অনন্য নজির গড়ে শেখ হাসিনার টানা চতুর্থবার

আবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির শক্ত অবস্থান আরও পোক্ত হল।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Jan 2024, 11:06 PM
Updated : 7 Jan 2024, 11:06 PM

দেড় দশকে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকারপ্রধান হওয়ার অনন্য নজির গড়তে চলেছেন। 

রোববার অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আওয়ামী লীগ; ভোটের প্রচারে দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার গুরুত্বের কথাই বলে আসছিলেন দলটির নেতারা। 

এবারের ভোটে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২২টিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। একাদশ সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে পেছনে ফেলে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ৬২ জন; যারা সবাই আওয়ামী লীগেরই নেতা। আর জাতীয় পার্টির আসন কমে অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমে নেমেছে ১১টিতে। দুটিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাসদ ও বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টি এবং একটিতে জয় পেয়েছে কল্যাণ পার্টি। একটি আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির শক্ত অবস্থান আরও পোক্ত হল। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বকে ‘হার্ড পাওয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে টাইম ম্যাগাজিন, আর বিবিসির ভাষায় সেটা ‘ওয়ান উইমেন শো’। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম সরকার গঠন করেন তার মেয়ে শেখ হাসিনা। 

তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে হারতে হয় তাকে, যার পেছনে বিদেশের ষড়যন্ত্র ছিল বলে তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় বলে আসছেন। 

এরপর ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হয় তাকে; রাজনীতি থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সেই চেষ্টার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তিনি। 

এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ এর কাছাকাছি, ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ ছুঁই ছুঁই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তিতে ২০২১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ এর ঘরে নেওয়ার কথা সে সময় বলেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কা লাগে অর্থনীতিতে। 

মহামারীর খাড়া সামলানোর মধ্যে দুই বছর পর অর্থনীতির ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’ হিসাবে আবির্ভূত হয় রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ। 

২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে জ্বালানি তেল আর আমদানি পণ্যে উচ্চমূল্যের খাড়া সরাসরি এসে লাগে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে; এরপর একের পর এক রেকর্ড হতে থাকে মূল্যস্ফীতিতে। 

সরকারি হিসাবে, ২০২৩ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতির পারদ ছুঁয়েছে এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে। যদিও অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেছেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি এ হিসাবের চেয়ে বেশি। 

রিজার্ভের নিয়ে গর্ব করার মত অবস্থানে বাংলাদেশ থাকলেও আমদানি ব্যয়ের চাপে ডলার বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা; পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নেয় সরকার। 

চতুর্থবার ক্ষমতায় এসে শুরুতেই লেনদেনে ভারসাম্য এনে ডলার বাজারে স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ থাকছে শেখ হাসিনার সামনে। তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতেও শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে তাকে।

বিদেশে অর্থপাচার খবরের কাগজে শিরোনাম হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে, কিন্তু তার বিপরীতে দৃশ্যমান উদ্যোগ অনুপস্থিত থাকায় দুর্নীতির প্রশ্নটি আসছে জোরেশোরে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক দুর্নীতিতে ১৮০ দেশের মধ্যে এখনও দ্বাদশ অবস্থানে বাংলাদেশ। 

এবারের নির্বাচনি ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। 

দেশ থেকে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয় রোধ, ঋণ-কর-বিল খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্তের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। 

আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদে অবকাঠামো খাতে স্বপ্নের পদ্মাসেতু, ঢাকায় মেট্রোরেল আর নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের মত যুগান্তকারী সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে দেখেছে বাংলাদেশ। 

অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতির মধ্যেও বিদেশিদের কাছ থেকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকোচনের’ সমালোচনা শুনতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। 

দ্বাদশ নির্বাচন ঘিরে বেশ আগে থেকে তৎপর ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিশনগুলো। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান সাত কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তকারী সরকারি কর্মকর্তা, বিরোধীদলীয় কর্মী ও বিচারকসহ সবার উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু করে ২০২৩ সালে।

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলার মধ্যে শ্রম অধিকার রক্ষায় বিশ্বব্যাপী একটি স্মারক ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন হলে নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপ করবে তারা। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে ওই স্মারক রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা। বাংলাদেশের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রায় ৮৪ শতাংশ রপ্তানি আয়ের তৈরি পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয় চিঠিতে। 

নির্বাচন ‘মনঃপুত’ না হলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলে বাংলাদেশকে বড় রকমের ক্ষতির পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। 

অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন করার সমালোচনার প্রেক্ষাপটে একাদশ সংসদ নির্বাচনে যখন সব দলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত ছিল, তখন আকস্মিকভাবে সংলাপে বিএনপিকে ডেকে নিয়ে তাকে নির্বাচনেও এনে রাজনৈতিক কৌশলে এগিয়ে যান শেখ হাসিনা। 

এর মধ্যে দুর্নীতি মামলায় প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে শেখ হাসিনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। বিএনপি আওয়ামী লীগেরই এক সময়ের নেতা কামাল হোসেনকে পাশে রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভোটের মাঠে নামলেও হালে পানি পায়নি। 

শেখ হাসিনা সরকারে থাকাবস্থায় একাদশ নির্বাচনে ভরাডুবির অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এবারও ভোট বর্জন করেছে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। দফায় দফায় হরতাল-অবরোধের মধ্যে ২০১৩-২০১৫ সালের মত নাশকতাও ফিরে এসেছে।

সেই সহিংসতা মোকাবেলা করে এবারও নির্বাচনি বৈতরণী পেরিয়ে এলেন শেখ হাসিনা। ভোটে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়ে এক আসনে নিজ দলের একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। 

এবারের নির্বাচনের ইশতেহারেও আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দিয়েছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর; ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট সোনার বাংলা গড়ার কথা বলছে দলটি। 

শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করবেন তিনি। 

গত ৪ জানুয়ারি নির্বাচনি ভাষণে তিনি বলেন, “চলার পথে যদি কোনো ভুল-ভ্রান্তি করে থাকি, তাহলে আপনারা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন- এটাই আমার আবেদন। আবার সরকার গঠন করতে পারলে, ভুলগুলি শোধরাবার সুযোগ পাব। 

“…আপনাদের মূল্যবান ভোটে নির্বাচিত হয়ে আরেকটিবার সরকার গঠন করতে পারলে আমাদের গৃহীত কর্মসূচিগুলি বাস্তবায়ন করে আপনাদের জীবনমান আরও উন্নত করার সুযোগ পাব।” 

সংসদ ও রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিতের পর এখন শেখ হাসিনার সামনে দুর্নীতি রোধ এবং মানবাধিকার নিশ্চিতের বিষয়টিই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা। 

শেখ হাসিনা বরাবরই বলছেন, তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পান না। বঙ্গবন্ধুকন্যার ভাষায়, তার রাজনীতি নিজের জন্য নয়, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নেই তার এই পথচলা। 

এবারের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার সময় কবির ভাষায় তিনি বলেছিলেন– 

“মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়

আড়ালে তার সূর্য হাসে;

হারা শশীর হারা হাসি

অন্ধকারেই ফিরে আসে।”