Published : 09 Jul 2026, 11:59 PM
পাঁচ দিনের অতি ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলার ১৫ উপজেলার ৭৩৭৫টি পুকুর-দিঘি ও ৪৫টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
বাণিজ্যিক ও ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব জলাশয় তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ ও ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনা ভেসে গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেয়েছে। পানি নামার পর চূড়ান্ত হিসেবে তা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছে অধিপ্তর।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করার কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, জলাশয় ভেসে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা পটিয়া। এই উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের প্রায় সবগুলোতেই জলাশয় তলিয়ে গেছে।
তাদের হিসাবে, পটিয়া উপজেলায় ২১২ হেক্টর আয়তের মোট ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর-দিঘি ও মাছের খামার ভেসে গেছে।
উপজেলার খরনা ইউনিয়নের বাসিন্দা অমর সর্দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে আমার প্রজেক্টে পানি ঢুকতে শুরু করে। একটা বড় মাছের প্রজেক্ট আর ছয়টা মাঝারি আকারের পুকুর। সব পানিতে ডুবে গেছে। এরমধ্যে চারটাতে ছিল পোনা। আর বাকিগুলোতে বড় মাছ।
“রুই, কাতাল, কালিবাউশসহ কার্প জাতীয় মাছ এবং হাইব্রিড মনোসেক্স তেলাপিয়ার চাষ করেছিলাম। আমার সব ভেসে গেছে। প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখনো পানি নামেনি। প্রজেক্ট এলাকায় এখনো কোমর সমান পানি।”

পটিয়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের প্রতিটা ইউনিয়নে কম-বেশি পুকুর ও জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পানি। অতি বৃষ্টির সাথে পাহাড়ি ঢলের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
“কিন্তু এখনই কিছু করার সুযোগ নেই। পানি নেমে গেলে যেসব জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোতে ‘ট্রিটমেন্ট’ করতে হবে। তা না হলে যে মাছ অবশিষ্ট থাকবে সেগুলোও বাঁচবে না। আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোন সহায়তা এলে অবশ্যই মৎস্যচাষীদের দেওয়া হবে।”
চট্টগ্রামের হালদা পাড়ের হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পুকুরে ছিল হালদার পোনা। সবশেষ গত জুন মাসের মধ্যভাগে হালদা নদী থেকে সংগৃহীত ডিম থেকে যে রেণু পোনা হয় তাও ছিল উপজেলার পুকুর-দিঘীতে।
হাটহাজারী উপজেলার আজিমের ঘাট সংলগ্ন কাগতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৎস্যচাষী রওশনগীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুকুর ডুবে গেছে। গতকাল সকাল থেকে পানি বাড়তে শুরু করে। হালদা নদীর পানি এখনো লোকালয়ে আসেনি। অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি হয়েছে।
“আমার তিনটা পুকুরে পোনা ও মাছ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। গত মাসে হালদার যে পোনা সংগ্রহ করি তার সবই একটা পুকুরে ছিল। সব ভেসে গেছে। সামনের অমাবস্যার জো তে হালদার পানি বাড়লে এলাকা আবার প্লাবিত হতে পারে।”

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে হাটহাজারী উপজেলায় প্রায় ১৯ হেক্টর আয়তনের ১৪০টি জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রামের দক্ষিণের উপজেলা বাঁশখালীতে ৪৫০টি পুকুর-দিঘী ও ৩৫টি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে।
বাঁশখালী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চূড়ামনি পাড়ার বাসিন্দা অনুপম দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাছ চাষ করা তিনটি পুকুর ডুবে গেছে। দুটিতে তেলাপিয়া, রুই ও কার্প মাছ ছিল। আরেকটিতে ছিল পাঙ্গাস। আমার ঘরটাও অর্ধেক ভেঙে গেছে পানির তোড়ে।”
ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে আজ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির যে হিসাব পাওয়া গেছে তাতে ৭৪২০টি জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিক হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চূড়ান্ত হিসেবে তা আরো বাড়বে।
“মাঠ পর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তারা ক্ষতি কমিয়ে রাখতে করণীয় বিষয়ে মৎস্য চাষীদের পরামর্শ দিচ্ছেন।”
পানি নেমে গেলে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা হলে তখন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন, বলেন তিনি।