১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এনবিআর কী মগের মুল্লুক?

বাংলাদেশে করযোগ্য জনসংখ্যা অনেক হলেও কর নিচ্ছেন মাত্র কয়েক লাখ। এনবিআরের দুর্বল প্রশাসন, অব্যবস্থাপনা এবং ঘুষ-দুর্নীতি রাজস্ব ঘাটতির কারণ। কর সংস্কারের জন্য দরকার প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়।

এনবিআর কী মগের মুল্লুক?
কর প্রশাসনে দুর্নীতি, অপ্রতুল আধুনিকায়ন ও নাগরিক আস্থার অভাবে রাজস্ব সংগ্রহে সংকট চলছে বহুকাল ধরে। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

গোবিন্দ শীল গোবিন্দ শীল

Published : 28 Jun 2025, 08:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:17 PM

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, তাদের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতিকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গত শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে চলমান কর্মসূচির ফলে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দপ্তরগুলোতে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অচলাবস্থা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উদ্বেগজনক। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনবিআর মনে করছে–সরকারি বিধি অনুযায়ী, কর্মস্থলে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা, দেরিতে অফিসে প্রবেশ করা কিংবা ইচ্ছেমতো অফিস ত্যাগ করা শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণ। অর্থবছরের শেষ তিন কর্মদিবসে আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব সংগ্রহ নির্বিঘ্ন রাখতে কাস্টমস হাউস, কর কমিশনারেট ও ভ্যাট কমিশনারেটের সব কমিশনারকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

প্রশাসনের মধ্যে চলমান এই আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। তাদের বেতন-ভাতা উচ্চহারে বাড়ানো হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তাদের মহার্ঘ্য ভাতা বাড়িয়েছে। ফলে তারা এখন দেশের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির একটি অংশে পরিণত হয়েছেন।

এনবিআরে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’: আমদানি-রপ্তানি কাজ বন্ধ হতে চলেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

এনবিআরে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’: আমদানি-রপ্তানি কাজ বন্ধ হতে চলেছে চট্টগ্রাম বন্দরে

এনবিআর দেশের আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নানা অজুহাতে কর্মবিরতি বা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এক ধরনের প্রশাসনিক নৈরাজ্যের ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরা নানা দাবিদাওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু এসব দাবিদাওয়া আদায় বা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক সরকারের, অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে সকল পক্ষকে সংযত থাকা জরুরি।

রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের কাঠামোকে টেকসই করতে পারেনি কর প্রশাসন

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের কর প্রশাসন এখনো রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি। দেশে আনুমানিক চার কোটি করযোগ্য নাগরিক থাকলেও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে মাত্র ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের। অর্থাৎ বিশাল একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো–বছরের প্রথম ৯ মাসেই বাজেট ঘাটতি পৌঁছে গেছে ৬৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়। এমনকি জুলাই থেকে অক্টোবর–এই চার মাসেই শুল্ক কর আদায়ে ঘাটতি ছিল ৩০ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা।

অর্থনীতির এই দুর্বল চিত্র শুধু রাজস্ব আদায়েই সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮১ শতাংশে। গত সাড়ে তিন বছরে এটি সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি–যার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি যে কতটা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে, তা কর ব্যবস্থার এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা এবং সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি পতনের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি, আর বাকি ৬৫ হাজার কোটি টাকা আসবে অন্যান্য উৎস থেকে।

এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৯ শতাংশ। তবে এটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো বেশ নিচে। দীর্ঘদিন ধরেই কর-ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, কর ফাঁকি এবং কর নীতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এই অনুপাতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে।

এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বাড়ানোর যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণে প্রশাসনিক সংস্কার, করদাতার আস্থা অর্জন, এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া বাস্তবে পৌঁছানো কঠিন।

