Published : 18 May 2026, 08:10 PM
অতি সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে আরও তিন ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসী বিস্তারে গণমাধ্যমের রাজস্ব কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এছাড়া মব সন্ত্রাসসহ নানা ধরনের চাপের কারণে বাংলাদেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যম স্ব-আরোপিত বিধিনিষেধের (সেলফ সেন্সরশিপ) নিগড়ে বন্দি। ফলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমছে জ্যামিতিক হারে। বলা যায়, নানাদিক থেকে কোণঠাসা, ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিল্প। তবে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে এই শোচনীয় অবস্থার একটু পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছিল।
এমন বাস্তবতায় ১৭ মে সন্ধ্যায় বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন-অ্যাটকোর একটি বিজ্ঞপ্তি নতুন অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। যা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিমণ্ডলে তীব্র বিতর্ক ও চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অ্যাটকো এক টেলিভিশন স্টেশন থেকে অন্য টেভিশন চ্যানেলে যেতে সাংবাদিকদের জন্য ‘অনাপত্তিপত্র’ (এনওসি) বা ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করার যে নির্দেশ দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অবশ্য প্রত্যাহার করে দেওয়া নতুন বিজ্ঞপ্তিতে আগের দিনের বিতর্কিত নির্দেশনাটি ‘ভুলবশত’ পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
আদৌ ভুল নাকি সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার, ঠিক কোন লক্ষ্য সামনে রেখে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মালিকরা এই স্বৈরতান্ত্রিক ও শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন—তারই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে এখনও।
বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো যে যথেষ্ট ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের খুব কাছাকাছি তাদের বিচরণ। তাই এনওসি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, যা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, তার আদ্যোপান্ত সাংবাদিকদের তো বটেই, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার কাছে পরিষ্কার। টেলিভিশনের চাকরি ছেড়ে এলেও ব্যক্তিগতভাবে আমারও জানা আছে, মালিকরা সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতায় লাগাম টানতে চান। এই চাওয়া হঠাৎ ‘ভুল করে’ বাইরে চলে আসা একটি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হয়েছে।
সাংবাদিকদের যোগ্যতা অনুযায়ী সুবিধামতো উচ্চ বেতন ও পদবিতে অন্য চ্যানেলে যোগ দেওয়া তারা বন্ধ করতে চান। পরিষ্কার করে বললে, তারা সম্মিলিতভাবে এমন এক স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন, যার মাধ্যমে সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের নিজের টেলিভিশনে আটকে রাখা যায়। যা রীতিমতো জবরদস্তিমূলক বন্দোবস্ত হিসেবেই দৃশ্যমান।
একটু মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, বাকি আট-দশটা পেশার সঙ্গে টেলিভিশনের সাংবাদিক ও অন্য কর্মীদের কাজের সাদৃশ্য খুব কম। টেলিভিশন সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল ও স্বাধীন পেশা। টেলিভিশনের অন্য কর্মীরাও সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত। অনাপত্তিপত্রের শৃঙ্খলে এই পেশার মানুষকে বন্দি করার সুযোগ নেই। এটি নৈতিকতাবিরোধী ও দমনমূলক চিন্তা। সত্যি এমন হটকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মেধাশূন্যতা তৈরি হবে। এছাড়া বাধ্যতামূলকভাবে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার এই বিধি শ্রম আইনেরও পরিপন্থী।
অ্যাটকোর নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি দেখার পর একটি জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদের কথা বারবার মনে পড়ছিল। সেটি হলো—‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নাই, কিল মারার গোঁসাই’। যার আভিধানিক অর্থ হলো—দায়িত্ব নেওয়ার বা অন্নসংস্থান করার কোনো ক্ষমতাই নেই, উল্টো শক্তি বা খবরদারি দেখাতে ওস্তাদ। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বর্তমানে বাংলাদেশে সম্প্রচারে থাকা ৪০টির বেশি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কয়টিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা হয়? কয়টি টিভি বছর শেষে সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করে? কয়টি টিভিতে নারী কর্মীরা যথাযথভাবে আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি পান? কয়টি টিভি একজন সাংবাদিকের পেশাগত নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়? হঠাৎ কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করতে হলে কোন কোন টেলিভিশন বিধি মোতাবেক তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়? এছাড়া কয়টি টিভি চ্যানেল চাকরি ছাড়ার সময় তার কর্মীর বকেয়া বেতন-ভাতা যথাযথভাবে পরিশোধ করে থাকে? ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিকতা ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ওপরের প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগ উত্তরই নেতিবাচক। বরং কিছু কিছু টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার বা বঞ্চিত করার প্রচেষ্টার উদাহরণই বেশি। নিয়মিত বেতন-ভাতা তো রীতিমতো কল্পনা!
বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল মালিকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তি, দুর্নীতিসহ নানা কাণ্ডকীর্তি ও অপকর্মের আলোচনা আজকের এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তবে সেই আলোচনা যে বেশ বড় এবং বহু মালিকের জন্য ভীষণ বিব্রতকর, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সেই আলোচনা থাক। বরং গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তা করা যেতে পারে। হ্যাঁ, এ কথা মানতে হবে—অনেক সংবাদকর্মী দ্রুত কর্মস্থল পরিবর্তন করে থাকেন। এতে কিছু কিছু টিভি চ্যানেলকে অবশ্যই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই বলে কর্মস্থল পরিবর্তনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুমকি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এটা হতে পারে না। এতে টেলিভিশন সাংবাদিকরা দাসত্বমূলক বন্দোবস্তে ঢুকে যাবেন। যার ফল কারও জন্যেই ভালো হওয়ার কথা নয়। বরং বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো কর্মীদের স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করতে পারে।
চলতি মাসের শেষে ঈদুল আজহা। কেউ একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, বোনাস দূরে থাক, গত এপ্রিল মাসের বেতন বাংলাদেশের কয়টি টিভি চ্যানেল তাদের কর্মীদের বুঝিয়ে দিয়েছে? চলতি মাসের বেতন ঈদের আগে কয়টি টিভি চ্যানেল কর্মীদের দেবে, সেই নিশ্চয়তা দিয়েছে?
সংবাদকর্মী ও অন্যান্য কুশলীদের অনাপত্তিপত্রের শিকলে না বাঁধার চেষ্টা করে তাদের প্রাপ্য নিশ্চিতের চেষ্টা করুন। এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে এবং তাহলে অনাপত্তিপত্রের নিগড়ে কাউকে বেঁধে রাখতে হবে না।