Published : 17 Feb 2026, 09:22 PM
উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন শেষে দেশ পেয়েছে একটি নতুন সরকার। এই সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে ধারণ করে বিএনপি দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিককে নিয়েই বাংলাদেশ; আর দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো দেশই টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। তাই আমাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমকে গতানুগতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চাহিদা ও বাস্তবতা থেকে দারিদ্র্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করবে। সেই উপলব্ধির আলোকে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলবে।
‘দরিদ্র বলতে কাদের বোঝায়?’ হঠাৎ যদি কাউকে এই প্রশ্নটি করা হয়, তাহলে অধিকাংশক্ষেত্রে উত্তরটা হবে অনেকটা এ রকম–“দরিদ্র মানুষের টাকা পয়সা থাকে না। তারা না খেয়ে থাকে। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে।” কিন্তু যদি কাউকে বলা হয়, ‘দরিদ্র মানুষের কথা ভাবলে আপনার মনের পর্দায় কাদের ছবি ভেসে উঠে’। তখন কেউ হয়ত কল্পনার চোখে দেখবেন একটি ভাঙা ঘরের ছাদের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে। শিশু কোলে অসহায় বাবা-মা ভিজছেন। কেউ হয়ত বস্তির নোংরা পরিবেশে বসবাস করা মানুষের কথা ভাববেন। কারও চোখে ভাসবে ছিন্নমূল শিশুর ছবি। কেউ ভাববেন বন্যায় ফসল হারানো কৃষকের কথা, অন্য কেউ চা শ্রমিক বা অচ্ছ্যুৎ দলিত জনগোষ্ঠীর কথা।
আমরা দারিদ্র্যকে সাধারণভাবে ‘অর্থের অভাবে’ সীমাবদ্ধ করে রাখি। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদার অপূর্ণতা, এবং ব্যক্তির সামাজিক ও ভৌগোলিক প্রান্তিক অবস্থার সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক জটিল এবং অবিচ্ছিন্ন। দুপুরবেলা রিকশার হুড তুলে ঘুমিয়ে থাকা রিকশাওয়ালাকে অলস বলে মনে হয়। কিন্তু তার অসময়ের ঘুমের পেছনে বৈষম্য এবং বঞ্চনার করুণ চিত্র রয়েছে। তিনি হয়তো বস্তির টিনের ঘরে প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমাতে পারেননি। সকালে বনরুটি আর কলা খেয়ে রিকশা চালিয়েছেন। শহরে তার জন্য পানি পানের, টয়লেট করার বা একটু জিরিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, কিন্তু মাথার ওপর আছে পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার দুঃচিন্তা। আরও আছে আয়ের বড় অংশ রিকশার মালিককে দিয়ে দেওয়ার জ্বালা। এই কঠিন জীবনসংগ্রামের ভারে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আশাহীন মন আর রুগ্ন-পরিশ্রান্ত শরীর তাকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে, অধিক আয় করতে দেয় না। একইভাবে, উপকূলবাসী একটি জেলে পরিবারের ক্ষেত্রে হয়ত দেখা যাবে, এক সময় মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা পরিবারের কর্তা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র দিন দিন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। তারপরও তাকে ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে যেতে হয়। উপকূলের কাছাকাছি মাছ পাওয়া যায় না। মাছ ধরেও শান্তি নেই। দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে তাদের নির্ধারিত দামে মাছ বিক্রি করতে তিনি বাধ্য। এদিকে অন্যান্য খরচের বোঝা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এলাকার জলাশয় এবং ভূগর্ভের পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। জেলে গিন্নিকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয়। কম পানি খাওয়াতে এবং বিভিন্ন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করায় পরিবারের সদস্যরা নানাবিধ রোগে ভোগে। ফলে বেড়েছে চিকিৎসা খরচ। এদিকে এলাকায় ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেড়েছে। বার বার ঘর মেরামতের প্রয়োজন হয়। অর্থ খরচের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এই জেলে পরিবারের জন্য তাই একটি সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে আরেকটি নতুন সংকট ডেকে আনে।
বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখি-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, নতুন সরকারকে তাই ‘দারিদ্র্য’-কে বোঝার লেন্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনকে দেখতে হবে বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপটে। শুধু আয়ের অভাব নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের মতো মানব উন্নয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুগপৎ বৈষম্যের শিকার হওয়াকে বলা হয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। বর্তমানে সারা বিশ্বেই জাতিসংঘ নির্ধারিত বৈষম্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্যকে পরিমাপ করার এই ধারনাটি সুপ্রতিষ্ঠিত। এটি অনুযায়ী, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে হলে, শুধু দু মুঠো খাবার নিশ্চিত করতে পারলে হবে না। খাবার হতে হবে পুষ্টিকর। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, এটিতে সন্তুষ্ট থাকলে হবে না। নিশ্চিত করতে হবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল শিশুর গুণগত শিক্ষা লাভের অধিকার। সবার জন্য থাকতে হবে নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। পরিকল্পনা কমিশন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার যা মোট জনগোষ্ঠীর ২৪.০৫ শতাংশ। নতুন সরকারের কাছে তাই অনুরোধ থাকবে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের আলোকে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকৌশলকে আরও কার্যকর এবং ফলাফলমুখী করার উদ্যোগ নিতে। দারিদ্র্য বিমোচনের যত কর্মসূচি আছে সেগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি মৌলিক চাহিদা এবং নাগরিক অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সংযুক্ত করতে।
এ লক্ষ্যে সরকারের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। একটি দেশের জনগণের, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে এমন সব পরিস্থিতি প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও সেগুলো থেকে উত্তরণে তাদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমের প্যাকেজ নিয়ে এই ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কৌশলটি সুলিখিত হলেও এটির বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কোনমতে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতাভিত্তিক সহায়তা নির্ভর। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জীবিকায়নে সহায়তা করার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ, এককালীন নগদ বা ঋণ সহায়তা ইত্যাদিও দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যাবস্থা থেকে বের করে আনতে যথেষ্ট নয়। এই কর্মসূচিগুলোতে এমন কৌশল সংযুক্ত করা প্রয়োজন যেন প্রান্তিক মানুষ সেগুলোকে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে জীবনমানের উন্নয়ন করতে পারে। যেমন: কর্মমুখী প্রশিক্ষণ বা ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, এন্টারপ্রাইজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান, মার্কেট লিংকেজে সহায়তা, অগ্রগতি ফলোআপ ইত্যাদি।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই তার প্রভাব আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী শীর্ষ দশের মধ্যে আমাদের অবস্থান নবম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের সময় ও ধরণে যে পরিবর্তন আসছে তাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ঝড়ের মাত্রা এবং তীব্রতা বাড়ায় বার বার তারই ঘর ভাঙ্গছে যাদের নতুন করে ঘর বাধার সক্ষমতা নেই। হঠাৎ বন্যায় খেতের ফসল ডুবে গেলে জমিতে দিনমজুর হিসেবে যারা কাজ করেন তাদের দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়। নতুন সরকার দারিদ্র্য বিমোচনসহ যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করবে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে এবং ফলাফলকে টিকিয়ে রাখতে হলে কর্মসূচিগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনকে তাই অ্যাড্রেস করা জরুরি। জমিহীন একটি পরিবারকে একটা ঘর তুলে দেওয়া এখন আর যথেষ্ট নয়। সেই ঘর হতে হবে জলবায়ুসহিষ্ণু। ঝড়প্রবণ এলাকায় ঘরটি সহজে ভেঙে পড়বে না। বন্যাপ্রবণ এলাকায় সেটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর তৈরি হবে যেন সহজে পানি না ঢোকে। কৃষিকে অগ্রাধিকার দিলেই হবে না, জলবায়ুসহিষ্ণু বীজ দরিদ্র কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দুর্যোগের আগাম বার্তা যেন তারা জানতে পারে সেই লক্ষ্যে শক্তিশালী আর্লি ওয়ার্র্নিং সিস্টেম স্থাপন করতে হবে। নদীভাঙ্গন বা বন্যাপ্রবণ এলাকায় শুধু ল্যাট্রিনের জন্য বরাদ্দ দিলেই হবে না। সেখানে পোর্টেবল ল্যাট্রিন বা অন্য ধরণের এলাকা উপযোগী স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার কেবল অফিসকেন্দ্রিক নীতি প্রণয়নের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে না। সরকারের প্রতিনিধিরা প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে যাবে, তাদের জীবনের বাস্তব প্রেক্ষাপট, দৈনন্দিন চাহিদা ও সংগ্রামকে সরাসরি উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে। সেই বাস্তবতা থেকে শেখা অভিজ্ঞতার আলোকে যার যা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। আমরা চাই এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কাউকে সারা জীবন সরকারি বা অন্য কারও সহায়তায় নির্ভর করে থাকতে হবে না; বরং সহায়তার ধরন হবে এমন, যা মানুষকে ধাপে ধাপে আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে এবং নিজ প্রচেষ্টায় দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভাঙার সক্ষমতা দেবে। এই পথেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তবায়নে অর্থবহ হয়ে উঠবে—এই প্রত্যাশাই রইল।