করে বাড়ালেই বেশি রাজস্ব বাড়ে না

কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা অনেক উন্নয়নশীল দেশেরই স্বাভাবিক কৌশল। তবে এই পথে অতিরিক্ত ব্যয় এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে–এমনটাই উঠে এসেছে ২০১৯ সালের এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন অর্থনীতি গবেষক–মায়ারা ফেলিক্স (এমআইটি), রেমা হান্না (হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল), বেঞ্জামিন ওলকেন (এমআইটি)–এবং ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিবিদ এম. ছাতিব বসরি (ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়)। তারা ইন্দোনেশিয়ার করপোরেট কর ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ালেই রাজস্ব আদায়ে আশানুরূপ বৃদ্ধি নাও ঘটতে পারে। কারণ, এসব সংস্কারে যে প্রশাসনিক ব্যয় হয়, তা অনেক সময় বাড়তি রাজস্বের তুলনায় বেশি হয়ে যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যদি সরকার শুধুমাত্র করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়াতে চায়, তাহলে তা ফল উল্টোও হতে পারে। এর কারণ হলো–‘করযোগ্য আয়ের স্থিতিস্থাপকতা’ (taxable income elasticity)। উদাহরণস্বরূপ, যদি এই স্থিতিস্থাপকতার মান ১ হয়, তাহলে আয় ১ শতাংশ বাড়লে করযোগ্য আয়ও ১ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু যদি এটি ২ হয়, তাহলে আয় ১ শতাংশ বাড়লে করযোগ্য আয় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে–কারণ মানুষ কর এড়াতে আয় গোপন করতে বা উৎস সরাতে উদ্বুদ্ধ হয়।

এই প্রক্রিয়ায় ‘ডেডওয়েট লস’ তৈরি হয়–যা মূলত বাজারে অদক্ষতার একটি চিহ্ন। কর বা ভর্তুকির মতো হস্তক্ষেপ বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। কোনো পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করলে তার দাম বেড়ে যায়, চাহিদা কমে যায়, ফলে কিছু সম্ভাব্য লেনদেন আর হয় না। এতে সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণ কমে যায়–যা অর্থনীতির ভাষায় ‘ডেডওয়েট লস’  নামে পরিচিত।

এই গবেষণা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির নামে যদি অদক্ষ প্রশাসন ও অনুপযুক্ত হারে কর চাপানো হয়, তাহলে ফল হতে পারে বিপরীত: রাজস্ব বাড়বে না, বরং প্রবৃদ্ধির গতিও শ্লথ হয়ে পড়বে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর রাজস্ব বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক ও জটিল সমস্যা। এর মূল কারণ হলো–অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়, যেখানে আয় বা লেনদেনের কোনো লিখিত প্রমাণ থাকে না। ফলে এই খাতে কার্যকরভাবে কর আরোপ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা। আধুনিক কর ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটালাইজেশন–যেমন স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাই, অনলাইন ফাইলিং, ই-রিসিট–এগুলো এখনো অনেক দেশে পর্যাপ্ত নয়। ফলে কর ফাঁকি চিহ্নিত করা বা করদাতার সংখ্যা বাড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে: সীমিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি বড় অংশ কর প্রশাসনের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা কি আদৌ যৌক্তিক? কারণ অতিরিক্ত ব্যয় করেও যদি কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য একপ্রকার আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। ফলে এই ইস্যুতে নীতি-নির্ধারকদের কাছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অত্যন্ত জরুরি।

দুর্নীতির দুষ্টচক্রে বাংলাদেশের কর প্রশাসন

বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে কর প্রশাসনে দুর্নীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত সমস্যা। এর পেছনে রয়েছে একাধিক গভীরতর কারণ, যার মধ্যে অন্যতম হলো দায়বদ্ধতার অভাব এবং দুর্বল নীতিগত কাঠামো।

প্রথমত, কর কর্মকর্তারা কর নির্ধারণ বা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিয়মনীতি অনুসরণ করেন না। এতে করে কর আদায় অনেকাংশেই রয়ে যায় তাদের ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল–যার সুযোগে ঘুষের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের কম বেতন ও দুর্বল প্রণোদনা ব্যবস্থা তাদের ঘুষ গ্রহণের দিকে ধাবিত করে। যখন একজন কর কর্মকর্তা জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত বৈধ আয়ে নির্ভর করতে পারেন না, তখন তিনি বিকল্প উৎস–অর্থাৎ ঘুষ–পাওয়ার চেষ্টা করেন।

