Published : 28 Dec 2025, 06:43 AM
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করেছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ছুটির দিনে সেই আবেদন গ্রহণ করে জানিয়েছে, মাত্র এক দিনের মধ্যে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। এতক্ষণে হয়তো সেই প্রক্রিয়া বেশ এগিয়েও গেছে।
সরকারি অফিসে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সেবা প্রদানের বদলে সেবাগ্রহীতাকে নাজেহাল করার সংস্কৃতির দেশে তারেক রহমান যে ত্বরিৎ ও করিৎকর্মা সেবা পেলেন, তা দেখে অন্তত এইটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই রাষ্ট্র ধীরে চললেও আদতে তার ইঞ্জিনের ‘গতি’ আছে।
তবে ইসির এই গতি দেখে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা উঠছে–এই গতির সুফল কি কেবল তারেক রহমানদের জন্যই? নাকি, একজন সাধারণ নাগরিকও একই অধিকারের দাবিদার হতে পারবেন এবং ইসি কিংবা রাষ্ট্রের যে কোনো আইনি বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছে একই রকম সেবা পাবেন?
আবার কেউ কেউ বলছেন, তারেক রহমানের রাজনৈতিক গুরুত্ব, আসন্ন নির্বাচন এবং দীর্ঘ সময় তার প্রতি হওয়া অবিচারের প্রেক্ষাপটে তার জন্য ইসির এই ত্বরিৎ উদ্যোগটি ছিল এক ধরণের অনিবার্য আবশ্যকতা। এই দুই মেরুর আলোচনার কোনোটিই ফেলনা নয় এবং এর মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের গন্তব্যটি খুঁজে বের করতে হবে।
যে গন্তব্যে আজ অবধি কোনো সরকারই আমাদের নিতে পারেনি। এমনকি রাজনৈতিক সরকারের বাইরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান থেকে তৈরি হওয়া সরকারের বেলাতেও এ কথা প্রযোজ্য। কেননা, আমরা দেখেছি, রাষ্ট্র যে দ্রুততার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার সমাধান করেছে, একই দ্রুততা আর ১০ জন সাধারণ মানুষের বেলায় দেখাতে পারেনি। ফলে এটি স্পষ্ট যে, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র সমস্যার সমাধান খুব দ্রুতই করতে পারে, তবে কেবল তাদের জন্য যারা ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশে নতুন এক গণতান্ত্রিক সরকারের আকাঙ্ক্ষা করছে মানুষ। ভোটের রাজনীতির এই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী দলের হাল যার হাতে, তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে এবং তিনি দেশের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত নন; সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক মহলে এই বাস্তবতা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যার একদিকে তারেক রহমানের ভোটার হওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পাওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব, অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার পর তার ভোটার হওয়ার আইনি মারপ্যাঁচ।
সেসব বিবেচনায় রেখে তারেক রহমানের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আইনের আওতা খুঁজে বের করার উদ্যোগও তাদের মধ্যে দেখা গেছে। ডিসেম্বরের শুরুতে ইসি সচিবালয় জানিয়েছিল, ২০০৮ সাল থেকে বিদেশে থাকায় ভোটার তালিকায় তারেক রহমানের নাম নেই। তবে কমিশন আইনের ‘ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯’-এর ১৫ ধারার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, ইসি যে কোনো সময় যোগ্য নাগরিককে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এখতিয়ার রাখে। অবশেষে, ২৭ ডিসেম্বর (শনিবার) ছুটির দিনেও ইসি কার্যালয় খোলা রেখে তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানের বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, একদিনের মধ্যে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র পাবেন।
এই যে দ্রুততার সঙ্গে আইনের মধ্যে থেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তার নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হলো, তাকে অনেকেই ‘মানবিক ন্যায়বিচার’ হিসেবে দেখছেন। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে দীর্ঘকাল প্রবাসে কাটাতে হয়েছে। বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদানের জন্য সশরীরে উপস্থিত হওয়া ছাড়া ভোটার হওয়ার কোনো পথ ছিল না। ফলে দেশে ফেরার পর তাকে দ্রুত ভোটার করাকে এটিকে বিশেষ সুবিধার চেয়ে, একজন নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকের অধিকার পুনরুদ্ধারের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পূর্বশর্ত প্রতিটি দলের যোগ্য নেতৃত্বের অধিকার সুনিশ্চিত করা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানকে যদি সাধারণ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখা হতো, তবে তিনি হয়তো নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দিতে পারতেন না। সেটি দেশে নতুন এক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করত। তাই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থেও কমিশনের এই তৎপরতা যৌক্তিক হিসবে দেখার জায়গা তৈরি হয়েছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এ নিয়ে এক প্রকার অসন্তোষ ও সমালোচনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের আক্ষেপ, একজন সাধারণ মানুষকে এনআইডির সামান্য সংশোধনের জন্য মাসের পর মাস ইসির বারান্দায় ধরনা দিতে হয়। বাংলাদেশের সাধারণ প্রবাসীরাও এই একই সংকটের মধ্য দিয়ে যান। শুধু ইসি না বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক টালবাহানা আর অযাচিত সব শর্তের বেড়াজালে আটকে থাকেন।
