Published : 13 Feb 2026, 09:06 PM
বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনের সুষ্ঠু সমাপন ও ফলাফল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। ভূমিধস বিজয় প্রমাণ করেছে—গত দুই যুগ ধরে যে চাপ, নিপীড়ন ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিএনপি সময় পার করেছে, তা তাকে নতুন শক্তি দিয়েছে। বিএনপি তারেক রহমানের হাত ধরে সকল কঠিন সময় পার করে, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে, দলকে অখণ্ড রেখে একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্যকে হাতের মুঠোয় নিয়েছে। এখন তারেক রহমানকে মনে রাখতে হবে বিজয় মানে সব পাওয়া নয়, হারানোর ভয়ও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে দ্রুতই সরকার গঠন করবে বিএনপি। ইতিহাসের সবচাইতে বড় সাফল্য নিয়ে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীদের পালন করতে হবে সংসদীয় দায়িত্ব। এই সংসদ একাধারে গণপরিষদের দায়িত্ব পালন করবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে স্বাভাবিক সংসদ হিসেবে দায়িত্ব পাবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়াতে জুলাই সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নও করতে হবে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ নানাবিধ হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং বহুবিধ জটিল ও কঠিন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যার দায় বর্তেছে এই সরকার ও সংসদের ওপর। সংসদের নিম্নকক্ষকে এসব কাজ সেরে তৈরি করতে হবে উচ্চকক্ষ। সেখানে আসন দিতে হবে বিএনপির বাইরে জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীদের এবং তার আগে ঠিক করতে হবে আসনবিন্যাস কিভাবে হবে। বিএনপি নির্বাচনের বহু আগে থেকে বলে এসেছে ৩১ দফায় তার রাষ্ট্রসংস্কারের অঙ্গীকারের কথা। নির্বাচনি ইশতেহারে তারা অঙ্গীকার করেছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানাবিধ সামাজিক সুরক্ষার। ফলে বিএনপির সামনে রয়েছে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ।
এখন আমরা দেখব নতুন সরকার ও সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সামনে আশু কর্তব্য ও চ্যালেঞ্জ কী?
০১. বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশের এই সংখ্যা আধিপত্যকে অতীতে আমরা রাজনৈতিক মরণফাঁদে পরিণত হতে দেখেছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যতবার যে রাজনৈতিক দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে, তারাই ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে একটি রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক ও জীবনঘাতী বিপর্যয় ও রক্তাক্ত পরিণতি ডেকে এনেছে।
প্রথম জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। দুই বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত ও বিয়োগান্তক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সেই অবস্থার অবসান ঘটে। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছিল বিএনপি। ১৯৮১ সালের মে মাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খুন হন অসীম নৃশংসতায়। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন জাতীয় পার্টি ও তার নেতা স্বৈরাচারী এরশাদ। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। ২০০৭ সালে আসে ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিপন্ন হয় বিএনপি। ২০০৮ সালে ভূমিধস বিজয় নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ক্রমশ সেটাই তাকে পরিণত করে ফ্যাসিবাদী শাসকে। এরপর দেশ ছেড়ে পালাতে হয় দলবলসহ তাকে।
এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া বিএনপিকে হাঁটতে হবে পুরনো সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই। এবারের বিপুল জনরায়ের জোরে সারাদেশে বিএনপি যদি সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়, সেবকের বদলে নিপীড়ক হয়ে ওঠে, তবে কঠিন বিপর্যয়কে মোকাবিলা করতে হতে পারে। ফলে সংসদীয় শাসনের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে, বিরোধী দলকে যথাযথ স্পেস দিয়ে, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সম্পন্ন করে, জুলাইয়ের চেতনাকে বাস্তবায়িত করে শাসনকাজ চালিয়ে যাওয়া নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