তৃতীয়ত, তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্নীতিকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যকর নয়, বিচারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অপরাধের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আমলাতান্ত্রিক নিয়োগেও থেকে যায় পক্ষপাত–যেখানে মেধার চেয়ে সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব কারণে কর্মচারীরা রাজস্ব আদায়ের চেয়ে ঘুষ আদায়ে বেশি আগ্রহ দেখায়।

এছাড়া, ‘সহায়তা ফি’ বা ‘অফ দ্য রেকর্ড’ সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে একধরনের স্বীকৃত প্রথায় পরিণত হয়ে যায়। করদাতারা আমলাতান্ত্রিক হয়রানি এড়াতে নিজেরাই ঘুষ দিয়ে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেন।

বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাটি যেন এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ– দুর্বল নীতিমালা → অধিক কাগজ-কলমনির্ভরতা (ডিজিটাল নয়) → আরও দুর্নীতির সুযোগ → রাজস্ব ঘাটতি → সীমিত সংস্কার সক্ষমতা → আবার দুর্বল নীতি।

এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, কারণ এটি জনগণের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। কর প্রশাসনকে ঘিরে এই অনাস্থা করদাতাদের কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করে তোলে। ফলে অনানুষ্ঠানিক বা কালো অর্থনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত হয় এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রবাহ আরও সংকুচিত হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের মাত্র ১.২ শতাংশ মানুষ কর রিটার্ন দাখিল করেন, অথচ ঘুষের কারণে করদাতাদের আয়ের ২.৮ শতাংশ ব্যয় হয়–যা ভয়ঙ্করভাবে বৈষম্যমূলক এবং নিরুৎসাহব্যঞ্জক।

রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতার মূল কারণ

বাংলাদেশের কর আদায়ের দুর্বলতা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়–এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আধুনিকায়নের জন্য যে পর্যাপ্ত তহবিল দরকার, তা বরাবরই সীমিত। এর ফলে তারা সময়োপযোগী আইটি অবকাঠামো, উন্নত ডেটা বিশ্লেষণব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে পারে না। ফলে কর সংগ্রহ এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিনির্ভর, যা ভুলত্রুটি ও কর ফাঁকির সুযোগে পরিপূর্ণ।

এর পাশাপাশি দেশের অনানুষ্ঠানিক বা কালো অর্থনীতির পরিধিও অত্যন্ত বিস্তৃত। অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থনৈতিক কার্যক্রম কর-ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। ফলে রাজস্ব আহরণের ভিত্তিটিই সংকুচিত হয়ে পড়ে।

আরো একটি বড় সমস্যা হলো জটিল ও অস্বচ্ছ কর কাঠামো। একদিকে অভিজাত শ্রেণির জন্য কর ছাড় ও সুযোগসুবিধার ছড়াছড়ি, অন্যদিকে সাধারণ করদাতার জন্য আছে অস্পষ্ট বিধান ও বিভ্রান্তিকর নিয়মাবলি। এতে কমপ্লায়েন্স বা স্বেচ্ছায় কর প্রদানের প্রবণতা হ্রাস পায়।

কর আদায়ে আরেকটি অন্তরায় হলো সীমিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। দুর্বল নাগরিক নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্রব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক করদাতাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায় না, বিশেষ করে স্ব-কর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের ক্ষেত্রে।

সবশেষে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিরোধ। কর সংস্কারের যে কোনো প্রয়াসই প্রায়শই বাধার মুখে পড়ে। কারণ সমাজের ক্ষমতাশালী ব্যবসায়িক লবি ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি কর কাঠামোর সংস্কারে আপত্তি তোলে–কারণ এতে তাদের ওপর করের চাপ বাড়তে পারে। ফলে সংস্কারের পথ বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে।

উন্নত দেশে কর হার উচ্চ, আস্থাও বেশি

নর্ডিক দেশগুলো–যেমন ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ড–বিশ্বে সর্বোচ্চ কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ডেনমার্কে এটি ৪৬.৯ শতাংশ, সুইডেনে ৪২.৬ শতাংশ এবং জি-৭ দেশগুলোতে গড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ। ফ্রান্সে কর-জিডিপি অনুপাত ৪৬.১ শতাংশ, জাপানে ৩৪.৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রেও এটি ২৭.৭ শতাংশ।

এই দেশে করের হার বেশি হলেও নাগরিকরা কর প্রদান করতে আগ্রহী, কারণ তারা জানেন–এই অর্থের বিনিময়ে সরকার তাদের জীবনের মৌলিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নর্ডিক দেশগুলোর নাগরিকরা করকে শুধু বাধ্যবাধকতা নয়, বরং ‘সামাজিক বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখেন। তারা বিশ্বাস করেন, সরকার তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও অবসরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এ আস্থার পেছনে রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান: প্রথমত, দক্ষ ও পেশাদার কর প্রশাসনের কারণে এই দেশগুলোতে কর আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। ডিজিটাল পদ্ধতি, স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ও পর্যাপ্ত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রশাসন কার্যকরভাবে কর আদায় করে।

দ্বিতীয়ত, নর্ডিক দেশগুলোতে করের ভিত্তি বিস্তৃত এবং অপ্রয়োজনীয় ছাড় সীমিত। ফলে নাগরিকদের মধ্যে করবঞ্চনার অনুভূতি নেই। সবাই একধরনের সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে কর দেন।

তৃতীয়ত, এই দেশগুলোতে কর ফাঁকি একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার জন্য রয়েছে কঠোর আর্থিক ও আইনগত শাস্তির বিধান।

অপরদিকে, বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে জনগণের মধ্যে সরকার ও কর ব্যবস্থার ওপর আস্থা কম। সাধারণ মানুষ মনে করেন, কর দিলে সেটি আত্মসাৎ করবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী, আমলারা কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত কর কর্মকর্তারা। ফলে করকে তারা ‘লোকসানের বিনিয়োগ’ মনে করেন। তাদের ক্ষোভ জমে–কর দেওয়ার চেয়ে কর এড়িয়ে চলাই তাদের কাছে বেশি যৌক্তিক মনে হয়।

এই আস্থার ব্যবধানই বাংলাদেশের কর সংস্কারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু কর হার বাড়ালেই নাগরিকরা কর দিতে আগ্রহী হবে না–যতক্ষণ না তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাদের দেওয়া অর্থ জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কর সংস্কারে তিন শর্ত: প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

কর রাজস্ব বাড়াতে এবং জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হলে শুধু কর বাড়ানো নয়–দরকার কার্যকর ও স্বচ্ছ করব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে সফল কিছু উদাহরণ অনুসরণযোগ্য।

ডিজিটালাইজেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, রুয়ান্ডা কর ব্যবস্থায় ই-ফাইলিং ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালু করার পর এক দশকে রাজস্ব আদায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। করদাতার পরিচয়, লেনদেন, জমা ও যাচাই–সব কিছু অনলাইনে হলে ফাঁকি কমে এবং কর সংগ্রহ বাড়ে।

কর কাঠামো সরলীকরণ করতে হবে। জর্জিয়া সরকার করের হার কমিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় ছাড় ও ফাঁকফোকর বন্ধ করে রাজস্ব আদায়ে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থাৎ, জটিল কর ব্যবস্থা না রেখে স্পষ্ট ও সুবিবেচ্য হার ও নীতিমালা নির্ধারণ করতে হবে।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার জরুরি। ইন্দোনেশিয়ার কর দপ্তর দুর্নীতিগ্রস্ত বহু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে এবং বাকিদের বেতন ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে সিস্টেমে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশেও এনবিআরের ভেতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার করতে হবে।

সঙ্গে, করপরিচয় (টিআইন)-কে নাগরিক সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে–যেমন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট বা বড় ব্যাংক লেনদেনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা।

মোটকথা, বাংলাদেশের মতো দেশে নিম্ন করপ্রাপ্তি থেকে উচ্চ ও ন্যায্য কর ব্যবস্থার পথে যাত্রা করতে হলে চাই: যুগপৎ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, লক্ষ্যভিত্তিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

এই তিন উপাদানের সমন্বয় করলেই কর প্রশাসনের ভেতরে জমে থাকা দুষ্টচক্রটি ভাঙা সম্ভব। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী যেমন আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা এক্ষেত্রে সহায়ক হলেও, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।