Published : 21 Jul 2026, 02:26 PM
বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রের বিভিন্ন ফোরামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে এডিট করা ভুয়া ছবির আধিক্য মারাত্মকভাবে বেড়েছে, যেখানে পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নির্ভরযোগ্যতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
পাখিদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের বাইরে নতুন কোনো প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যে কোনো পাখিপ্রেমীর কাছে আনন্দের বিষয়। যুক্তরাজ্যে এমন আবিষ্কার মাঝেমধ্যেই জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়।
গত জুনে উত্তর ওয়েলসের এক উপকূলীয় শহরে দেখা মিলেছিল ‘ওয়েস্টার্ন রিফ হেরন’ বা পশ্চিমা চিলন বকের, যা সাধারণত আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইউরোপে পাওয়া যায়। ঘটনাটি বিভিন্ন পাখিপ্রেমীদের ফোরামে বিপুল সাড়া ফেলেছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
তবে পাখিপ্রেমীদের এ আনন্দের ওপর এখন কালো ছায়া নেমে এসেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘এআই স্লপ’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কৃত্রিম কনটেন্ট।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এখন বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছেন, যারা ছবি এডিটিংয়ের সময় এআই ব্যবহার করছেন তারা যেন সীমিত পরিসরে তা করেন।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর ফলে ‘আইন্যাচারালিস্ট’ ও ‘ম্যাকোলে লাইব্রেরি’র মতো জনপ্রিয় ‘সিটিজেন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্মগুলোর নির্ভরযোগ্যতা হুমকিতে পড়তে পারে। কারণ, বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও তাদের আবাসস্থল পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসব প্ল্যাটফর্মের ডেটা নিয়মিত ব্যবহৃত হয়।
চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনাইয়ের মতো বিভিন্ন জেনারেটিভ এআই প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক প্রসারের কারণে ইদানীং বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র ফোরামগুলোতে বিরল ও আলোচিত পাখিদের ভুয়া ও কৃত্রিমভাবে উন্নত করা ছবির বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
ব্যবহারকারীরা কেবল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উচ্চমানের ভুয়া ছবি তৈরি করে ফেলছেন বা আসল ছবির সৌন্দর্য বাড়াতে এআই দিয়ে পাখির সামনে থাকা কোনো ডাল বা পাতা সরিয়ে দিচ্ছেন, যা অজান্তেই ছবির মূল বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ফেলছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ, যেখানে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রজাতি নিবন্ধনের জনপ্রিয় বিভিন্ন ডেটাবেইসে এরইমধ্যে শত শত ভুয়া ছবি শনাক্ত হয়েছে।
“এ সংকটের প্রকৃত বিস্তৃতি ঠিক কতখানি তা এখনও অজানা। কারণ অনেক ভুয়া ছবি হয়ত অলক্ষ্যেই থেকে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন রেকর্ড দূষিত হতে পারে।”
গবেষণাপত্রটির লেখক ও ‘ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি’র বাস্তুসংস্থানবিদ ড. আলেকজান্ডার লিস বলেছেন, “বর্তমানে ফেইসবুক স্ক্রল করলে আমার মনে হয়, বন্যপ্রাণীর ছবির একটা বড় অংশই আসলে এআই দিয়ে তৈরি। এসব ছবি দেখে কোন প্রজাতি কখন কোথায় অবস্থান করছে তা বোঝার চেষ্টা করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তার ভাষ্য, পুরোপুরি জালিয়াতি বা বানোয়াট ছবি এখনও তুলনামূলক কম এবং সেগুলো সহজে ধরেও ফেলা যায়, যেমন সাইবেরিয়াতে কেউ টুকান পাখি দেখার দাবি করলে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে, অনেকেই এখন আসল ছবি সুন্দর করার জন্য এআই দিয়ে এডিট করছেন, যেখানে অ্যালগরিদমটি অন্য কোনো পাখির শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা অংশ এনে আরেক ছবির পাখির গায়ে জুড়ে দিচ্ছে।
সেন্ট্রাল ব্রাজিলে ‘রেড-উইংড ব্ল্যাকবার্ড’ বা লাল ডানাওয়ালা কালো পাখি দেখার এক ভুয়া দাবির কথা উল্লেখ করেছেন ড. লিস। পাখিটি উত্তর আমেরিকায় পাওয়া যায় এবং ব্রাজিলের ওই অঞ্চলে আগে কখনোই দেখা যায়নি। বাস্তবে পাখিটি ছিল ‘এপলেট ওরিওল’, যা ওই অঞ্চলেরই একটি সাধারণ পাখি।
তবে আলোকচিত্রী ছবিটিকে ‘আরও সুন্দর’ করার জন্য এআই প্ল্যাটফর্মের সাহায্য নেওয়ায় প্রযুক্তিটি পাখিটির গায়ে রেড-উইংড ব্ল্যাকবার্ডের অংশ জুড়ে দিয়েছে, যা ভুয়া রেকর্ড তৈরি করেছে।
“বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের মধ্যে চমৎকার ছবি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। তবে ছবি এডিটে এআই ব্যবহারের কারণে পরবর্তীতে যে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে সেই ঝুঁকিটি থেকেই যায়।”
বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এখনও এ সংকটের প্রকৃত গভীরতা পরিমাপের চেষ্টা করছে। প্রকৃতিপ্রেমীদের সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘আইন্যাচারালিস্ট’, যেখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিচরণের রেকর্ড রাখা হয়, সেখানে থাকা ৬১ কোটিরও বেশি ছবির মধ্যে ১ হাজার ৪০০টি ছবিকে এআই ব্যবহারের দায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্থানান্তর পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে নতুন আচরণ রেকর্ড করা এমন ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে এ বিজ্ঞানের কল্যাণে।
এ গবেষণার সহ-লেখক ও আইন্যাচারালিস্ট-এর কমিউনিটি সাপোর্ট ডিরেক্টর টনি ইওয়ানে বলেছেন, এ ধরনের বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না। তবে তিনি ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
“আমাদের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে সাধারণ মানুষ এমন সব তথ্য পোস্ট করে যা কোনো বিজ্ঞানীর পক্ষে একা এত বড় পরিসরে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি অনেকটা রিয়াল-টাইমে পৃথিবীর বুকে কী ঘটছে তা জানার সেন্সরের মতো কাজ করে।
“যেমন, গাছে কি সময়ের আগেই ফুল ফুটছে? জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার কারণে প্রজাতিগুলো কি উত্তরের দিকে চলে যাচ্ছে? কোনো প্রজাতি কোথায় আছে তা আমরা যত বেশি জানব পরিবেশবাদী হিসেবে তত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।”
“তবে এর জন্য তথ্যটি অবশ্যই নির্ভুল হতে হবে।”