Published : 24 Mar 2026, 01:39 PM
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা জায়োনিস্ট-সমর্থক শাসনের সৃষ্ট ব্যাপক ও অপরিকল্পিত অস্থিরতা আমাকে বাস্তব সময়ের যুদ্ধ বিশ্লেষণ করতে বাধ্য করেছে। এই বিশ্লেষণে আমি বর্তমান ইরান সংঘাতকে কোনো সাধারণ সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে নয়, বরং দুই দশক ধরে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত করা ইরানের এক পরিকল্পিত ক্ষয়ক্ষতির (war of attrition) কৌশল হিসেবে দেখছি।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাত নিয়ে আমার গবেষণা এবং ২০০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত দুটি বাস্তব যুদ্ধ-পরিকল্পনা সভায় সরাসরি উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে—যেখানে ইরানকে সামরিকভাবে দখল করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়—পশ্চিম এশিয়া ও ইউরেশিয়ার ঘটনাবলির এই পর্যালোচনা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ (decapitation strike)-এর অবাস্তব কল্পনাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেন ধৈর্য, উদ্ভাবন ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার মাধ্যমে ইরান দীর্ঘ খেলায় জয়ী হচ্ছে। যুদ্ধের ২৫তম দিনে পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদী অহংকারের বিরুদ্ধে অভেদ্য প্রতিরোধের একটি স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
১. দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ‘হোলি গ্রেইল’ যুদ্ধ এবং ব্যর্থ ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’
আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৯০-এর শেষভাগ থেকেই (এমনকি তারও আগে) ইরান ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য—প্রথম ইরাক যুদ্ধের ঠিক পর থেকেই। আরও প্রমাণ হলো, একসময় মেরিন কোর স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণের সময় একটি প্ল্যানিং অনুশীলনে আমাকে ইরানের বন্দর আব্বাসকে মেরিন কর্পসের আক্রমণ থেকে রক্ষার পরিকল্পনা করতে বলা হলো। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সক্ষমতা যাচাই এবং ইউএস মেরিন কোরের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, যাতে পরে তাদের পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়। ‘ইরান হচ্ছে সেই হোলি গ্রেইল’… এই যুদ্ধ ১৯৯০-এর শেষভাগ থেকেই পরিকল্পিত… এমনকি হয়তোবা তারও আগে থেকে।
নিওকন, জায়োনিস্ট এবং ‘প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’র অবশিষ্টাংশ বিশ্বাস করেছিল যে, একটি দ্রুত ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ সপ্তাহান্তে শাসনকে উল্টে দেবে এবং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। বাস্তবে, ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইকের আধ ঘণ্টা পর… তারা টের পেল যে তাদের সেই আশা পূরণ হচ্ছে না এবং তাদের কোনো প্ল্যান বি ছিল না।’
ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত করা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ পাঁচ দিনের বিরতি? এটি সম্পূর্ণ আর্থিক আতঙ্কের ফল: ‘ট্রাম্প সংখ্যাগুলো দেখলেন, বাজার দেখলেন, সোনা দেখলেন, বন্ড মার্কেট দেখলেন… মূল কারণ বন্ড মার্কেট… যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ বন্ড ইয়েল্ড নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না।’
২. ইরানের মূল কৌশল: বিকেন্দ্রীকৃত মোজাইক আকারে ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ (‘দ্য গ্রেট কনস্ট্রিকশন’)
এটি আমার বিশ্লেষণের মূল উপাত্ত। ইরান কোনো ‘ব্লিটজক্রিগ’ বা দ্রুত বিজয়ের লক্ষ্যে যুদ্ধ করছে না; বরং তারা একটি সার্জিক্যাল ক্ষয়ক্ষতির কৌশল বাস্তবায়ন করছে—যা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিকেন্দ্রীকৃত মোজাইক কৌশল’ নামে পরিচিত—যার লক্ষ্য শত্রুকে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দেওয়া।
এর গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ:
• ২০ বছরের প্রস্তুতি (২০০৫–২০০৬ থেকে): ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা, লুকানো ড্রোন ঘাঁটি এবং অবিরাম উদ্ভাবনের ফলে ‘আমরা জানি না তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কোথায়… প্রতি সপ্তাহে তারা নতুন অস্ত্র বের করে।’
• ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ ও আক্রমণাত্মক পরিবর্তন: ইরান ব্যাকরণগত প্রতিরক্ষা থেকে সরে ‘দ্য গ্রেট কনস্ট্রিকশন’-এ চলে গেছে—ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নোড (হাইফা রিফাইনারি, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, দিমোনা রিয়্যাক্টরের কাছাকাছি ভবন) লক্ষ্য করে সার্জিক্যাল আঘাত করছে; কিন্তু ইচ্ছাত্ত্বিকভাবে ব্যাপক বেসামরিক হতাহত এড়িয়ে চলছে, যা শিয়া নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত।
• প্রমাণিত অস্ত্র: খোররামশাহর-৪ এবং ফাত্তাহ-২ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে অ্যারো-৩ সহ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে গেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে ‘টোল’ আদায় করে এবং প্রয়োজনে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে।
