Published : 04 Jun 2026, 03:35 PM
নদী, চর, পাহাড় ঘেরা এক অঞ্চলে গরু চড়ানো আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে টিকে থাকার গল্পময় এক সিনেমা ‘রইদ’। একইসঙ্গে নামহীন ক্ষ্যাপাটে এক তরুণীর অসমাপ্ত গল্পের এক সিনেমা ‘রইদ’। গন্ধম কিংবা তালের রূপকে নরনারীর এক আদিম প্রেমের গল্প ‘রইদ’। নিম্নবিত্ত এক যুবক, গরু চরানোর নামে যে একরকম দাস, বিয়ের পর তার পাগল বউকে নিয়ে শ্রেণি বৈষম্যের এক গল্পের সিনেমা ‘রইদ’।
বিস্তৃত ক্যানভাসে ল্যান্ডস্কেপ, লোকেশানের কাব্যময়তা, জল, মাটি, নদী আর পাহাড়ঘেরা বাংলার এক অনঅগ্রসর জনপদের কাদামাটি ফসলের ঘ্রাণমাখা এক ছবির নাম ‘রইদ’। রূপক আর প্রতিকী ব্যঞ্জনার মাঝে অসমাপ্ত এক গল্পের সিনেমা ‘রইদ’।
‘হাওয়া’র পর মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘রইদ’।
রইদ সিনেমার গল্প মাথায় ছিটওয়ালা এক মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে। সিনেমায় এই মেয়ের কোনো নাম নেই। তার বিয়ে হয় প্রভাবশালী এক লোকের রাখাল সাদুর সাথে। গরু, ছাগল, মহিষ পালা, চরানো, মাছকে খাওয়ানো এই সব নিয়ে ছিল সাধুর দিনকাল।
বিয়ের পর তার জীবন যেভাবে বদলে যাবার কথা ছিল সেটা হয় না। মেয়েটা তাকে স্পর্শ করতে দেয় না। মেলায় নিয়ে যাবার নাম করে সাদু মেয়েটাকে ফেলে আসে অচেনা এক ঘাটে। তারপর একদিন গাছ থেকে তাল পড়ে, আর মেয়েটা ফিরে আসে আবার, জানা যায় সে গর্ভবতী! মেয়েটা দারুণ করে তালের পিঠা বানায় আর সাদুর মনে হয় সে বাপের জন্মে এমন পিঠা খায় নি।
মেয়েটা ফিরে আসার পর ছবির বাঁকবদল কিংবা সাদুর জীবনে নেমে আসে কিছু প্রশ্নের ধারা। যেন সেসব আগুন, তুমুল বৃষ্টি বা তাল হয়ে ঝরে পড়ে তার জীবনে। আসলে এই সিনেমায় গল্পের শেষ নেই, অসমাপ্তও নয়, হয়ত নিজের মত করে বুঝে নিতে হয়!
সিনেমায় সাদু চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও তার স্ত্রীর চরিত্রে নাজিফা তুষি।
তুষি ও ইমরান এই সিনেমার প্রাণ। সাদুর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নুর ইমরান। পাগলীর চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। ইমরান আর তুষির জীবনে এটা মাইলফলক অভিনয়। বড়ভাই তথা মোড়ল টাইপ চরিত্রে অভিনয় করেছেন গাজী রাকায়েত। আরও আছেন আহসাবুল ইয়ামিন, রিয়াদসহ কয়েকজন। জনপদের খুব সাধারণ মানুষের এই চরিত্রগুলো তারা ছবির মত তুলে ধরেছেন।
শুটিং হয়েছে সুনামগঞ্জের কোম্পানিগঞ্জ শাহ আরফিন টিলা ও এর আশপাশের এলাকায়। শুটিংয়ের জন্য এখানে যত্ন করে গাছ লাগানো হয়েছিল। পরিচর্যা করে এটাকে বড় করে তোলা হয়। সবুজ পরিবেশে সেট ফেলা হয়। যে বাড়িতে সাদু ও তার বউ থাকত, সিনেমার গল্পে সেটা আগুনে পুড়ে যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রকৃতি আর চারপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য এই সিনেমার অন্যতম ভালো দিক।