কিন্তু একজন প্রভাবশালী নেতার ক্ষেত্রে একটি নাগরিক সেবা পাওয়ার বিষয়টি এক দিনেই সমাধান হয়ে গেল। আইনের আওতা খুঁজে বের করতে ইসি তৎপর হলো। তাই, গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রায় তারেক রহমানের এই ‘স্পেশাল উইন্ডো’ বা ত্বরিৎ সেবা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থেকে রাষ্ট্র সামনের দিনে কোথায় দাঁড়াবে, সামনের দিনে রাষ্ট্রের দর্শন কী হবে সেই প্রশ্নগুলোও উঠছে।
যদি প্রতিষ্ঠান, আইন এবং প্রযুক্তি একজন নেতার জন্য এত দ্রুত কাজ করতে পারে, তবে সামনের দিনে সাধারণ জনগণের বেলায়ও কি রাষ্ট্র একই আচরণ করবে? তারেক রহমানের ওপর হওয়া গত দেড় দশকের যে অত্যাচার ও বঞ্চনা, তার এক প্রকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই দ্রুততাকে দেখা হচ্ছে। কিন্তু, সেই একই অত্যাচার ও বঞ্চনার শিকার এ দেশের হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছেন, প্রতিনিয়ত হচ্ছেন। সেই সাধারণ ‘তারেক রহমানদের’ জন্যও কি রাষ্ট্র একইভাবে দ্রুতগতিতে আইনি অধিকার নিশ্চিতে সক্ষম হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতেই। তারেক রহমান আজ যে গতির স্বাদ পেলেন, তিনি যদি সেই গতি জনসাধারণ যেন উপভোগ করেন তার জন্য লড়াই করেন তবেই আজকে রাষ্ট্র তার জন্য যে উদ্যোগ দেখাল তা সার্থক হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ক্ষমতায় থাকুন কিংবা ক্ষমতার বাইরে, তার রাজনীতি যেন রাষ্ট্রের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ভিআইপি’ বনাম ‘সাধারণ নাগরিক’, এই বৈষম্যের রেখা মুছে দেওয়ার রাজনীতি হয়। তার রাজনৈতিক দর্শনে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ক্ষমতার দাপটের চেয়ে আইনি ও সাংবিধানিক শক্তিতেই বেশি বলীয়ান হয়ে কাজ করে।
তারেক রহমানের দ্রুত ভোটার হওয়াকে কোনো একক ব্যক্তির জয় কিংবা প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে না দেখে বরং একে এমন এক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা উচিত, যা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলে কত দ্রুত ও গতিশীল হতে পারে। আমাদের রাষ্ট্রের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্ষমতার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য বলে, প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ নাগরিকের নাগরিকত্বের দিকে তাকিয়ে কাজ করবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমান যখন সশরীরে নির্বাচন ভবনে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিলেন, তখন ইসি সচিবালয়ে যে কর্মতৎপরতা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে আমাদের ডিজিটাল সিস্টেম বা লোকবলের সংকট থাকতে পারে তবে তা অপারগ নয়, অভাবটা বৃহদাংশে মানসিকতার।
তারেক রহমানের সঙ্গে ইসির কর্মকর্তারা যে পেশাদার আচরণ করেছেন বা যেভাবে সময় দিয়েছেন, সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রেও যেন তারা মনে রাখেন যে, তাদের নিয়োগকর্তা এই দেশের সাধারণ মানুষ। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন মনে রাখে যে এমন সেবা, এই মার্জিত আচরণ এই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য। আর সেটি নিশ্চিতের রাজনৈতিক লড়াই তারেক রহমানদের করতে হবে।
তারেক রহমান তার বক্তৃতায় দেশ ও মানুষের জন্য যে ‘প্ল্যান’ বা পরিকল্পনার কথা বলেছেন, সেই রূপরেখায় যদি সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই একই গতির নিশ্চয়তা থাকে এবং সেই লক্ষ্যেই যদি তিনি আগামীর রাজনীতিতে লড়ে যান, তবেই তার এই দ্রুত ভোটার হওয়ার ঘটনাটি প্রকৃত সার্থকতা পাবে। তার প্ল্যান যেন যেন সেবামুখী গতিশীল রাষ্ট্র ও বৈষম্যহীন প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগের কথা বলে। তার ‘প্ল্যান’ যেন সেই বাংলাদেশ নিশ্চিতে হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি আর দুর্ভোগের অন্য নাম হয়ে থাকবে না।
অন্যথায়, তার এই দ্রুত সেবা ও মার্জিত আচরণ প্রাপ্তি কেবল ‘ক্ষমতাবানদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা’র আরেকটি চিরাচরিত উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে। যেখানে ক্ষমতাধরের জন্য প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিন গতিময় হয়, আর সাধারণের জন্য সেবার দরজা থাকে অচল ও অন্ধ।