Published : 11 Nov 2025, 02:09 AM
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট কবে হবে—সেই বিরোধ মিটিয়ে দলগুলোকে সমঝোতায় আসতে অন্তর্বর্তী সরকার যে সাত দিনের সময় দিয়েছিল, তা ফুরিয়ে এসেছে।
এই সাত দিনে সমঝোতার কোনো খবর সরকার কিংবা দলগুলোর তরফে আসেনি। এমনকি দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে একসঙ্গে বসার কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়নি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভাষ্য, তারা আলোচনায় বসার জন্য বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাড়া মেলেনি।
অন্যদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে যতটুকু সমঝোতা, তা হয়ে গেছে। এ নিয়ে আলোচনার আর কোনো সুযোগ নেই। আর নতুন করে আলোচনায় বসতে হলে সেটার প্রস্তাব সরকারের তরফে আসতে হবে, কোনো দলের কাছ থেকে নয়।
গেল এক সপ্তাহে নিজেদের দাবির বিষয়ে কোনো পক্ষই নময়নীয় হয়নি। নভেম্বরে গণভোটের দাবিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে নামা জামায়াত প্রয়োজনে ‘আঙুল বাঁকা করার’ হুমকিও দিয়ে রেখেছে।
আর বিএনপি বলছে, সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে; দাবি আদায়ে তারা যদি রাজপথে নামে, তাহলে দেশে ‘সংঘাত’ বেঁধে যেতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াত বা ধর্মভিত্তিক অন্যান্য দলের দাবি মেনে গণভোট কি নভেম্বরেই হবে, নাকি বিএনপিসহ কিছু দলের চাওয়ায় সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনে হবে, সে সিদ্ধান্ত এখন মুহাম্মদ ইউনূসকেই নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে যদি দলগুলোকে আবার আলোচনায় বসাতে হয়, তাহলে সেই দায়িত্বও সরকারের বলে তারা মনে করছেন।

গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিভাজনের সূত্রপাত মূলত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রায় আট মাসের সংলাপের শেষ দিকে এসে।
তবে এই বিরোধকে একপাশে রেখে ঐকমত্যে পৌঁছানো একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’–এ সাক্ষর করে দলগুলো।
২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা এই দলিলে সই করেন।
সবশেষ গেল ২৮ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন।
এর মধ্যে গণভোটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনেও হতে পারে, নির্বাচেনের আগেও হতে পারে।
কমিশনের এমন সুপারিশের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে। কিন্তু সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সুপারিশ হাতে পাওয়ার ছয় দিনের মাথায় এসে গত ৩ নভেম্বর দলগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানায়; সময় দেয় এক সপ্তাহ।
সেদিন উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গণভোট কখন হবে, গণভোটের বিষয়বস্তু কী হবে, জুলাই সনদে বর্ণিত ভিন্ন মতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবগুলোর আলোকে জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ।
“এসব ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
এরপর গেল শনিববার ঢাকায় ‘নির্বাচনী ইশতেহারে প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “যদি রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।”
আর সবশেষ সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দলগুলো মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নিজ থেকেই একটি ‘সিদ্ধান্ত নেবে’।
তিনি বলেন, “সরকার দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দিয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসেনি। তারা যেহেতু সাত দিনের মধ্যে আলোচনায় বসেনি, সেক্ষেত্রে সরকার একটা সিদ্ধান্ত নেবে। আমি তো কাউকে বলতে শুনিনি যে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।”

সরকারের বেঁধে দেওয়া এক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ার জন্য বিএনপিকে দায়ী করছেন জামায়াত নেতারা।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এটা তো স্পষ্ট, বিএনপি চায় নাই। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে তারা এক ধরনের মতামত দিয়েছে। তারা বলছে, গণভোটে অসুবিধা নাই। এখন সুপারিশ পাওয়ার পরে আবার উল্টে গেল কেন?
