Published : 26 Mar 2026, 12:59 PM
একটি বদ্ধ ঘর, ধোঁয়াটে পরিবেশ আর টেবিলের ওপাশে বসে থাকা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু—শুরুটা এভাবেই হয়েছে তরুণ নির্মাতা সালেহ সোবহান অনীমের ‘লাইটস, ক্যামেরা...অবজেকশন’ ওয়েব সিনেমার। এটি চরকি অরিজিনাল অ্যান্থোলজি সিরিজ ‘জাগো বাহে’র একটি পর্ব, যা ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়েছে। এ পর্বটি মূলত জহির রায়হান পরিচালিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়ার পর আটকে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে। নির্মাতার ভাষায়, “এটা একটি চেম্বার ড্রামা। পুরোটাই একটা ডিবেট ছিল। যৌক্তিকতা দিয়ে অযৌক্তিকতা খণ্ডন করা।”
জহির রায়হান তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ যখন শেষ করেন, তখন স্টুডিওর বাইরে ছিল উত্তাল জনতা, আর ভেতরে ছিল সেন্সর বোর্ডের তীক্ষ্ণ কাঁচি, যে কাঁচি চালানো জহির রায়হান মেনে নেননি। অনীমের ‘লাইটস, ক্যামেরা...অবজেকশন’ আমাদের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়। ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলীর ‘আই উইল সি ইউ’—ছিল মূলত একটি স্বাধীনতাকামী জাতির কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার অপচেষ্টা। কিন্তু জহির রায়হান জানতেন, সত্য যখন সেলুলয়েডে বন্দি হয়, তখন তাকে আটকে রাখার সাধ্য কোনো কামানের গোলার নেই। সেই ঐতিহাসিক বাকবিতণ্ডা আর সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসা চলচ্চিত্রটির গুরুত্ব আজ ৫৪ বছর পর আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ধরা দেয়।


ইতিহাসের কণ্ঠে, স্মৃতির গভীরে এবং বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের নির্মাণে কিছু শিল্পকর্ম এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অর্থ আরও গভীরতর হয়ে ব্যঞ্জনা পাচ্ছে। সেগুলো তাই একটি গল্প বা সৃজনশীল সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; আমাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটির কথা বলতে হবে। প্রথমদিকে হয়তো আমরা এটিকে একটি পারিবারিক গল্প বা রাজনৈতিক রূপকের চলচ্চিত্র হিসেবেই দেখেছি, অন্তত পাকিস্তানিদের কাছে নির্মাতা জহির রায়হান এই ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে উপলব্ধি হয়, এ তো আমাদের সমাজেরই গল্প; ঘরের ভেতরের ক্ষমতার টানাপোড়েন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আর মানুষের সাহসের গল্প।
এই কারণেই ‘জীবন থেকে নেয়া’ শুধু একটি চলচ্চিত্র হয়ে থাকে না। এর গল্প এক ধরনের আয়না; যেখানে আমরা বারবার আমাদের সময়, সমাজ এবং নিজেদের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, তবু ওই সত্যগুলো নতুন করে ধরা দেয়।

নির্মাতা জহির রায়হান রূপালি পর্দায় এই চলচ্চিত্রের জটিল কথা খুব সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। একটা পরিবারের গল্প, যেখানে বড় বোনের কড়া শাসনে সবাই আতঙ্কে থাকে। কেউ ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, নিজের মতো চলতে পারে না। বাইরে থেকে দেখলে এটা নিছক পারিবারিক দ্বন্দ্ব মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই পরিবার যেন একটা রাষ্ট্রের প্রতীক। যেখানে ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত হলে অন্যরা নীরব হয়ে যায়, সম্পর্কের মধ্যে ভয় ঢুকে পড়ে।
‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্মিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। তখনকার সময়টা সহজ ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য, সাংস্কৃতিক চাপ সব মিলিয়ে মানুষ ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রটির গল্পে সরাসরি রাজনীতির ভাষা নেই। আছে ঘরের ভেতরের টানাপোড়েন। মনে হয় যেন বলা হচ্ছে, অন্যায় যদি ঘরে সহ্য করা হয়, তাহলে একসময় তা পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার লড়াই শুধু বড় বড় মঞ্চে হয় না; তার প্রভাব পড়ে রান্নাঘরে, বসার ঘরে, মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায়।
তাই, চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ও মুক্তির ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় রাজনৈতিক সেন্সরশিপ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির মধ্যে কাজ করা সহজ ছিল না। শুটিং চলাকালেই ‘জীবন থেকে নেয়া’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। পরিচালক জহির রায়হান ও নায়ক রাজ্জাককে ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে জহির রায়হান বাধ্য হয়ে বন্ডে সই করেন। তিনি লিখিতভাবে বলেন, চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে তার দায় তিনি নেবেন।

এরপর সেন্সর বোর্ডে জটিলতা তৈরি হয়। ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী প্রথমে ছাড়পত্র দিতে চাননি। কিন্তু ওই খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে নামে। শেষপর্যন্ত সরকার চলচ্চিত্রটি মুক্তির অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
মুক্তির প্রথম দিনেই প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, হল থেকে ফিল্ম রিল নিয়ে যাওয়া হয়। আবার নতুন করে সেন্সর বোর্ড বসে। আমজাদ হোসেন গিয়ে নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখের সঙ্গে কথা বলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি সভায় উপস্থিত হন। ছবি দেখে বলেন, এখানে যে সত্য তুলে ধরা হয়েছে, তাকে অস্বীকার করা যায় না। এরপর অনুমতি মেলে।
রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের মূল্য বোঝার জন্য সময়ের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ জরুরি অবস্থার ভারতের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল। তেমনি ‘জীবন থেকে নেয়া’ ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, ছাত্রদের ১১ দফা এবং শহীদ আসাদের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
জহির রায়হান প্রতীকী ভাষায় সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরেন। মুক্তির পর মানুষ নিজেদের সময়কে এই গল্পে খুঁজে পেয়েছিল বলেই এত আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তারপর এল ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। জহির রায়হান স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করলেন। যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে রাজধানীর মিরপুরে বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে চিরতরে নিখোঁজ হন তিনি। তার বিদায় আমাদের ইতিহাসে এক কষ্টের জায়গা হয়ে আছে। তাই এই চলচ্চিত্র দেখতে বসলে শুধু গল্প নয়, পেছনের মানুষটির কথাও মনে পড়ে।
চলচ্চিত্রের গানগুলোও আলাদা করে মনে থাকে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ শুনলে তা আর শুধু গান থাকে না, একটা অনুভূতি হয়ে ওঠে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই গান জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠল। ফলে চলচ্চিত্রটি শুধু শিল্পকর্ম নয়; জাতির আত্মপরিচয় গঠনের সাংস্কৃতিক দলিল।

সূচনাসঙ্গীত ‘ও আমার স্বপ্নঝরা আকুল করা জন্মভূমি’ শুনলেই মনে হয় একটা জাতির হৃদস্পন্দন কানে ভেসে আসছে। কথাগুলো যেন মাটির ভেতর থেকে জেগে ওঠা আকুল আহ্বান। শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে যে ঐক্যের বার্তা ছিল, আজকের বিভক্ত সময়ে তা আরও বেশি প্রয়োজন। ধর্ম আর রাজনীতির তর্কে আমরা কি সেই সরল শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি না?
ওই সময়ের মানুষ বন্দিত্বের মধ্যেও মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’ গানেও ওই আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। সবচেয়ে আশ্চর্য, গানটি শেষ হয় না। কিন্তু ওই অসমাপ্ত থাকাটাই যেন তার আসল শক্তি। কারণ স্বাধীনতার লড়াইও তো একদিনে শেষ হয়নি। খাঁচা ভাঙার আদম্য ইচ্ছা মানুষের ভেতর চিরকাল বেঁচে থাকে।
‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখতে বসলে মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আমরা কি সত্যিই বদলেছি? স্বাধীনতার এত বছর পর অর্থনীতি বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে, শিক্ষা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু মানুষে মানুষে দূরত্ব কি কমেছে? রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক টানাপোড়েন এখনো আছে। কখনো মনে হয়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যত বাড়ে, সাধারণ মানুষ তত বিভ্রান্ত হয়। একে অপরের প্রতি সন্দেহ বাড়ে। আর ওই সুযোগ নেয় কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী। যারা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাকে এখনো প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।
তাই এই চলচ্চিত্রের গল্প গোপনে একটা বড় কথা বলে; ঐক্য শুধু স্লোগানে আসে না, চর্চা করতে হয়। পরিবারে যেমন আস্থা দরকার, রাষ্ট্রেও দরকার সংলাপ ও সহমর্মিতা। ভয় দেখিয়ে কিছুদিন শাসন করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছাড়া স্থায়ী কিছু গড়ে ওঠে না।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যের স্বপ্ন সবকিছুই যেন এই চলচ্চিত্রে নীরবে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গল্পের মধ্য দিয়েই ধরা পড়েছে একটি জাতির গভীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা।

যেমন ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার জন্য দেওয়া ত্যাগ ও আত্মদানের স্মৃতি নতুন করে জাগ্রত হয়, তেমনি এই চলচ্চিত্র মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; আমাদের পরিচয়, মর্যাদা ও জাতিসত্তার মৌলিক ভিত্তি। ভাষার ভেতরেই নিহিত ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্মিলিত স্মৃতি। আর তাই ভাষার প্রতি ভালোবাসা শেষপর্যন্ত স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়।
আবার মার্চ এলে মনে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির মধ্য দিয়েই একটি জাতির জন্ম হয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’ এসব কথা সরাসরি বলে না, তবু গভীরভাবে উপলব্ধি করায় যে, একটি জাতির গল্প আসলে তার মানুষের গল্প, তার ঐতিহাসিক সংগ্রামের গল্প।
সব মিলিয়ে ‘জীবন থেকে নেয়া’ আমাদের সতর্ক করে। যেখানে সমাজ নিজের ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ ভুলে যায়, সেখানে বিভেদের ফাঁদে পড়া সহজ। তাই মার্চ মাস শুধু স্মরণের নয়; অঙ্গীকারের মাস। চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহারানো ও ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ থেকে শক্তি নিয়ে বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে গড়ে তোলাই স্বাধীনতার মাসের প্রকৃত তাৎপর্য। ব্যক্তিগত মুক্তি ও সামষ্টিক মুক্তি একই স্বপ্নের দুই দিক; এই বোধই ইতিহাসকে জীবন্ত রাখে, আত্মপরিচয়কে গভীর করে, চেতনাকে ধারালো করে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ আমাদের ভাবতে শেখায়, ভবিষ্যতের জাতীয় ঐক্যের পথ দেখায়।