য কোন জোট গঠন করছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে, এখানে তো নির্বাচনের জন্য, অনেকেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, অনেক রাজনৈতিক দল আছে, এর মধ্যে আমরা অনেকের সাথে আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা ‘ওয়ান বক্স পলিসিতে’ এখনো আছি।”