Published : 24 Nov 2025, 02:36 PM
নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির বিজয় নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ চলমান। কেননা এই বিজয়ে নানারকম চমকে দেওয়ার মত উপাদান আছে–যেমন প্রথম মুসলিম মেয়র, একজন সমাজতন্ত্রীর বিজয়, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ডনাল্ড ট্রাম্পকে এবং সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ইলন মাস্ককে পরাজিত করে জয়লাভ, ইসরায়েলের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি অধ্যুষিত শহরে মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদী গণহত্যার বিরোধিতা করা, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহরে অর্থনৈতিক ন্যায়পরায়ণতার দাবি ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরেও এর আরেকটি খুবই উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে যা বহু কাল বিশ্বরাজনীতিতে অনুপস্থিত থেকেছে, আর তা হলো আধুনিক রাজনীতির ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশে বৈশ্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গর্বিত পতাকার আপসহীন উড্ডয়ন।
এ অভূতপূর্ব দিকটি নিয়ে আমার নিজের মূল্যায়ন উপস্থাপনের আগে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলোয় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কিছু মন্তব্য তুলে ধরা যাক যাতে আলোচ্য বিষয়ে সবার আস্থা দৃঢ় হয়। বিজয়ের পরপর ৫ নভেম্বর বিখ্যাত ‘টাইম’ সাময়িকীতে ফাহাদ জুবেরি লিখেছেন (হোয়াট জোহরান মামদানি টিচেস আস অ্যাবাউট দ্য মোর্যাল সিটি), “মার্টিন লুথার কিং একবার বাজেটকে বলেছিলেন ‘নৈতিক দলিল।’ তিনি বলেছেন, বাজেট সমাজ কী বহন করতে পারে তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করে কী মূল্যায়ন করে তা। রাষ্ট্রনীতি নিরপেক্ষ নয়, এটি নৈতিক বোধের প্রকাশ। জোহরান মামদানি তার মেয়র নির্বাচনের প্রচরাভিযান পরিচালনা করেছেন এই নীতির ওপর ভিত্তি করে। ... মামদানি শুরু করেছেন একটি সাদামাটা নৈতিক অবস্থান থেকে: সব উন্নয়নের গোড়ার প্রশ্ন ন্যায়পরায়ণতা। উন্নতির ভার কারা বহন করছেন, আর এর ফল কারা ভোগ করছে।”
তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুতোগলু ‘মিডল ইস্ট আই’তে লিখেছেন (উইথ জোহরান মামদানি’স উইন, দ্য এজ অব মোরাল সাইলেন্স ইজ এন্ডিং, ১৩ নভেম্বর), “মামদানির বিজয় বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সত্যিকারের নেতৃত্ব দমন-পীড়ন ও পুঁজির ওপর নির্ভর করে না, করে নৈতিক চেতনার উপর। এ শতাব্দীর নির্ধারক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ বনাম প্রতিরোধ নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিকরণের নৈতিকতা বনাম বাদ দেওয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো। ... ট্রাম্প যেখানে জনপ্রিয়তাকে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন, মামদানি সেখানে তা ঐক্য গড়ার কাজে লাগিয়েছেন। তার ঐক্যের লক্ষ্যে জনপ্রিয়তা ‘আমরা বনাম তারা’কে পরিণত করেছে ‘আমরা সবাই মিলে’র প্রতিজ্ঞায়। প্রতিশোধস্পৃহার বদলে দূরদর্শিতা নিয়ে তিনি নিউ ইয়র্ককে একটি নৈতিক পরীক্ষাগারে রূপান্তর করেছেন যার লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা যেখানে বৈচিত্র্য মানে সাধনা, বিশৃঙ্খলা নয়।”
মামদানির এই নৈতিক রাজনীতির ভিত্তি ইতিহাসের বেশ গভীরে–ইউজিন ডেবস ও মার্টিন লুথার কিং হয়ে আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাশিয়ো-কোর্তেজ ও বার্নি স্যান্ডার্স পর্যন্ত। তার নির্বাচনি প্রচারাভিযান ছিল যে নৈতিক প্রতিজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা হলো: নিউ ইয়র্ক বিক্রির জন্য নয়। ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার কাছে বিক্রির জন্য নয়, কর্পোরেট পুঁজির কাছে নয়, অ্যান্ড্রু কুওমোর পারিবারিক প্রতিপত্তির কাছে নয়। নিউ ইয়র্ক তার শ্রমজীবী মানুষের শহর। মামদানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ক্ষমতা, অর্থ ও পারিবারিক প্রতিপত্তি। রিপাবলিক্যান ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারাভিযান চালিয়েছেন ডেমোক্র্যাট কুওমোর পক্ষে। দেখা যাচ্ছে, ভিন্ন দলের হলেও তাদের গোড়ার স্বার্থে কোনো দ্বন্দ্ব নেই–সবাই এক। স্পষ্টতই ক্ষমতা-অর্থ-প্রতিপত্তির কাছে নৈতিকতা বলে কিছু নেই–তাদের কাছে সবই বেচাকেনার পণ্য। মামদানির বিজয় তাই কেবল রাজনৈতিক নয়, নৈতিকও এবং তা গভীর অর্থবহ।