“এবার সরকার কী করবে, এটা তো সরকারের বিষয়। বিএনপিকে আমরা আহ্বান জানিয়েছি, সরকারও জানাইছে।"
কিন্তু বিএনপি বলছে, কোনো দলের ডাকে তারা নতুন করে আলোচনা বসবে না। কেবল সরকার ডাকলেই তারা বৈঠকে বসবে।
শনিবার ঢাকায় ছাত্রদলের এক আলোচনাসভায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা যদি আমাদের আহ্বান জানায় কোনো বিষয়ে আলোচনা করার জন্য, যে কোনো ইস্যুতে, আমরা সব সময় আলোচনায় আগ্রহী; যাব। কিন্তু অন্য কোনো একটি রাজনৈতিক দল দিয়ে আমাদের আহ্বান জানানো হচ্ছে কেন?”
বিএনপির এমন অবস্থান নিয়ে জামায়াত নেতা আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ঐকমত্য কমিশন কি বেসরকারি? সভাপতি কে? এখানে তো একই ব্যক্তি। সরকারি পয়সায় তো এগুলো হইছে। ওই প্রক্রিয়া তো শেষ। সরকার নতুন করে কী আলোচনা করবে?
“আলোচনা একটাই, সেটা হল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে সুপারিশমালা অনুযায়ী আদেশটা জারি করা। আর গণভোটের আয়োজন নির্বাচনের আগে করতে হবে।”
তিনি বলেন, " এই আলোচনা সরকার আয়োজন করলে অবশ্যই আমরা অংশগ্রহণ করব। আলোচনা আমরা আগেও চাইছি, এখনও চাই। তবে আলোচনা হতে হবে সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে। আমরা আগের অবস্থানেই আছি। সেটা হল, ভিন্ন তারিখে নির্বাচন ও গণভোট হতে হবে।"
এই দাবি আদায়ে ‘আঙুল বাঁকা’ করার হুমকি এসেছে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের মুখ থেকে।
বৃহস্পতিবার পল্টনে এক সমাবেশে তিনি বলেন, “সোজা আঙুলে যদি ঘি না উঠে তাহলে আঙুল বাঁকা করব। কিন্তু ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই, বুঝে নিন। নো হাঙ্কি-পাঙ্কি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।"
নভেম্বরে গণভোটের দাবিতে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক আট দলের আন্দোলনকে ‘স্বৈরাচারী মনোভাব হিসেবে’ দেখছেন বিএনপি নেতারা। নিজেদের দাবি আদায়ে বিএনপির মতো ‘সর্বোচ্চ’ রাজনৈতি দল মাঠে নামলে সংঘর্ষ বেঁধে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন তারা।
শনিবার দুপুরে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘নির্বাচনি ইশতেহারে প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনারে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেমন জানি একটা স্বৈরাচারী মনোভাব চলে আসছে। ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের ৩১ দফার অনেক কিছুই ঐকমত্যের মধ্যে আসেনি, তাই বলে কি আমি মাঠে নামব? আমি জনগণের কাছে যাব।
“কথায় কথায় আপনি দাবি নিয়ে রাস্তায় যাবেন, সেটা হবে না। আপনাদের দাবি নিয়ে মাঠে যাবেন, এর বিপরীতে যদি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দল কর্মসূচি দেয়, তাহলে সংঘর্ষ বাঁধবে না?"

‘সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ’
দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে এমন মুখোমুখি অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার পেছনে সরকারের দায় দেখছেন অনেক রাজনীতিক। সাত দিনের সময় দেওয়ার সরকারের কোনো ‘চালাকি’ কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জামায়াত ইসলামীসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটসহ পাঁচ দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকায় সমাবেশ ডেকেছে।
“দাবি মেনে না নিলে তারা কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াত যার যার অবস্থানে অনড় থাকায় সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে উঠেছে।”
নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন পড়লে সেই উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে বলে মনে করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম।
সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এইটা আসলে সরকারের দিক থেকে উদ্যোগটা নেওয়া দরকার; তাহলে মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব। এটা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে হবে।
“আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা কাছাকাছি আসছে এবং তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করুক না করুক, তারা প্রত্যেকে একটা সমাধান চায় এবং সরকার উদ্যোগ নিলে সেটা পারবে।”
তবে দলগুলোর ওপর সমঝোতার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াকে সরকারের ‘দায়িত্বহীন’ আচরণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, "সরকার যেভাবে বলছে যে রাজনৈতিক দলগুলোকে এটার ইয়ে করতে হবে, এটাকে আসলে তাদের দায়িত্বহীন আচরণ মনে করি। তারা আসলে এটা রাজনৈতিক দলগুলির ঘাড়ে ফেলতে চাইছে।"

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সমঝোতার এ চেষ্টাকে সরকারের ‘চালাকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "প্রথমত সংকটটা তো তৈরি করেছে সরকার; ঐক্যমত কমিশন। এই সংকটের পেছনে তাদের ভূমিকা আছে। তারা সমঝোতার বাইরে যেভাবে প্রস্তাব হাজির করেছে, সেটাই হল সংকটের উৎস।
"সরকার সাংবিধানিক বিষয়ে কোনো আদেশ দিতে পারে কিনা, এই প্রশ্নে অধিকাংশ দল বলেছে সাংবিধানিক প্রশ্নে সরকার কোনো আদেশ দিতে পারে না।”
তিনি বলেন, “অধিকাংশ দল বলেছে, নির্বাচনের দিনেই গণভোট হওয়া উচিত ফেব্রুয়ারিতে। উনারা (জাতীয় ঐকমত্য কমিশন) এটাকে দুটো বিকল্প রাখছে—নির্বাচনের আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। তার মানে অধিকাংশ দলের মতামতকে ওনারা আমলে নেন নাই। উনারা অন্য বিকল্পটা ওপেন রেখেছেন।"
তিনি বলেন, "উনারা বলছে যে, এটা নয় মাস লাগবে এগুলো সংবিধানে যুক্ত করতে। এটা হাস্যকর। নয় মাস লাগার কোনো প্রশ্ন নেই।
“আবার বলছে, নয় মাসের মধ্যে কমপ্লিট না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে, অর্থাৎ বাকিগুলো সংবিধানে যুক্ত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। যেটা উদ্ভট; হাস্যকর এবং পৃথিবীর কোথাও কোনো নজির নেই। তাহলে এগুলো হচ্ছে ভুল এবং আপত্তি। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, কিছু জিনিস ইনটেনশনালি করা হয়েছে কোনো দলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য। তাহলে সরকার যেহেতু সংকটটা তৈরি করেছে, তাদেরই উচিত ছিল সংকটের সমাধানের পথ বের করা।”
সরকারের এক সপ্তাহ সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা বলেন, "দলগুলোকে সমঝোতা করার জন্য যেটা বলেছে, এটা একেবারে খুব নিম্ন পর্যায়ের একটা চালাকি আরকি। খুবই নিচু মানের চালাকি।
“তাহলে এখন কী করণীয়? এখন করণীয় হচ্ছে, যেসব প্রশ্নে দলগুলোর সাধারণ ঐকমত্য আছে, সরকার সেটাকে ভিত্তি ধরবে। আর অধিকাংশ দল যেমন মনে করে, ইলেকশনের দিনে গণভোটটা হওয়া উচিত, সরকার তার ওপরে দাঁড়াবে। আর আদেশটা এমনভাবে দেওয়া উচিত, যেন এটা সংবিধানের ওপরের কোনো আদেশ মনে না হয়।”
সাইফুল হক বলেন, "যেহেতু জুলাই সনদে দলগুলো সই করেছে; যেহেতু দলগুলো গণভোটের ব্যাপারে একমত হয়েছে; এখন সরকার নির্বাচন কমিশনকে বলবে যে আপনারা এখন নির্বাচনের দিন গণভোটের আয়োজন করেন। সরকারের দায়িত্ব ফিনিশ। এটুকু বলবে তারা।
“যদি সরকারের ঈমান এবং তাদের উদ্দেশ্য ঠিক থাকে, সংকট উত্তরণটা সহজ হবে। আর ঈমানের মধ্যে, তাদের রাজনৈতিক চিন্তায় যদি কোন কৌশল থাকে, তাহলে নতুন সংকট তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, “যদি বোঝা যায় সরকার কোন না কোন দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তাহলে নতুন বিপদ, নতুন সংকট তৈরি হবে। যেটা রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আগামী নির্বাচনও তাতে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
“আমি মনে করি, সরকার যদি প্রজ্ঞা দূরদর্শিতা দেখাতে পারে, এই সংকট থেকে এখনো বেরিয়ে আসা সম্ভব।"
