Published : 09 Apr 2026, 08:49 AM
‘ইরান যুদ্ধ শেষ’ হওয়ার পথে—আপাতত এমনটাই বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ১০ দিনের আল্টিমেটামের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সায় দিয়েছে উভয় পক্ষ। এই সায়কে ৪০ দিন ধরে চলা ‘ত্রিদেশীয় যুদ্ধ’ বন্ধের সূচনা বলা যেতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান। তবে একে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সফলতা মনে করার কোনো কারণ নেই। এখানে পাকিস্তান সেই দলীয় আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করেছে, যাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলে যেন ‘নো বল’ ডেকে বসে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান—কার্যত যুদ্ধটা এই তিন পক্ষের হলেও বেশ কয়েকটি দেশ সেখানে প্রক্সি হিসেবে কাজ করেছে, পাকিস্তান যার অন্যতম।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল ও কাবুলে হামলা চালায়। অনেক বিশ্লেষক তখন বলেছিলেন, মূলত ইরান যেন আফগানিস্তানের সঙ্গে লাগোয়া প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত থেকে কোনো সুবিধা না পায় এবং আফগানিস্তান যেন আগ বাড়িয়ে ইরানকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে না পারে, সে কারণেই পাকিস্তানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ কার্যত বন্ধ হলেও এখনো উভয়পক্ষ নানা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ২৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য ইসরায়েল আগেই বলে রেখেছে যে, লেবাননে হিজবুল্লাহর স্থাপনায় হামলা বন্ধ যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত হবে না। ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তার জবাব দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে ইরান।
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে। তারা দাবি করেছে যে, তাদের সামরিক লক্ষ্যগুলো এরই মধ্যে ‘অর্জিত’ হয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক এবং নিরাপদভাবে’ খুলে দিতে রাজি।
চুক্তিতে সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের প্রধান শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে এমন ১০ শর্ত, যেটি কার্যকর হলে বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের গুরুত্ব বেড়ে যাবে। শর্তের মধ্যে ইরানে আগ্রাসন বন্ধ যেমন আছে, তেমনি ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির স্বীকৃতি, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব প্রত্যাহার, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রস্তাবের অবসান থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারও আছে।
যুদ্ধে কে জিতল—এই প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর নেই। এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে জয়-পরাজয়ের কোনো তাৎক্ষণিক উপসংহার টানা প্রায় অসম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির খোলনলচে পাল্টে দেবে, সেটি অনুমান করা যাচ্ছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনের মধ্যেই ইরান তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হারিয়েছে। এই ৪০ দিনে ইরানে হাজারো মানুষ নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজারের মধ্যে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বেসামরিক জনগোষ্ঠীও রয়েছে। যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মাথায় এক স্কুলে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ২৫০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষাকর্মী নিহত হয়েছে।
তেহরানসহ ইরানের নানা শহরের অন্তত ১৫ হাজার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জোট। সেসব হামলায় প্রায় ৪০ হাজার ভবন ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে। বিশেষ করে সরকারি স্থাপনার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। খারগ দ্বীপ—যেখান থেকে ইরান সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করে—সেখানে একাধিকবার বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও রেললাইন ধ্বংস করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য নিহতের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ জন এবং ইসরায়েলের ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দুই দেশের অন্তত ১ হাজার নাগরিক আহত হয়েছে।
এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও এই যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়েছে। ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা আমেরিকার ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননে প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১,৫৩০ জন লেবানিজ প্রাণ হারিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে যেন ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে উঠেছে।
বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক দাবি করেছেন, এই যুদ্ধে আমেরিকাকে অঢেল খরচ করতে হয়েছে—যেটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
এ তো গেল দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। কিন্তু বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব ছিল দেখার মতো। মধ্যপ্রাচ্যের গুটিকয়েক দেশ ছাড়া আমেরিকার আর কোনো মিত্র এই যুদ্ধে যোগ দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও প্রায় সব দেশই যুদ্ধে যোগ দিতে কার্যত অস্বীকার করেছে। নিজেদের এয়ারবেস ব্যবহার করতে দিতে আপত্তি জানিয়ে শুরুটা করেছিল স্পেন। এরপর একে একে কানাডা, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। সবার কণ্ঠে ছিল অভিন্ন সুর—‘এই যুদ্ধ আমাদের নয়।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, মিত্র দেশগুলোর এমন আচরণ আমেরিকার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল।
উল্টো ইসরায়েলের কুমন্ত্রে এই যুদ্ধে যোগ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের জনগণের তোপের মুখে পড়েছেন। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসে ‘রাজা চাই না’ স্লোগানে স্মরণকালের বড় বিক্ষোভ করেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিরোধী পক্ষ প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। জনগণ যুদ্ধের ব্যয়ের কারণে জীবনযাত্রার চাপ, অনির্দিষ্ট সময় ধরে সংঘাত চলার আশঙ্কা এবং বেসামরিক লোকজনের ক্ষতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শেষমেশ ডনাল্ড ট্রাম্প বলতে বাধ্য হয়েছেন, “আমি এই যুদ্ধে জিততাম, কিন্তু দেশের জনগণ চাইছে বলেই সরে এসেছি।”
যুদ্ধ শুরুর আগে কেউ ভাবেনি যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে ইরান ৪০ দিন ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার পতন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ইরান তাদের সম্মুখসারির নেতাদের হারিয়েছে বটে, কিন্তু ৪০ দিন ধরে তারা শুধু টিকেই থাকেনি, ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সক্ষম হয়েছে। অত্যন্ত কম খরচে তৈরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
অপরদিকে ইরানের বিপ্লবী সরকারের পতন তো হয়নি, বরং কয়েক স্তরের নেতৃত্ব হারানোর পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে। যুদ্ধের ভেতর অন্তত কয়েকটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে হওয়া জনবিদ্রোহে যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার পেছনে মোসাদের হাত ছিল। বিশেষ ইউনিফর্ম পরে মোসাদের এজেন্টরা মিছিলে ঢুকে গুলি চালিয়েছিল বলে খবর এসেছে। এ খবর সত্য হলে, গণতন্ত্রকামী মানুষের মুক্তির অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে।
হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানির চালিকাশক্তি। বিশ্বের মোট জ্বালানির এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয় এই পথে। ৪০ দিনের মাথায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৯ ডলার থেকে প্রায় ১৩০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে সেটি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেত বলে মনে করা হয়।
৪০ দিন পর হরমুজের ওপর ইরানের প্রভাব আরও মজবুত হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের দেওয়া টুইটের বিশ্লেষণ করলে এটি দাঁড়ায় যে, ইরান হরমুজে শুল্ক বসালে আমেরিকার আপত্তি নেই; বরং সেই অর্থ ইরান তাদের ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারবে।
মনে হতে পারে, এই যুদ্ধে ইরান একেবারে সঙ্গীহীন ছিল। আপাত অর্থে এটি সত্য হলেও বাস্তবে পুরোপুরি নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র না থাকলেও এই যুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সমর্থন পেয়েছে ইরান। কৌশলগত নানা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে এই দুই দেশ। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা নানা সামরিক ঘাঁটির অবস্থান চিহ্নিত করতে সহায়তা করেছে। হরমুজ দখল নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে দুই দফাতেই ভেটো দিয়েছে এই দুই দেশ।
ইরান কি এসব দেশ থেকে অস্ত্রও পেয়েছে? যুদ্ধবিরতির প্রথম দিন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে তার খানিকটা ইঙ্গিত মিলেছে। যেসব দেশ ইরানকে অস্ত্রের জোগান দিয়েছে বলে অভিযোগ, তাদের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং সেটি তাৎক্ষণিকভাবে আজ থেকেই কার্যকর হয়েছে।
৪০ দিনের এই যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির হিসাব-নিকাশ যে আমূল পাল্টে দিয়েছে, সেটি মোটামুটি পরিষ্কার। আমেরিকা যে এই যুদ্ধে জিতেনি সেটি যেমন স্পষ্ট, এটিও স্পষ্ট যে ইরান এই যুদ্ধে হারেনি।