Published : 03 Jul 2026, 02:50 PM
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে ভোট দিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী কোনো ধরনের আইনি জটিলতা বা ‘কোর্ট-কাচারি’র পরিস্থিতি তৈরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা আবুল হায়াত।
ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, বিজয়ী সবাইকে ব্যক্তিগত ‘কাদা-ছোড়াছুড়ি’ ভুলে চলচ্চিত্রের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বিএফডিসিতে ভোট দেওয়ার পর আবুল হায়াত বলেন, "আমার প্রত্যাশা হল, নির্বাচনের পর যখন একটি দল জিতবে বা এতগুলো লোক বিজয়ী হয়ে আসবে, তখন সবাই মিলে যেন একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে। তবেই একটা ভালো কিছু হওয়া সম্ভব।"
বিগত কয়েকটি নির্বাচনের অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, "ভোট শেষ হওয়ার পরেই যদি আবার সেই কোর্ট-কাচারি, আদালত—এসব শুরু হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আবার যেই কি সেই হয়ে থাকবে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কখনোই আমাদের কাম্য নয়।"
এবারের নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আবুল হায়াত বলেন, "এবার ভোটের পরিবেশ আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। আমি যখনই ভোট দিতে আসি, সব সময় পরিবেশ সুন্দরই দেখি; কোনো অসুন্দর বা অপ্রীতিকর কিছু আমার চোখে পড়ে না। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবারের নির্বাচনের পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।"

তিনি ভোটকেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর ৭ নম্বর ফ্লোরে ক্যান্টিনের সামনে তৈরি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। আবুল হায়াতের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আরেক প্রবীণ অভিনেতা, পরিচালক কাজী হায়াতের।
দীর্ঘদিন পর দুই বর্ষীয়ান 'হায়াত' মুখোমুখি হতেই একে অপরের সঙ্গে হাত ধরে কুশল বিনিময় করেন, শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন।
কাজী হায়াৎ আক্ষেপের সুরে বলেন, " আমার শরীরটা এখন আর ঠিক নেই। শুনলাম আপনিও সবেমাত্র ক্যানসার থেকে সেরে উঠেছেন।"
একে অপরের এই অসুস্থতার কথা শুনে দুজনেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং পরম মমতায় একে অপরের জন্য দোয়া চেয়ে বিদায় নেন।
এর আগে ভোট দিয়ে কাজী হায়াতও নতুন কমিটির কাছে শিল্পীদের কল্যাণে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রত্যাশার কথা বলেন।
নির্বাচনের সুন্দর পরিবেশের প্রশংসা করে তিনি বলেন, "এবারের ভোটের পরিবেশ খুব শান্ত, সুন্দর এবং হৃদ্যতাপূর্ণ। দুই পক্ষই বেশ ইতিবাচকভাবে ভোট চাইছে—কেউ ফুল অফার করছে, আবার কেউ চকলেট অফার করছে। সব মিলিয়ে একটা দারুণ আনন্দমুখর ও উৎসবমুখর পরিবেশে ইলেকশন হচ্ছে।
"আর যিনিই জয়ী হয়ে আসবেন, তার প্রতি আমার প্রত্যাশা থাকবে—শিল্পী সমিতির ফান্ড বর্তমানে অনেক কম, তাই এই ফান্ড বৃদ্ধি করতে হবে এবং সমিতিটাকে আরও উন্নত করতে হবে। সর্বোপরি, শিল্পীদের কল্যাণে একটা স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।"

