Published : 22 Nov 2025, 12:09 PM
যারা নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের প্রচারণা ও ৪ নভেম্বরের নির্বাচন অনুসরণ করেছেন, তারা নিশ্চয় বলবেন—নির্বাচনের মাত্র ১৭ দিন পর ট্রাম্প ও মামদানির সাক্ষাৎ একেবারেই অসম্ভব ঘটনা। সেই অসম্ভব ঘটনাই ঘটে গেল ২১ নভেম্বর, হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে।
মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলো কত যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, তা খুবই সঙ্গত কারণেই করেছিল। মামদানি প্রাইমারি নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই ট্রাম্প তাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতে শুরু করেন। নির্বাচনে মামদানিকে হারানোর জন্য এমন কোনো উপায় ছিল না যা তিনি ব্যবহার করেননি। প্রকৃতপক্ষে, প্রাক্তন গভর্নর কুওমোর নির্বাচনি প্রচেষ্টায় সব ধরনের রসদ সরবরাহ করেছিলেন ট্রাম্পই।
নির্বাচনের পর বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল অ্যাটর্নি জেনারেলকে মামদানির নাগরিকত্বের কাগজপত্র খতিয়ে দেখতে বলেছে, যাতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তাকে উগান্ডায় ফেরত পাঠানো যায়। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, তিনি ফেডারেল রিজার্ভ সৈন্য পাঠিয়ে নিউ ইয়র্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবেন, যেমন তিনি করেছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে।
যেখানে শত্রু এখন বন্ধুও বটে
২১ নভেম্বর সব বদলে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ট্রাম্প–মামদানি বৈঠকের পর এক প্রতিবেদনে লিখেছে— “নিউ ইয়র্কের কুইন্সের অধিবাসী এই দুই ব্যক্তি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নিউ ইয়র্কের জন্য তাদের অভিন্ন আশার কথা বলেন। তারা জনহিতৈষী আদর্শের ওপর জোর দেন এবং ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক ভিত্তি যাই হোক না কেন, সবকিছুকে পেছনে ফেলে একমত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি ঘোষণা করেন যে, ৩৪ বছর বয়সী গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক মামদানি সিটি হল পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিউ ইয়র্কে ফিরে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।”
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক শহরের ডেমোক্রেটিক প্রশাসনের ওপর বিরক্ত হয়ে ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্ক সিটি ছেড়ে ফ্লোরিডার মারা-এ-লাগোকে তার প্রধান বসস্থান হিসেবে স্থাপন করেন। মামদানি মেয়র হওয়ার পর ট্রাম্পের নিউ ইয়র্কে ফেরার ইচ্ছা—এটি মামদানির জন্য বড় আস্থার ভোট। ট্রাম্পের এই আস্থা মামদানিকে অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। যারা ভাবছিলেন মামদানির নির্বাচন নিউ ইয়র্ক শহরের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে, তারা রাতারাতি মত পাল্টাবেন।
মেয়র নির্বাচনের সময় ট্রাম্প মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ ট্যাগ দিয়েছিলেন, আর মামদানি ট্রাম্পকে ‘স্বৈরাচারী’ বলে ডাকতেন। এখন আশা করা যায়, দু’জনেই সেইসব তিক্ততা পিছনে ফেলে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমি খুব বিশ্বাসী যে মামদানি একটি ভাল কাজ করতে সক্ষম হবেন।”
এই বৈঠক ইসরায়েলকে আতঙ্কিত করবে
সাক্ষাতের পর, তারা দুজন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে নিউ ইয়র্ক সিটির নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ইসরায়েলকে গণহত্যা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সেই গণহত্যায় অর্থায়নের অভিযুক্ত করেছেন।
ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়ে এক সাংবাদিক তাদের দুজনকেই প্রশ্ন করেন। নবনির্বাচিত মেয়র বলেন, “ইসরায়েলি সরকার গণহত্যা করছে এবং আমাদের সরকার এতে অর্থায়ন করছে। আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছি এবং আমার উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।”
ট্রাম্প এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি, কিংবা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকারও করেননি।
মামদানি সাংবাদিকদের বলেন, নিউ ইয়র্কবাসীরা তাদের করের টাকা যুদ্ধে খরচ হতে দেখে ক্লান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, “শান্তির দিকে সমস্ত প্রচেষ্টার প্রশংসা করি।” ট্রাম্পও উল্লেখ করেছেন যে তিনি ও মামদানি উভয়ই শান্তি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ ভাগ করেছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউস বৈঠকের মাত্র এক দিন আগে, মামদানি ঘোষণা করেছিলেন যে নিউ ইয়র্কে আসলে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা হবে। ট্রাম্প এই ঘোষণার কোনো সমালোচনা করেননি। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মামদানির বন্ধুত্বপূর্ণ বৈঠক নেতানিয়াহু ও তার রাজনৈতিক ঘেরাটোপকে আতঙ্কিত করতে পারে।
ট্রাম্প কেন মামদানির দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেন
মামদানির নির্বাচনের পর, একটি কলামে আমি লিখেছিলাম—“যাঁরা ট্রাম্পকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছেন, ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্মান দেখিয়ে মেনে নিয়েছেন। যেমন চীন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও পুতিন। মামদানির ক্ষেত্রেও তা-ই হতে পারে; দুজনেই সম্মানজনক সহ-অবস্থান বেছে নেবেন।”
ঠিক সেইটাই ঘটল। ট্রাম্প যখন দেখেছেন মামদানিকে কুপপাৎ করার সব অস্ত্র নিঃশেষ হয়ে গেছে, তখন তিনি সহ-অবস্থানকেই বেছে নিয়েছেন।
অনেকেই মনে করেন, তার প্রেসিডেনশিয়াল মেয়াদ শেষে তিনি সত্যিই নিউ ইয়র্ক সিটিতে বসবাস করতে চান। ট্রাম্প জন্মগ্রহণ করেছিলেন নিউ ইয়র্কে, ৭৯ বছর আগে, জ্যামাইকা হাসপাতালে। তার শৈশব, যৌবন এবং পুরো ব্যবসায়িক জীবন কেটেছে নিউ ইয়র্কে। যে কারণে তিনি যে নিউ ইয়র্ক শহরকে সত্যিই ভালোবাসেন, তা নিয়ে কারো সন্দেহের সুযোগ নেই। শহরের নগরপালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে জীবনের বাকিটা সময় নিউ ইয়র্কে কাটানোর ইচ্ছা—এটি ধারণা করার যথেষ্ট কারণ। তিনি সংবাদ সম্মেলনে নিজেই এ কথা স্বীকার করেছেন।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের জনমতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তার মতো কট্টর ইসরায়েল সমর্থকদের সংখ্যা এখন কম। মার্কিনিরা ফিলিস্তিনিদের দাবির প্রতি এখন অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। তাই ট্রাম্প যদি ক্রমান্বয়ে ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
ট্রাম্পের ‘কাদা ছোড়াছুড়ির’ রাজনীতি তার জন্য ভালো কিছু আনেনি। যদিও তিনি তার কট্টর সমর্থকদের সমর্থন পেয়েছেন, মার্কিন জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। তিনি যদি শান্তি ও সৌহার্দ্যের রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে নিজের জন্য একটি লিগ্যাসি গড়ে তুলতে চান, তাতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
মামদানিরও ট্রাম্পকে প্রয়োজন হবে
সামনে মেয়র হিসেবে সফল হতে মামদানিকে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তার প্রথম কাজ হবে—তার তৈরি করা কোয়ালিশন অক্ষুণ্ণ রাখা। ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক তার কোয়ালিশনকে আরও বড় ও শক্তিশালী করবে।
নিউ ইয়র্কবাসীকে দেওয়া তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সহজ হবে না। এগুলোর অর্থায়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য প্রয়োজন। ট্রাম্প যদি সহযোগিতা করেন, নিউইয়র্কের ব্যবসায়ী ও করপোরেট নেতাদের সমর্থন পাওয়া মামদানির জন্য সহজতর হবে।
মামদানির ফিলিস্তিনি সমর্থকরা এই নতুন সম্পর্কের সবচেয়ে আনন্দিত প্রাপক হবেন এবং ফিলিস্তিনি অধিকারকে এগিয়ে নেওয়া মামদানির পক্ষে আরও সহজ হবে।
ট্রাম্প ও মামদানি—দুজনই খুব চতুর রাজনীতিবিদ। তাদের নতুন সম্পর্ক থেকে উভয়েই নিজেদের জন্য বড় লভ্যাংশ খুঁজে পাবেন। এই সম্পর্ক নিউ ইয়র্কবাসীর জন্য ফলদায়ক হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা বাড়াবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক