Published : 20 Apr 2026, 10:30 AM
সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই যে আশঙ্কার কথা বারবার বলা হচ্ছিল, তা এখন আর কেবল ধারণা নয়, উদ্বেগজনক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, বিএনপি অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘প্রাতিষ্ঠানিক রোলব্যাক’ বা অর্জিত সংস্কারগুলো থেকে পিছু হটার অভিপ্রায় নিয়ে পথচলা শুরু করেছে। দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টা এখন অত্যন্ত দৃশ্যমান।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস এবং ফর্টিফাই রাইটসের মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন একযোগে সোচ্চার হয়েছে। বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রতি তাদের আহ্বান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট—'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫' এবং 'এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রেমেডি অর্ডিন্যান্স ২০২৫' অবিলম্বে সংসদে পাস করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই অধ্যাদেশগুলো সময়মতো পাস না হলে আইনি জটিলতায় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবাধিকারের রক্ষাকবচগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গুমের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার এই সুবর্ণ সুযোগটি যদি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে হাতছাড়া করে, তবে তা হবে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, সরকার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশগুলোকে পরিকল্পিতভাবে বিলুপ্ত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এগুলো ভবিষ্যতে কোনো এক সময় নতুন বিল আকারে আনা হবে—কিন্তু এই আশ্বাস আসলে একটি মারাত্মক নেতিবাচক সংকেত। এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) সদস্যরা ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগকারী সদস্যদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিলগুলো উত্থাপন না করে বিএনপি সরকার জাতির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
কমিশনের পদত্যাগকারী সদস্য নূর খান এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার যদি নতুন অর্ডিন্যান্সগুলো কার্যকর না করে ২০০৯ সালের পুরনো আইনটি পুনর্বহাল করে, তবে মানবাধিকার কমিশন পুরোপুরি একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত করার যে ক্ষমতা কমিশনের হাতে আসার কথা ছিল, তা চিরতরে হারিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে কার্যত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে দিয়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
বিএনপির বিশেষ সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে আসা সাম্প্রতিক সুপারিশগুলো দেশের বিচার বিভাগের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কমিটি মোট চারটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ বাতিলের যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে তিনটিই সরাসরি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রণীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আইনি কাঠামো, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং বিচার বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মতো যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ।
মূলত নির্বাহী বিভাগের খবরদারি ও রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক পরিবেশ তৈরি করতেই এই আইনি সংস্কারগুলো আনা হয়েছিল। এখন যদি এই অর্ডিন্যান্সগুলো বাতিল করা হয়, তবে বিচার বিভাগ আবার সেই পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়বে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হরণ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এই ধরণের নেতিবাচক পদক্ষেপ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধসিয়ে দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনরুত্থানকেই ত্বরান্বিত করবে।
এশিয়া টাইমসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা এই অর্ডিন্যান্সগুলো—বিশেষ করে গুমকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে শক্তিশালী করা—কেবল কোনো সাময়িক সমাধান ছিল না। বরং এগুলো ছিল একটি মজবুত ও কাঠামোগত সুরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নির্বিচারে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। এই আইনগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রে একটি স্থায়ী 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' বা ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আইনি ভিত্তিগুলো যদি আজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্র আবারও বিগত দেড় দশকের মতো সেই চেনা দমনমূলক চক্রে আবর্তিত হবে। উপযুক্ত আইনি বাধা না থাকলে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি কাঠামোগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে। মূলত এই রক্ষাকবচগুলো কেড়ে নেওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশকে আবারও একটি অন্ধকার ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার পুরোপুরি ভূলুণ্ঠিত হবে।
এই শেষ বক্তব্যটিই আসলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে রূঢ় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত বাস্তবতা। আমাদের দেশের মূল সমস্যাটা কখনোই কেবল কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা ব্যক্তির ছিল না; সমস্যাটি নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের নিজস্ব শাসনতান্ত্রিক নকশার গভীরে। এই ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি যে, যে কেউ ক্ষমতার শীর্ষে বসলেই ক্ষমতা তাকে সীমাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহারের সুযোগ করে দেয়।
বিস্ময়কর ও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, বিএনপি নিজেই দীর্ঘ সময় এই দমনমূলক ব্যবস্থার শিকার এবং চরম ভুক্তভোগী ছিল। অথচ এখন ক্ষমতায় এসে তারা জেনে-বুঝে হোক কিংবা না বুঝেই হোক—সেই একই স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোকে নিজেদের ব্যবহারের জন্য সযত্নে সংরক্ষণ করছে। যে ক্ষমতার দাপট একদিন তাদের ওপর আঘাত হেনেছিল, আজ সেই একই ক্ষমতার অস্ত্রটিকে সংস্কারের মাধ্যমে ধ্বংস না করে বরং নিজেদের হস্তগত করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। শাসক বদলালেও যদি শাসনের ধরন না বদলায়, তবে জনগণের মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতার সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি, যেখানে তিনি অকপটে জানিয়েছেন যে দলটির সংস্কারের পক্ষে সমর্থন ছিল কেবলই একটি 'রাজনৈতিক কৌশল'। তার মতে, সংস্কারের ওপর গণভোটের প্রস্তাবকে তারা সমর্থন করেছিল কেবল পরিস্থিতির চাপে, কারণ সে সময় বিরোধিতা করলে জনগণের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয় ছিল। এই খোলাখুলি স্বীকারোক্তি একটি রূঢ় সত্যকে সামনে নিয়ে আসে—বিএনপির কাছে সংস্কারের অঙ্গীকার কোনো আদর্শিক অবস্থান ছিল না, ছিল জনরোষ এড়ানোর একটি সাময়িক চাল।
এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টি বারবার ক্ষমতার লড়াইয়ের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখনই কোনো দল ক্ষমতার বাইরে থাকে, তারা সংস্কারের বুলি আওড়ায়, কিন্তু ক্ষমতার নাগালে আসামাত্রই সেই অঙ্গীকার থেকে পিছু হটতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই সুবিধাবাদী আচরণের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় রাষ্ট্রকে; যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক ভিত্তি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার কাঠামোটি বারবার দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। শাসনের পরিবর্তন হলেও শোষণের হাতিয়ারগুলো যখন অক্ষত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মুক্তি কেবল একটি দূরবর্তী স্বপ্নই থেকে যায়।
বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি কোনো নতুন বিষয় নয়। ক্ষমতার বাইরে থাকলে যে দলগুলো সংস্কারের ঝাণ্ডা তোলে, ক্ষমতায় আরোহণের পর তারাই আবার সেই শোষণের কাঠামোটিকে নিজের স্বার্থে আঁকড়ে ধরে। বিএনপির এই কৌশলগত পশ্চাদপসরণ প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নীতিবোধের চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষাই বড়। আন্তর্জাতিক চাপ আর মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে নাগরিক-বান্ধব করা না যায়, তবে আমরা কেবল শাসকের বদলই দেখব, নিপীড়নের অবসান নয়।
আমাদের নেতানেত্রীদের মনে করিয়ে দিতে চাই, যে আইনগুলো জনগণের অধিকার রক্ষা করে, সেই একই আইন আপনাদেরও রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারে। তাই এই সুরক্ষা কবচগুলো ধ্বংস করলে আওয়ামী লীগের মতোই করুণ পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। এতে করে লাখ লাখ তরুণ প্রজন্মের স্মৃতি ও বিবেক থেকে চিরতরে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল, ফিরছে আওয়ামী লীগ আমলের আইন