ভোট দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন অভিনেতা আজিজুল হাকিম ও কৌতুক অভিনেতা হারুন কিসিঞ্জার। আজিজুল হাকিম বলেন, "ভেতরে খুব সুশৃঙ্খলভাবে ভোট গ্রহণ হচ্ছে।"
অন্যদিকে হারুন কিসিঞ্জার বলেন, "আমরা ভোট সুষ্ঠু দেখছি। যারা এফডিসির জন্য কাজ করবে, শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করছেন, তাদেরই ভোট দিয়েছি।"
অভিনেতা আলমগীর, উজ্জ্বল, মিশা সওদাগরকে একসঙ্গে ভোট দিয়ে বের হয়ে আসতে দেখা যায়।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিএফডিসি প্রাঙ্গণে ২০২৬-২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
সকালের দিকে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রজুড়ে যেন এক উৎসবের মেলা বসে। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহকর্মীদের কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কুশল বিনিময়, কোলাকুলি আর ছবি তোলায় মেতে ওঠেন শিল্পীরা।
প্রধান ফটক থেকেই বিভিন্ন বুথ সাজিয়ে ভোটারদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নিতে দেখা যায় প্রার্থীদের।

ভোটকেন্দ্রের প্রবেশমুখে ভোটারদের স্বাগত জানাতে একদম সকাল থেকেই উপস্থিত ছিলেন সভাপতি পদপ্রার্থী শিবা সানু, আরমান এবং সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী রুমানা ইসলাম মুক্তি ও চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী।
তাদের সঙ্গে প্রচারে অংশ নিতে দেখা যায় চিত্রনায়িকা পলি, শিরিন শিলা, কায়েস আরজু, কামরুজ্জামান কমল, সনি রহমান ও রিনা খানসহ দুই প্যানেলের বিভিন্ন পদের প্রার্থীদের।
নির্বাচন কমিশনার খোরশেদ আলম খসরু জানিয়েছেন, দুপুর ১ টা পর্যন্ত ১০২ টা ভোট পড়েছে।
“যেহেতু আজ ছুটির দিন, নামাজের আগ পর্যন্ত ভোটার কম। নামাজের পর সংখ্যা বাড়বে বলে আমাদের প্রত্যাশা।”
এবারের নির্বাচনে মোট ৫৭৩ জন ভোটার। তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।
নির্বাচনে এক প্যানেলে থেকে সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন ফাইটার ও প্রযোজক আরমান, তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি।
অন্য প্যানেলে শিবা সানু সভাপতি পদে এবং জয় চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়েছেন।
আরমান-মুক্তি পরিষদে সহ-সভাপতি পদে লড়ছেন চিত্রনায়িকা নূতন ও খলনায়ক ইলিয়াছ কোবরা। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে রিনা খান, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চুন্নু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে এম এ পারভেজ চৌধুরী আবীর, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে রাসেল মিয়া, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে মারুফ আকিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদে খল অভিনেতা কামরুজ্জামান কমল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ প্যানেলের কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থীরা হলেন- মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, দুলারী, রাকা, শারমিন আক্তার, লতিফ (চিতা), নাসরিন, সুশান্ত, শাহীন কমেডি, বাদল শেখ, আরমান খান ও শামীম খান (চিকন আলী)।
শিবা সানু-জয় চৌধুরী পরিষদ থেকে সহ-সভাপতি পদে ডি এ তায়েব ও রোজিনা; সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সনি রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে পলি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুশফিকুর রহমান কাকন, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে জ্যাকি আলমগীর এবং কোষাধ্যক্ষ পদে জাদু আজাদ প্রার্থী হয়েছেন।
এ প্যানেলের কার্যকরী পরিষদ সদস্য প্রার্থীরা হলেন- আলীরাজ, ফরহাদ, শিপন মিত্র, ফিরোজ শাহী, ইয়ামীন হক ববি, হাসান জাহাঙ্গীর, শিরিন শিলা, ফাল্গুনী রহমান জলি, কায়েশ আরজু ও কাবিলা।
এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কিবরিয়া লিপু, খোরশেদ আলম খসরু ও বি এইচ নিশান।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবার নির্বাচন করছেন স্বপ্না কাশেম, আন্না কামরুননাহার, তাহমিনা হোসেন বেবী, হোসেন আরা রিয়া, পলাশ খান, ইউসুফ খান।