রিপাবলিক্যান ও ডেমোক্র্যাটিক উভয় রাজনীতির প্রচলিত কৌশলের সম্পূর্ণ বিপরিতে তার অবস্থান। যেখানে সবাই জেতার জন্য মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়, ভাণ করে, প্রতিপক্ষের আক্রমণের ভয়ে পরিচয় লুকায়–তার বিপরীতে বিজয়-পরবর্তী ঐতিহাসিক ভাষণে মামদানির ঘোষণা: মোটের ওপর প্রচলিত ধারণা আপনাদের জানান দেয় যে, আমি যথার্থ প্রার্থী নই। আমার বয়সে বড় হবার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমি এক তরুণ। আমি মুসলিম। আমি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী। আর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এর কোনো কিছুর জন্যই ক্ষমা চাওয়ার দাবি ও প্রত্যাশাকে আমি প্রত্যাখ্যান করছি।
ইহুদি ভোট সংগ্রহের জন্য মামদানি সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের মত আপসকামিতার পথ অবলম্বন করেননি। স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি তার সমর্থন, ইসরায়েলি গণহত্যার বিরোধিতা এবং নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার ইচ্ছা। দৃঢ় নৈতিক অবস্থান দ্বারা দুর্নীতিপরায়ণ ট্রাম্প টাওয়ারে কাঁপুনি ধরিয়েছেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি সকল ধর্মের মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্মের অন্তর্গত মানবতার সারমর্মকে আপন রাজনৈতিক ভাষায় ব্যক্ত করে।
ফয়সাল কুট্টি তাই ‘দ্য একপ্রেস ট্রিবিউন’ পত্রিকায় লিখেছেন (মামদানি’স উইন: লেসন ইন মোরাল লিডারশিপ অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেশন, ১৯ নভেম্বর ২০২৫), “তার প্রচারাভিযান অর্থ দ্বারা নয়, নৈতিক অবস্থান দ্বারা ক্ষমতায়িত–যা আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে অবমূল্যায়িত মুদ্রা। ... জোহরান মামদানি মাত্র একটি শহরের মেয়র হতে পারেন, কিন্তু তার বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে। তা হলো: ন্যায়পরায়ণতা কেবল পশ্চিমা বা ইসলামি আদর্শ নয়, একইসঙ্গে সমগ্র মানবতার আদর্শ। তার সাফল্য ইসলামবিদ্বেষী যারা মুসলমানদের ক্ষমতাকে ভয় পায় ও সেইসব মুসলিম নেতৃত্ব যারা এর অপব্যবহার করে তাদের সবাইকে সমানভাবে চ্যালেঞ্জ করে।”
বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু জাতির ও বহু মতাদর্শের শহর নিউ ইয়র্ককে ঐক্যবদ্ধ করার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আমাদের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশসমূহের রাজনীতির ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। বিশেষ করে বিশ্বরাজনীতিতে নবোত্থিত নৈতিকতা ও মূল্যবোধের এই লেন্স দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের রাজনীতিকে একনজর দেখে নিতে পারি– দেখে নিতে পারি তা কতখানি অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলাসহ সকল ক্ষেত্র কতখানি অর্থের দাসত্ব ও দুর্বলের উপর আধিপত্যের চর্চার উপর প্রতিষ্ঠিত–আমাদের সবচেয়ে সুন্দর সুবচনসমূহ কতকাল আগে নির্বাসিত, আমাদের দুর্নীতিপরায়ণ অভিযানসমূহ কতখানি দুর্নীতিপরায়ণ ও বৈষম্যহীনতার বাগাড়ম্বর কতখানি বৈষম্যের গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত।
আমাদের রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান-প্রধান সকলের জন্য জোহরানের ভাষণ থেকে প্রতি সকালে মনে করবার মত এ কয়টি কথা উদ্ধৃত করে এ আলোচনা শেষ করছি: “নিউ ইয়র্কের প্রত্যেক অধিবাসী– যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন কিংবা আমার প্রতিপক্ষকে ভোট দিয়েছেন বা রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ভোট দানে বিরত থেকেছেন–আপনাদের সেবা করবার এই সুযোগ আমাকে দেওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ। আমি প্রতি সকালে ঘুম থেকে উঠবো একটিমাত্র লক্ষ্য নিয়ে–এই শহরকে আপনাদের জন্য আগের দিনটির চেয়ে বেশি সুন্দর করে গড়ে তোলা।”
এ যেন আমাদের কবি সুকান্তর ভাষায়–“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” কিন্তু হায়! এ মূল্যবোধ ও নৈতিক প্রতিজ্ঞা আমাদের আশপাশে কই? আমাদের নৈতিকতার অমূল্য মুদ্রাসমূহ কতখানি অবমূল্যায়িত ও দিনে দিনে মূল্যহীন হতে চলেছে তা ভেবে আমরা বিস্মিত হতেও ভুলে যাচ্ছি । এখন মামদানির এ বিজয় যা প্রকারান্তরে নৈতিকতা ও মূল্যবোধেরও বিজয়–আলোকিত করুক আমাদেরকেও।