রাজনীতির বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমানও এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের তো একটা দায়িত্ব আছে। এতদিন ঐকমত্য কমিশন একটা রেফারির ভূমিকা পালন করেছে। এখন যেহেতু ঐকমত্য কমিশন কাজ সম্পন্ন করেছে, তাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে একটা রেফারির ভূমিকা পালন করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, দলগুলো এখন আর আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে না, সেজন্য সরকাররকেই দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
“ এখানে একটা সমন্বয়কারীর ভূমিকার জন্য সরকার আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজটাই হল সবার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।”

হতাশার ইতিহাস
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক সংলাপ হয়েছে। আর ২০১১ সালের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপের পর দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের ব্যবস্থায় ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দুপক্ষের অনড় অবস্থায় সঙ্কট কাটেনি।
স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদ সরকারের আমলে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে ১৯৮৬ সালের দিকে সংবিধান সম্মতভাবে নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা চলে।
১৯৯০ এর ডিসেম্বরে এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্য অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলেছিল।
কমনওয়েলথের উদ্যোগে স্যার নিনিয়ান স্টেফানের মধ্যস্থতায় ১৯৯৪ সালের সংলাপ ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আনুষ্ঠানিক প্রধান সংলাপ। তখনো নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
মাগুরা উপ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তত্ত্ববধায় সরকারের দাবি আনে আওয়ামী লীগ। হরতাল, সহিংসতার মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখন কমনওয়েলথ মহাসচিবের দূত স্যার নিনিয়ান আলোচনার উদ্যোগ নেন।
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব ঘটে।
এ সরকার ব্যবস্থার অধীনে দুটি নির্বাচন হয়। ১৯৯৬ সালের জুনের ভোটে আওয়ামী লীগ ও ২০০১ সালের অক্টোবরের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
২০০৬ সালে এসে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে গোল বাধে আর আন্দোলনি চরম আকার ধারণ করে।
নির্বাচনের আগে আবার মুখোমুখি অবস্থানে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সঙ্গে সংলাপে বসেছিলেন তখন ক্ষমতাসীন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া।
আরেকটি আনুষ্ঠানিক সংলাপ ছিল এটি। কয়েকদিন ধরে আলোচনা চালিয়ে গেলেও সমঝোতার কোনো খবর আসেনি।
আলোচনায় ব্যর্থ হওয়ার পর আন্দোলন ও সহিংসতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জারি হয় জরুরি অবস্থা। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচন হয়।
এরপর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে সংবিধান সংশোধনী আনে। এরপর থেকে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ নিয়ে রাজনৈকি সঙ্কট যেন ‘স্থায়ী’ রূপ পায়।
ভোটের আগে সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চিঠি চালাচালি হয়। তখন সংলাপ হলেও ফল হয়নি।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে না হওয়ায় ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও কারচুপির অভিযোগ তোলে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ফের বর্জন করে বিএনপি ও সমমনারা।
রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে বিদেশিদের তৎপরতার মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দুই পক্ষের সমঝোতায় আনতে এসেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। ২০২৪ সালের ভোটের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিট্যান্ট সেক্রেটারি ডনাল্ড লু এসেছিলেন।
২০১৮ সালে ভোটের আগে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের ফল হিসেবে ভোট অংশ নেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি।
রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে এ তিনটি নির্বাচন নানা কারণে বিতর্কিত হয়।
দুই দলের বিপরীত মুখী অবস্থানে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিজানুর রহমান শেলী (যিনি ২০১৯ সালে মারা যান) বলেছিলেন, “এ পর্যন্ত সব সংলাপ অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তার সমাধান হয়েছে রাজপথে, তীব্র আন্দোলনে।”
এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংলাপের কথা তুলে ধরে তিনি ব্রিটিশ আমলে মহাত্মা গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর গোলটেবিল আলোচনার কথা বলেন।
“পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৮-৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-আইয়ুব খানও পিণ্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গোলটেবিলে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তবে সে আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছিল এবং এর সশস্ত্র সংগ্রামে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের।”
পুরনো খবর