Published : 30 Sep 2025, 08:08 AM
কাজটা সন্দেহাতীতভাবে শিষ্টাচারবহির্ভূত হয়েছে। শুভ ও অশুভের প্রতীকী লড়াইয়ের মঞ্চ যে দুর্গাপূজা, সেখানে ভিনদেশের একজন সরকারপ্রধানকে অসুর রূপে প্রতীকায়িত করা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের একটি পূজামণ্ডপে তাই করা হয়েছে। সেখানে অসুররূপে হাজির করা হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে। স্থানীয় শিল্পীদের এই সিদ্ধান্ত শুধু শিল্পরুচির প্রশ্নেই বিতর্কিত নয়—এটি সীমান্তপারের সম্পর্ক, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানার সামিল।
শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমারও কিছু ক্ষোভ আছে এবং বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার তা থাকতেই পারে। সর্বশেষ পাহাড়ে যখন আগুন জ্বলছে, মানুষ মরছে, আমি কিছুতেই সরকারের ভূমিকা মেনে নিতে পারছি না। অন্তত সেই সরকারের ভূমিকা আমাকে বিব্রত করছে, যে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাকে একদা আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে বিস্তর কথা বলতে দেখেছি। কিন্তু আমি ভুলে যাইনি, দেশের এক ক্রান্তিকালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে এই সরকারটি। মুহাম্মদ ইউনূস কী করছেন, আরও কী করবেন, সেটা দেখার সময় শেষ হয়ে যায়নি। তাই মেনে নিতে পারছি না বহরমপুরের পূজামণ্ডপে করা কাণ্ডটা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর খাগড়া সাধক নরেন্দ্র স্মৃতি সংঘের দুর্গাপূজামণ্ডপ ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকা বলছে, শুধু ড. ইউনূসকেই নয়, তাদের অন্য দুটি পূজামণ্ডপের একটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, অন্যটিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে অসুররূপে নির্মাণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপে সরকারপ্রধানদের মুখাবয়ব ব্যবহার করে অসুরের প্রতিকৃতি নির্মাণ—একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে বিতর্কিত কাজ হয়েছে। পুরাণপ্রতীককে এমন মাটির পৃথিবীতে নামিয়ে আনাটা কতখানি শিল্পীর স্বাধীনতা বলে বিবেচিত হবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
ডনাল্ড ট্রাম্প ও শাহবাজ শরিফের মুখাবয়ব ব্যবহার করে অসুর নির্মাণ এমন আলোচনার জন্ম দেয়নি, যতটা মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে হচ্ছে। কারণটা সহজ, ভারত তো আমাদের দূরের দেশ নয়, আর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তো রয়েছে নিবিড় নৈকট্য।
সম্প্রতি “Soumavo’s Creations” নামের একটি ফেইসবুক পাতায় নরেন্দ্র স্মৃতি সংঘের দুর্গাপূজামণ্ডপের প্রতিমার ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। ভারতীয় সমাজের একটি অংশ এটিকে হালকা রসিকতা বা শিল্পীসুলভ স্বাধীনতা হিসেবে দেখলেও, অনেকে এটিকে সরাসরি অসম্মানজনক, কটাক্ষপূর্ণ এবং অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা করেছেন। বাংলাদেশেও বিষয়টি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, কেউ কেউ যে খুশি হয়েছেন, তা প্রবাসী বাংলাদেশীদের ফেইসবুক পাতায় বোঝা যাচ্ছে।
দুর্গাপূজায় অসুরকে অন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা একটি প্রাচীন রীতি। মন্দের বিরুদ্ধে শুভের জয় প্রকাশের জন্যই দুর্গার পায়ের নিচে অসুরের প্রতিচ্ছবি নির্মিত হয়। কিন্তু এই প্রতীকায়ন যখন কোনো বাস্তব ও সমসাময়িক ব্যক্তিত্বের মুখাবয়ব গ্রহণ করে, তখন তা প্রতীক থেকে সরে গিয়ে সরাসরি বিদ্বেষমূলক হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন মুর্শিদাবাদের ওই পূজামণ্ডপে এমনটা ঘটল? পশ্চিমবঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত আমার দুজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম এ নিয়ে। তাদের মতে, মুর্শিদাবাদের ওই দুর্গাপূজামণ্ডপে মুহাম্মদ ইউনূসকে অসুরের মুখে রূপায়ণ করার ঘটনাটি নিছক শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস ও অভিবাসনজনিত মানসিকতার প্রতিফলন।
ঐতিহাসিকভাবে মুর্শিদাবাদ একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। নবাবি আমলের রাজধানী হিসেবে এটি সবসময় রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল। পরবর্তীতে দেশভাগ, শরণার্থী সংকট এবং সীমান্ত রাজনীতির কারণে এখানকার মানুষের মানসিক ভুবন সবসময় বাংলাদেশসংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে সজাগ থেকেছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এবং পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অভিবাসী হিসেবে স্থায়ী হয়েছেন। মুর্শিদাবাদ ছিল তাদের অন্যতম আশ্রয়স্থল। সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলার সামাজিক গঠন তাই বহুলাংশে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থেকে