‘রইদ’ সিনেমার গানগুলোও ভিন্নরকম যদিও খুব সামান্য অংশ ব্যবহৃত হয়েছে। গান হিট তো ছবি হিট-এই ফর্মূলা যা ‘হাওয়া’ সিনেমার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছিল, সে কারণে কী না জানি না, শ্রুতিমধুর গানগুলো সিনেমায় নেই বললে চলে। ‘রইদে আইলা গা জুড়াইতে’ শিরোনামের গানটি গেয়েছেন ও লিখেছেন সহজিয়া ব্যান্ডের রাজীব আহমেদ রাজু এবং সঙ্গীতে ছিলেন রশীদ শরীফ সোয়াইব। ‘রহে না’ শিরোনামের গানটি গেয়েছে ‘মেঘদল’ ব্যান্ড।
ইমন চৌধুরীর ‘মন ছাড়া কী’ শিরোনামের গানটিও আবেগঘন এক গান। সোহাগ চক্রবর্তীর সংগীতায়োজনে এবং বশর কোম্পানির কথা ও সুরে ‘প্রেম জ্বালা’ শিরোনামের গানটি গেয়েছেন নাজিফা তুষি। এছাড়া ‘দুই দিন বাকি’ শিরোনামের একটি গানও আছে ‘রইদ’ সিনেমায়।
‘রইদ’ সিনেমার কাহিনীকার মেজবাউর রহমান সুমন এবং সেলিনা বানু মনি। চারজন লিখেছেন চিত্রনাট্য। তারা হলেন মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিদ ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ন শাহেদ বিমান। সিনেমার অন্যতম ভালো দিক এর চিত্রায়ন।
চিত্রগ্রহণে ছিলেন জোহায়ের মুসাব্বির জ্যোতি। বঙ্গ এবং ফেসকার্ড প্রডাকশন কোম্পানির প্রযোজনায় সিনেমার প্রযোজকরা হলেন প্রযোজক মুশফিকুর রহমান মঞ্জু, মেজবাউর রহমান সুমন, মিুল চন্দ্র বিশ্বাস, তানভীর হোসেন ও তানভীর আহমেদ শোভন।
অসাধারণ প্রকৃতি বিন্যাসের সঙ্গে ছাগল কুলসুমকে নিয়ে পাগলীর আসা, তালের পিঠা বানানো, রাতের নৌকা চালানো, মানুষের লাগিয়ে দেওয়া আগুনে ঘর পুড়ে যাওয়া, ভয়াবহ বৃষ্টির সময়ে ছাগল, বাছুর, মোরগ, মুরগি, ভেড়া সব এক কক্ষে আশ্রয় নেওয়া, মাছকে খাবার দেওয়া, গরু ছাগল চরানোর দৃশ্য মানুষকে অন্যজগতে নিয়ে যাবে।
একই সঙ্গে সৃষ্টিলগ্নের সেই আদম হাওয়ার গল্প ও আগুনে নিঃস্ব হওয়া বা স্বর্গ পতন, পাগলীর হারিয়ে যাওয়া আবার মরিয়মের মত গর্ভাবস্থায় ফিরে আসা, অগণিত তাল পড়ার মাঝে ঘোর হারিয়ে সাদুর চলে যাওয়ার দৃশ্য ছবিকে ভিন্নরকম দ্যোতনা দেয়।
সব সিনেমারই কিছু ‘ভিন্নদিক’ থাকে। ওয়াইড শটে নেওয়া দিন ও রাতের দৃশ্যের অদলবদলের মাত্রা বেশি মনে হয়েছে। জীবনের রং দেখানোর জন্যই রাত ও দিনের দৃশ্যগুলো খানিক অন্ধকার ঘেরা কী না সেই প্রশ্নও চলে আসতে পারে। সাধারণ দর্শকদের কাছে এই সিনেমারর রহস্যময়তা বা মিমাংসা না হওয়া প্রশ্নগুলো খানিক জটিল মনে হলেও হতে পারে। বাচ্চা দেবার পর ছাগল কুলসুমের মৃত্যু এবং সেটাকে আয়োজন করে খাওয়া বিখ্যাত এক গল্পকে মনে করিয়ে দেয়।
তবু সবকিছু মিলিয়ে অন্যরকম ভালোলাগার এক সিনেমা ‘রইদ’। মনে রাখার মত এক সিনেমা ‘রইদ’। পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন ও তার ‘রইদ’ টিমের সবাইকে হ্যাটস অব স্যালুট।
জয় হোক বাংলা সিনেমার।
আহসান কবির: লেখক, কলামিস্ট ও অভিনেতা। বৈশাখী টেলিভিশনের অনুষ্ঠান প্রধানের দায়িত্বে আছেন।