০২. শেখ হাসিনার শাসনামলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, অসাধু ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে অল্প কয়েকজন নিয়ে যে অলিগার্ক শ্রেণি দুর্বৃত্তায়িত অর্থনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করে গেছে, তা এখনো চলমান। এই অলিগার্ক শ্রেণি দেশের সুশাসনের পথে অন্যতম বাধা। অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘোচানোর ক্ষেত্রে তারাই বৃহত্তম প্রতিবন্ধক। এরাই রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে ব্যাংক লুট করেছে, টাকা পাচার করেছে, ঋণখেলাপি সেজে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির সৃষ্টি করে তার অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে এবং নিচ্ছে। বিএনপিকে এই দুর্বৃত্তচক্র ভাঙতে হবে। সেটিই তার সামনে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ।
০৩. রাজনৈতিকভাবে বিএনপি একটি নতুন পরিস্থিতির মুখে দেশের শাসনভার নিতে যাচ্ছে; সেটি হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি তরুণ গোষ্ঠী ও একটি ধর্মবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রাতিষ্ঠানিক উত্থান ঘটেছে। এরা সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে যেমন থাকবে, রাজপথেও থাকবে বিপুল শক্তি নিয়ে। এই বিরোধী পক্ষকে শক্তির ভাষায় মোকাবিলা করার পথ আরও নতুন বিপর্যয় আনতে পারে। এই শক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তি ও রাষ্ট্রীয় সুশাসন দিয়ে। এটি কঠিন ও জটিল কাজ। বিএনপিকে সেই জটিল কাজটিই করতে হবে।
০৪. গণতন্ত্রকে সুবিস্তারের পথ দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রশ্নটি বিএনপিকেই নিষ্পত্তি করতে হবে। সঙ্গে থাকবে আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দেওয়া ভারত প্রসঙ্গ। কূটনৈতিকভাবে ভারতকে মোকাবিলা করতে হবে দেশের স্বার্থ মাথায় রেখে। হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার চালিয়ে যেতে হবে, দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শাপলা হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ গুম ও খুনের ন্যায্য বিচার অক্ষুণ্ণ রাখার প্রশ্নও সামনে আসবে। দেশি-বিদেশি পক্ষগুলোকে মাথায় রেখে এসব জটিল বিষয়গুলো সামলাতে হবে বিএনপিকে। এটি যেমন যোগ্যতার প্রশ্ন, তেমনি প্রজ্ঞারও। সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বিএনপিকে।
০৫. প্রথমবারের মতো উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে এই সরকার ও সংসদকে। সেই উচ্চকক্ষ যদি দলীয় সেবাদাসরাই দখল করে থাকে, সেটিও নানারকম বিপ্রতীপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। সমাজের নানা স্তরের চাপ সামলে একটি মননশীল ও মানসম্পন্ন উচ্চকক্ষ গঠন করার কাজটিও সহজ নয়। সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে বিএনপিকে।
০৬. জুলাই চার্টার প্রশ্নে বিএনপির নিজস্ব মত আছে, আছে ভিন্নমতও। জুলাই চার্টার পদে পদে পালন করতে গেলে ক্ষমতার নিরঙ্কুশ রশিতে কিছুটা টান পড়বে। সেটি বিএনপি কতটা মানতে চাইবে? কতটা না মানলে তার চলবে? এই পরিস্থিতির মধ্যে সুষম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, আবার ক্ষমতা থেকে ছিটকেও পড়েছে। আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় যেভাবে কাজ করেছে, ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় একইভাবে ভুগেছেও। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেটি খাটে। এখানকার মানুষ রাজনৈতিকভাবে আবেগপ্রবণ। মানুষের ক্রোধ ও ভালোবাসা এখানে সমানুপাতিক হারেই বেগবান। যাকে তারা ভালোবেসে মাথায় তোলে, তাকেই আবার ক্রোধভরে আছাড়ও মারে। এখানে জনগণ বারবার আশায় বুক বাঁধে, আশায় প্রাণপণ সবটুকু উজাড় করে ঢেলেও দেয়। কিন্তু জনগণ বারবার প্রতারিত হয়, তাদের আশাভঙ্গ ঘটে। তখনই তারা ক্রোধে উত্তাল হয়।
এই রাষ্ট্রনৈতিক সংস্কৃতির চলাচলে এবার বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সুযোগ পেয়েছে। জনগণ দুহাত ভরে ভোটের ভালোবাসা দিয়েছে। ফেরত দেওয়ার পালা এখন বিএনপির। চ্যালেঞ্জ অনেক, সম্ভাবনাও বিপুল। এই সম্ভাবনাকে দুহাত তুলে ওপরে আনতে পারে কেবল সুশাসন ও স্বচ্ছতার শাসন। দুর্নীতিকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে এনে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হলেই পাল্টে যাবে পরিবেশ। তখন আর ফ্যাসিবাদী শক্তির ‘চট করে’ ঢুকে পড়ার সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের জনগণ বহুবার প্রতারিত হয়েছে। এবার আর প্রতারিত হতে চায় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আসা নতুন ভোট, সেই ভোটের সরকার, সেই ভোটের সংসদ জনগণকে আশা দেবে, ভরসা দেবে, মর্যাদা দেবে—এই জনপ্রত্যাশা মেটানোর বড় চ্যালেঞ্জ দল হিসেবে বিএনপি ও তার নেতা তারেক রহমানের ওপর। দেখা যাক, সেই প্রত্যাশা কতটা মেটায় বিএনপি ও তার নতুন নেতৃত্ব!