Published : 06 Apr 2026, 07:24 PM
একটি দেশের প্রকৃত দিকনির্দেশনা বোঝা যায় রাষ্ট্র কীভাবে তার সংস্কৃতিকে ধারণ করছে, কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তুলছে এবং নিজের ঐতিহ্যের প্রতি কতটা সম্মান দেখাচ্ছে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না; মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনবোধ দিয়েও তা নির্ধারিত হয়। আর ওই জায়গাগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে সংস্কৃতি ও শিক্ষা। সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া বা অবহেলার মাধ্যমে রাষ্ট্র বা সরকার বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যতে তারা কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চায়।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ থেকে বদলে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিষ্কার করে দেয়।
এটা ঠিক যে সংস্কৃতি স্থির কোনো সত্তা নয়। সময়ের সঙ্গে ভাষা, রূপ বা নাম বদলাতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কেন এবং কীভাবে করা হলো?
‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামের ভেতরে থাকা ঐতিহাসিক ও প্রতীকী শক্তি অস্বীকার করা সম্ভব না। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীরা যে শোভাযাত্রা চালু করেন, তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। অশুভের বিরুদ্ধে মঙ্গল, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর আহ্বান। এখানে ‘মঙ্গল’ শব্দ দিয়ে সবার ভালো ও কল্যাণ কামনা করা হয়।
‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আজ বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক। ২০১৬ সালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে শোভাযাত্রাটি শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেনি, বাংলাদেশের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও স্বীকৃতি পেয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। একদল মনে করেন, ‘মঙ্গল’ শব্দ নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা আচারিক ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তারা ‘আনন্দ’ শব্দ ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে, অনেকেই মনে করেন এই আপত্তি অপ্রয়োজনীয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ বাংলা ভাষায় ‘মঙ্গল’ শব্দ বহুকাল ধরে শুভ, কল্যাণ ও ভালো কিছুর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে; কোনো একক ধর্মের প্রতিনিধিত্বশীল হিসেবে নয়।
অনেকে মনে করেন, এভাবে শব্দ বা প্রতীক নিয়ে প্রশ্ন তোলা আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সীমিত করার চেষ্টা। আজ নাম বদলানো হচ্ছে, কাল হয়তো পুরো ঐতিহ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে। এর ফলে মানুষের মনে নিজের সংস্কৃতি নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়।
অন্যভাবে দেখলে, নাম পরিবর্তনের এই প্রবণতা আমাদের আত্মবিশ্বাসের সংকটকেও তুলে ধরে। আমরা কি এতটাই অনিশ্চিত যে একটি শব্দের ভেতর লুকানো অর্থ বুঝতে পারি না? ‘মঙ্গল’ মানে যদি ভালো, শুভ বা কল্যাণ হয়, তাহলে এই শব্দে আপত্তি থাকার কথা নয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে ‘মঙ্গল’ শব্দের ব্যবহার নতুন নয়। ‘মঙ্গলকাব্য’ থেকে শুরু করে আমাদের প্রতিদিনের কথোপকথনে এই শব্দ শুভ ও ইতিবাচকতার প্রতীক হিসেবেই টিকে আছে।
প্রশ্ন হলো, এখন কেন শব্দটিকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চশমা দিয়ে দেখা হচ্ছে?
সংস্কৃতি যেহেতু প্রবহমান, তাই ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামগুলো ভুল নয়। সমস্যা হলো যখন এই পরিবর্তন স্বতঃস্ফূর্ত না হয়ে কারও চাপে বা বিতর্কের মুখে করা হয়। তখন সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামের সঙ্গে আবেগ ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে। নতুন নাম যদি তা ধারণ করতে না পারে, তাহলে বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সমাজে বিভিন্ন মত থাকবে, বিতর্ক থাকবে। সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ওই প্রশ্ন যদি জ্ঞানভিত্তিক ও সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়, তাহলে তা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। আর যদি প্রশ্নগুলো ভীতি, বিভ্রান্তি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে করা হয়, তবে তা সংস্কৃতিকে সংকুচিত ও সীমিত করে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের ভিন্ন এক বাস্তবতার সাক্ষী করিয়েছে। কট্টরপন্থীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রাখা এবং সংস্কৃতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাষ্ট্র চাইলে খুব সহজেই সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে আমাদের বৈচিত্র্যময় নিজস্ব ঐতিহ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে ভিনদেশী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়েছে।
অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, সংস্কৃতিই ছিল আমাদের লড়াইয়ের শক্তি। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সবখানেই শিল্প-সংস্কৃতি মানুষকে সাহস দিয়েছে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ওই লড়াইয়েরই ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট একটি প্রতীক।
শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’, ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ যাই হোক, মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অশুভকে দূর করে মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু একটি নামের সঙ্গে ৩৫ বছরের স্মৃতি ও মানুষের ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে। বছরের পর বছর ধরে ওই নামের সঙ্গে যে আবেগ ও অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে, তা ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ে রূপ নিয়েছে। নাম বদলে দিলে ওই ধারাবাহিকতা ছিন্ন হওয়ার ভয় থাকে। আর এই সুযোগটাই নিতে চায় ওই গোষ্ঠী, যারা আমাদের সংস্কৃতিকে উল্টো পথে নিতে চায়। লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুফি ভাবনা, পালা গান, কীর্তন সব মিলেই আমাদের পরিচয়। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি।
তাই নাম বদলানোর আগে ভাবা উচিত, আমরা কি কেবল একটি শব্দ বদলাচ্ছি, নাকি অজান্তেই একটি দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ঐতিহ্য এবং তার অন্তর্গত ভাবনাকেও ভেঙে ফেলছি? একটি নামের ভেতরে যে স্মৃতি, যে ইতিহাস, কত মানুষের গল্প জমা থাকে, তা কোনো কাগজে লেখা সিদ্ধান্তে সহজে বদলে দেওয়া যায় না।
সংস্কৃতির শক্তি তার বিস্তৃতিতে, তার গ্রহণযোগ্যতায়। আমরা যদি ওই বিস্তৃত অর্থ ভুলে যাই, তাহলে অজান্তেই নিজেদের শিকড় থেকেই দূরে সরে যাব। তখন শুধু একটি নাম নয়, আমাদের ভেতরের সংযোগটাও ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসবে। এই কারণেই নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন শুধু ভাষার প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের স্মৃতির প্রশ্ন, আমাদের পরিচয়ের প্রশ্ন এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্ন।