গেছে। স্থানীয় হিন্দুদের পারিবারিক শেকড়, ভাষা ও সংস্কৃতির অনেকাংশ আজও বাংলাদেশকেন্দ্রিক—তারা ওখানে বসবাস করলেও ভেতরে ভেতরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যথেষ্ট সচেতন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং সাম্প্রতিক সময়ে ড. ইউনূসকে ঘিরে বিতর্ক মুর্শিদাবাদের মানুষের কল্পনাশক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে। যারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রতিদিনের খবরে, আত্মীয়-স্বজনের গল্পে, কিংবা স্মৃতিতে বহন করেন, তাদের কাছে বাংলাদেশ শুধুই একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়—বরং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি মানসিক ভূগোল। ফলে পূজামণ্ডপের শিল্পীরা যখন ‘অসুর’ চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়েছেন, তারা স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক আবেগকেও শিল্পে প্রতিফলিত করেছেন।
খাগড়ার মণ্ডপে যে মূর্তি তৈরি হয়েছে, সেখানে অসুরের মুখাবয়ব যে ড. ইউনূসের আদলে বানানো হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পূজা উদ্যোক্তারা যদিও দাবি করেছেন, তাদের এ বছরের থিম ‘দহন’—যা প্রতীকীভাবে দেশের শত্রুদের বিনাশের ধারণা বহন করছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়: ‘দেশের শত্রু’ বলতে তারা কাকে বোঝাচ্ছেন? যখন প্রতীকের রূপ বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যায়, তখন সেটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক থিম থাকে না, বরং রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা সামাজিক বিদ্রূপে রূপ নেয়। এভাবে প্রতীকের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, এবং তা বিভেদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে কেবল শিল্পকর্মের সীমায় আবদ্ধ না রেখে প্রতিবেশী দেশের প্রতি প্রকাশ্য অসম্মানের বলে মন্তব্য করেছেন। যেহেতু মুহাম্মদ ইউনূস কেবল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নন, তিনি একজন নোবেলজয়ী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব—তাকে অসুররূপে উপস্থাপন বাংলাদেশের জনমনে অপমানের অনুভূতি জাগিয়েছে।
ভারতের বহু নাগরিকও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেননি, অন্তত আমি যাদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত আছি, তাদের কাউকে কাউকে এ নিয়ে তীব্র নিন্দা করতে দেখেছি। সামাজিক মাধ্যমে তাপস বিশ্বাস লিখেছেন, “শিল্পীর স্বাধীনতা ও সম্মান জরুরি হলেও পূজার মণ্ডপে কারও প্রতিকৃতি ব্যবহার করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষত একজন মুসলিম ব্যক্তির মূর্তি বানানো ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে অনুচিত।” জয় আচার্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা কি সত্যিই মায়ের আরাধনার জন্য পূজা করছি, নাকি মানুষকে বিনোদন দেওয়ার জন্য? নিজের ধর্মকেই যখন সম্মান দিতে পারছি না, তখন অন্য ধর্মের মানুষ কটাক্ষ করবেই।” দীপংকর দাস আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই ধরনের কাজ কখনোই ঠিক নয়।”
এ থেকে বোঝা যায়, এ বিষয়টি শুধু সীমান্তের এপারে ক্ষোভ সৃষ্টি করেনি, বরং ভারতের মধ্যেও তা শালীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলেছে।
যদিও বাংলাদেশ সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি, অন্তত আমার চোখে পড়েনি, তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষ এ ঘটনাকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্প্রীতি নষ্টের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো কূটনৈতিক শিষ্টাচার। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যে কোনো কর্মকাণ্ডে অন্য দেশের নেতৃত্বকে অসম্মান করা কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক—অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বন্ধনে জড়িয়ে আছে দুই দেশ। এই সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করার মতো কোনো পদক্ষেপ তাই গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না আসলেও জনমতের চাপ এই ঘটনায় ভবিষ্যতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। বাংলাদেশ ও ভারত— উভয় দেশেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রায়শই সামাজিক বৈরিতার শিকার হন। ধর্মীয় উৎসব যখন বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর। অথচ পূজা-পার্বণের মূল বার্তা হওয়া উচিত সম্প্রীতি, ঐক্য ও মানবিকতার। বিভেদের প্রতীক হিসেবে পূজার ব্যবহার হলে তা কেবল উৎসবের মহিমাই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং সমাজে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে।