Published : 13 Mar 2026, 01:06 AM
২০২৫ সালের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসে আয়োজনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম বিপাকে ফেলেছে। বর্তমানে যারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের ওপর এখন এক অস্বাভাবিক দ্বৈত চাপের বোঝা চেপে বসেছে। একদিকে নতুন ক্লাসের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণির পুরনো সিলেবাস পুনরায় ঝালিয়ে নিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে এমন একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যেখানে নতুন শিক্ষাক্রমের মূল দর্শনই হলো প্রথাগত পরীক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে আনা, সেখানে এই আয়োজন সেই আধুনিক শিক্ষা দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অসময়ে পরীক্ষার বোঝা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, গত বছরের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসে ঈদুল আজহার আগে অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে কেন এই পরীক্ষা? গত বছর যাদের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, তারা এখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ফলে তাদের বর্তমান শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি পুরোনো বছরের পাঠ্যবই ঘেঁটে প্রস্তুতি নিতে হবে—এটা কতটা যৌক্তিক?
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকবে। অর্থাৎ এটি কোনো সাধারণ বার্ষিক পরীক্ষা নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি পরীক্ষা। আর এই প্রতিযোগিতায় এখন অংশ নিতে হবে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের, পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাসে।
এই সিদ্ধান্তে অভিভাবকদের সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাদের মতে, নিয়মিত ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস ও প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি আগের বছরের পাঠ্যবই পড়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যসূচি, শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই ও শিখনপদ্ধতি পুরোপুরি বদলে গেছে। সেখানে অভ্যস্ত হতে না হতেই আবার পুরোনো পদ্ধতির পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে, এটা শিশুদের জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
পাবনা জেলা স্কুলের এক অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তার সন্তানকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য প্রস্তুত করাচ্ছেন। ইতিমধ্যে পড়াশোনার ব্যাপক চাপ রয়েছে। এর ওপর আবার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তার সন্তান হিমশিম খাচ্ছে। শুধু এই এক পরিবার নয়, দেশের অসংখ্য পরিবার এখন একই সমস্যায় পড়েছে। বিশেষ করে যে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য এই অতিরিক্ত চাপ মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থী সাধারণ স্কুলে পড়ে, তারাও এই সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে। কথা হচ্ছিল পাবনার দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে। তারা জানান, পঞ্চম শ্রেণি পাস করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেও তাদের স্কুলে আনা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইছে না। কারণ, তারা গত বছরের বই ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছে। নতুন করে ওই বই সংগ্রহ করাও অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য। উপরন্তু, নতুন শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সঙ্গে পুরোনো বইয়ের অনেকখানি অমিল রয়েছে, যা প্রস্তুতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পাবনার আরেকটি কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আবেদন করাতে অভিভাবকদের সঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করে মাত্র ৫ জনকে পাওয়া গেছে। এই চিত্র সারাদেশেই কমবেশি একই রকম হবে বলে ধারণা করা যায়। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীই এই পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী নয়। তাহলে ওই পরীক্ষা নিতে এত আয়োজনের তাৎপর্য কী?
শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষ্য, একইসঙ্গে দুই শ্রেণির পড়াশোনা করতে হলে টিউশন ও কোচিংয়ের চাপ বাড়বে। এটি তাদের ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি করবে, তেমনি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটা বাড়তি বৈষম্যের কারণও হতে পারে। যাদের পক্ষে ভালো কোচিং সেন্টারে যাওয়া সম্ভব, তারাই কেবল ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরীক্ষা প্রথাগত পরীক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে আনার নতুন শিক্ষাক্রমের মৌলিক দর্শনের পরিপন্থী। নতুন শিক্ষাক্রমে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বৃত্তি পরীক্ষা আবারও পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উল্লেখ্য, নতুন শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্যই ছিল শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যার বাইরে এনে দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান প্রদান করা। কিন্তু এই বৃত্তি পরীক্ষা আবারও সেই পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। শিক্ষাক্রমের দর্শনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বরং এটি একটি পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন অনেকে।
এই পরীক্ষা সচ্ছল ও অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়াবে। যেসব পরিবার ভালো কোচিং ও টিউশনের ব্যবস্থা করতে পারবে, তাদের সন্তানরা ভালো করবে। আর যারা পারবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে। এটি সমাজে শিক্ষার বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। অথচ নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই বৈষম্য কমানো।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও চিন্তা করা জরুরি। এত অল্প বয়সে দুই ধরনের পরীক্ষার চাপ তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও বেশি মারাত্মক হবে।
শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাঝপথে এভাবে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ দেয়া কাম্য নয় একদমই। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের কথা চিন্তা করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সময়োপযোগী ও মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।