• টেকসই কৌশল: ‘তারা পরবর্তী ছয় মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে… কারণ প্রণালি রক্ষায় তাদের কী আছে তা আমরা এখনও দেখিনি।’ তাই আমি বলছি: ‘এটি একটি ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধ, যার লক্ষ্য অপরপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়া।’
৩. যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানের দাবি অসম্ভব বা অবাস্তব হলেও তা প্রকারান্তরে যৌক্তিক বলে সমর্থন পাচ্ছে
তাদের দাবিগুলো ইরানের দুর্বলতা থেকে আলোচনা করছে না। ইরানের মূল দাবির তালিকা:
• পশ্চিম এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটির সম্পূর্ণ অপসারণ।
• বিপুল ক্ষতিপূরণ (প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের আলোচনা চলছে)।
• পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘যেভাবে আমরা চাই’ তা পুরোপুরি চালিয়ে যাওয়া।
• আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ক্লজও তারা চাচ্ছে, যেন ইসরায়েল ও আমেরিকা কখনই ইরানসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আর আক্রমণ না করে।
তারা আরও বলছে যে এটি ‘অসম্ভব… কোনো যুদ্ধবিরতি নয়, কোনো মধ্যস্থতা নয়… আমরা শেষ পর্যন্ত যাব।’ ইরান এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করবে না যেখানে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটি থেকে যায়।
৪. ঐতিহাসিক নজির এবং ‘পারস্য সংস্কৃতির আত্মা’ বনাম ‘বর্বরতার আত্মা’
আমি সরাসরি যোগসূত্র টানছি:
• ইরাকের নজির: ‘শক অ্যান্ড অ্যাও’-এর ২৩ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে অবিরাম ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে (হাশদ আশ-শাবি মডেল) বিতাড়িত করা হয়েছে।
• আফগানিস্তান/ভিয়েতনাম: সাম্রাজ্যগুলো ‘দীর্ঘমেয়াদি অবিরাম… দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্টতা… আধ্যাত্মিক শক্তি’-কে অবমূল্যায়ন করে।
এ এক অসামঞ্জস্য আর অমানবিক নৃশংসতা: ‘একদিকে ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্রীয় বর্বরতার আত্মা, অন্যদিকে পারস্য সংস্কৃতির আত্মা… তারা এভাবে ইরানের জনগণকে পরাজিত করতে পারবে না।’ ইরানের শিয়া শহীদী মনোভাব ও আইআরজিসি কমান্ড কাঠামো তাদেরকে টিকে থাকার শক্তি দেয়—যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের নেই।
৫. গ্লোবাল সাউথের চ্যাম্পিয়ন এবং বহুমুখী প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: ‘ইরান এই যুদ্ধে সমগ্র গ্লোবাল সাউথের হয়ে লড়ছে… এটি মাত্র তিন দেশের সমন্বয়ে গঠিত BRICS-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়।’ তবু BRICS এখন ‘কোমায়’ এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন শুধুমাত্র একটি ‘দুঃখজনক বিবৃতি’ দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে (ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে গোয়েন্দা তথ্য এবং ইরানের জাহাজের অবস্থান বা গ্রিড কোঅর্ডিনেটস দিচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত/ভারতের বিভেদ)। রাশিয়া ও চীন নীরবে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান, হার্ডওয়্যার উন্নয়ন (শাহেদ ড্রোন) এবং কূটনৈতিক আড়াল দিচ্ছে—কিন্তু প্রকাশ্য উদ্ধার নয়। ইউরেশিয়ার ভবিষ্যৎ এখন রাশিয়া-চীন-ইরান অক্ষের পরীক্ষায় অটল থাকার ওপর নির্ভর করছে।
৬. আঞ্চলিক ঝুঁকি এবং লাভবান হওয়া
আজারবাইজান যদি ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের অনুমতি দেয়, তাহলে তাকে ‘বিশাল মূল্য’ দিতে হবে (বিটিসি পাইপলাইন ব্যাহত হবে, যা ইসরায়েলের তেলের ৩০–৪৯ শতাংশ সরবরাহ করে)। যুদ্ধ লাভবানদের সমৃদ্ধ করছে (জারেড কুশনারের ৫ বিলিয়ন ডলারের সৌদি চুক্তি, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল)। অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রীয় ঘাঁটিগুলো (ইতিমধ্যে ৭০–৮০ শতাংশ আঘাতপ্রাপ্ত) সম্পূর্ণ বিতাড়নের মুখে।
তাই আমার চূড়ান্ত মতামত: ১. এটি ইরানের পছন্দের যুদ্ধ নয়, কিন্তু উন্নত প্রস্তুতি, অভিযোজন ক্ষমতা ও নৈতিক স্পষ্টতার মাধ্যমে এটি তারা জয় করছে। ২. যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পক্ষের কোনো টেকসই কৌশল নেই, শুধু আর্থিক আতঙ্ক ও প্রচারণা আছে। ৩. ইরানের ক্রমাগতভাবে ইসরায়েল ও আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর ফলে আমেরিকাকে হয়তো অপমানজনক পশ্চাদপসরণ করতে হতে পারে, বা নিজেদেরকে প্রত্যাহার অথবা মার্কিন সাম্রাজ্যের আর্থিক আত্মধ্বংস ঘটাবে। সুতরাং ইরানের কথা হলো: ‘আমরা শেষ পর্যন্ত যাব… উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা অসম্ভব।’
চূড়ান্ত কথা—ইরানের প্রতিক্রিয়া সুনির্দিষ্ট, ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিপ্রাপ্ত এবং নির্লজ্জভাবে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। এটি আধুনিক হাইব্রিড যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক সতর্কবার্তা: যেসব সাম্রাজ্য পারস্যের দৃঢ়তা ও গ্লোবাল সাউথের জাগরণকে অবমূল্যায়ন করে, তারা নিজেদের বিপদ ডেকে আনে। পাঁচ দিনের বিরতি শুধু একটু হাফ ছেড়ে শ্বাস নেওয়ার বিরতি, তারপর আবারও যুদ্ধাস্ত্র এবং ক্ষয়ক্ষতির যন্ত্র চলতে থাকবে।
বলে রাখা ভালো, আমার মতামত নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্ব-বিশ্লেষণ এবং ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকজন বিশ্বমানের কৌশলগত বিশ্লেষকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি।