Published : 10 Jun 2026, 08:46 PM
মিয়ানমারের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহী শিবিরের চার তরুণ কখনোই দেশের গৃহযুদ্ধের অংশ হতে চাননি। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কোনও ইচ্ছাও তাদের ছিল না।
তাদের একজন ছিল রাঁধুনি। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। পরিচয়পত্র (আইডি) না থাকায় তাকে আটকে রেখে জোর করে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে নেয় মিয়ানমার জান্তা।
দ্বিতীয়জনকে ধরে আনা হয় গভীর রাতে কারাওকে লোকসঙ্গীতের আসর থেকে ফেরার পথে। আর তৃতীয়জন বন বিভাগে কাজ করতেন। তিনিও গ্রেপ্তার হন।
চতুর্থ তরুণের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর তার জুতোর ভেতর মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসানো হয় এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী এই তরুণদের একজন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে বলেন, “কী ঘটছে তা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”
আরেকজন বলেন, “আমাদের দিয়ে এমন সব কাজ করানো হতো যা আমরা করতে চাইতাম না। সকালে, দিনের বেলা কিংবা রাতে কোনও সময়ই আমাদের একটুও বিশ্রাম দেওয়া হত না। নিয়মিত সেনারা কোনও কাজই করত না, সব খাটুনি যেত আমাদের মতো জোর করে ধরে এনে নিয়োগ দেওয়া সেনাদের ওপর দিয়ে।”
চার মাসের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে কারেন রাজ্যের ফ্রন্টলাইনে (সম্মুখ সমর) পাঠানো হয়। একদিন রাতে গোসল করতে যাওয়ার পথে সুযোগ বুঝে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
তবে পালানোর পরপরই তারা পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) নামক একটি বিদ্রোহী দলের টহল চৌকির সামনে পড়েন এবং তাদের আটকে রাখা হয়।
বর্তমান শিবিরে তারা অনেক ভাল আছেন জানিয়ে বলেন, এখানে তাদের সঙ্গে পরদেশির মতো নয়, ভাইয়ের মতো আচরণ করা হচ্ছে।আপাতত পিডিএফ-এর সঙ্গেই থাকছেন এই চার তরুণ।
পরবর্তীতে তাদেরকে থাইল্যান্ড সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কারণ হিসেবে একজন বলেন, “এখন বাড়ি ফিরলে সামরিক বাহিনী আমাদের ঠিকই খুঁজে বের করবে।”
তাদের পরিবারের সুরক্ষার স্বার্থে নাম-পরিচয় গোপন রেখেছে বিবিসি।

এই চার তরুণের মতো হাজারো মানুষকে সেনাবাহিনীতে জোর করে অন্তর্ভুক্ত করার এই নীতি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের জান্তার অবস্থান বদলে দিয়েছে। মিয়ানমারের অনেক অঞ্চলেই এখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পিছু হটছে বিদ্রোহীরা।
২০২১ সালে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে জান্তা বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে, যাতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দুই বছরেরও বেশি সময় আগে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী জোট দেশজুড়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক জয় লাভ করেছিল তারা। কিন্তু একসময়ের আক্রমণাত্মক অবস্থানে থাকা সেই প্রতিরোধযোদ্ধারা এখন দেশের বেশিরভাগ জায়গায় আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে।
জান্তা বাহিনী এখনও দেশের অর্ধেকেরও কম অংশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তারা উত্তরের মান্দালয় থেকে মায়িতকিনা পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্দখলসহ বেশ কিছু বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।
কাচিন, চিন এবং কারেন রাজ্যের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হাজার হাজার জান্তা সেনা এখন সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
পরিস্থিতি সরাসরি দেখতে জান্তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ১০ দিন অবস্থান করে বিবিসি সাংবাদিকদের দল। এই সময়ে বাগো ও কারেন রাজ্যে বিদ্রোহীদের ফ্রন্টলাইন এবং হাসপাতালগুলো ঘুরে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র তারা তুলে এনেছেন প্রতিবেদনে।
পিডিএফ-এর একটি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কো কাউং জানান, ২০২৪ সাল থেকে জান্তা সরকারের কার্যকর করা সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন কার্যকর করেছে। এ আইনে সেনাবাহিনীতে ন্যূনতম দুই বছর সেবা দেওয়া বাধ্যতামূলক। জোর করে নিয়োগ দেওয়া এই সেনারাই সবচেয়ে বেশি পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দলবল নিয়ে টহল দেওয়ার সময় কাউং বলেন, “বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের ফলে জান্তা বাহিনী এখন সীমাহীন জনবল পাচ্ছে, যা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“প্রযুক্তির দিক থেকে আমরা এগিয়ে থাকলেও আমাদের সম্পদ ও অর্থ খুবই সীমিত। তহবিলের অভাবে আমরা প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করতে পারছি না এবং জান্তার মতো সহজে নতুন সেনাও নিয়োগ দিতে পারছি না।”
দুই বছর আগে কো কাউং ও তার দল কারেন রাজ্যের হপাপুন শহর এবং একটি বড় সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। সেখানে চারদিকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। শহরের প্রবেশদ্বারের স্বাগত সাইনবোর্ড, স্কুল, স্থানীয় মঠ এবং পরিত্যক্ত ঘরবাড়িগুলো বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এখন কাউং আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন। বর্তমানে হপাপুন শহরের দিকে জান্তার প্রায় ২ হাজার সেনা অগ্রসর হচ্ছে এবং আকাশে জান্তা বাহিনীর ড্রোন উড়তে থাকায় নতুন করে বড় হামলার আশঙ্কায় দিন গুনছেন তারা।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিদ্রোহী বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি সশস্ত্র। পাহাড়ি শিবিরে ফিরে পিডিএফ কমান্ডার দা ওয়া-ও স্বীকার করেন যে, তাদের জন্য এখন জান্তার জোর কেরে নিয়োগ দেওয়া নতুন সেনারা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাড়ে চার বছর কারাগারে কাটানো সাবেক এই রাজনৈতিক কর্মী বলেন, জোর করে আনা এই সেনাদের যুদ্ধের ইচ্ছা না থাকলেও, যোদ্ধা হিসোবে তারা দক্ষ হয়ে উঠছে। কারণ তারা এখন নির্দেশ মেনে চলতে আরও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
টহলের সময় জান্তা ড্রোনের শব্দ শুনে জঙ্গলের ট্র্যাকে লুকিয়ে পড়তে হয় বিদ্রোহীদের। একটি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পর বিদ্রোহীরা ফিসফিস করে কথা বলছিলেন, কারণ পাশের পাহাড়েই জান্তার স্নাইপার ওঁত পেতে ছিল।
সেখানেই ছিল একটি ঘাঁটি। গত এপ্রিলে বিদ্রোহীরা ওই ঘাঁটিটি দখল করলেও জান্তার ভারি বিমান হামলা ও গোলার মুখে মাত্র দুই দিন পরই পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে দা ওয়া দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমরা এটি আবার ছিনিয়ে নেব।”
কিন্তু কো কাউংয়ের মতো দা ওয়াও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার আশপাশের সামরিক বাহিনী অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। প্রায় ৪০০ সেনা দা ওয়ায়ের দলের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে কেবল জান্তার বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগই একমাত্র সমস্যা নয়। জান্তা বাহিনীর কৌশলও বদলে গেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমার জান্তা সরকারের নিরাপত্তা চুক্তির পর তাদের বিমান শক্তিও অনেক বেড়েছে বলে জানান দা ওয়া। আগে যেখানে একটি যুদ্ধবিমান আসত, এখন একজোড়া বিমান একসঙ্গে হামলা চালাচ্ছে।
এছাড়া, ড্রোন প্রযুক্তি ও সংখ্যার দিক দিয়েও জান্তা এখন অনেক এগিয়ে। কো কাউং বলেন, “ড্রোনের বিপদ দিন দিন বাড়ছে। আমাদের কাছে জ্যামার ( সংকেত-বাধাদানকারী যন্ত্র) থাকলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হত। এখন সবকিছু নির্ভর করছে আমরা কতটা কার্যকরভাবে তাদের ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারছি তার ওপর।”
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চীনের ভূমিকা। মিয়ানমারে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। কারেন ও কাচিন রাজ্য থেকে চীন বিরল খনিজ আহরণ করছে। এজন্য চীন কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যস্থতা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করিয়েছে। প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহও সীমিত করেছে তারা।

কারেন রাজ্যের একটি জঙ্গলে অস্থায়ী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আহত প্লাটুন কমান্ডার কিয়ার সোয়ে জানান, অস্ত্র ও গোলাবারুদের তীব্র ঘাটতিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন, “এখনও সবাই লড়তে প্রস্তুত। কিন্তু অস্ত্র ও গোলাবারুদে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।”
সাম্প্রতিক এক সংঘর্ষের ভিডিও দেখাতে দেখাতে সোয়ে বলেন, সেখানে তাকে এক যোদ্ধাকে বলতে শোনা যায়, “গুলি বাঁচিয়ে ব্যবহার করো, ধীরে, ধীরে।”
মিয়ানমার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভূমিমাইন প্রবণ দেশ, যেখানে গত বছরই ভূমিমাইন বিস্ফোরণে ৭৪৫ জন হতাহত হয়েছেন। মাইন বিস্ফোরণে ডান পায়ের গোড়ালি হারানো কিয়ার সোয়ে বলেন, “সুস্থ হয়েই আমি আবার যুদ্ধে ফিরব। শেষ পর্যন্ত লড়াই করা ছাড়া আমাদের আর কোনও পথ নেই।”

বাঁশ ও কাঠের তৈরি এই ফিল্ড হাসপাতালটি চালান ডা. সাউং, যা সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ জেনারেটরে চলে। অর্থ ও জরুরি সরঞ্জামের তীব্র অভাব থাকার পরও সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা তরুণ বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।
একসময় সেনাবাহিনীতে ১৯ বছর কাটানো ডা. সাউং তরুণ বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তাদের বলেন, “আমরা আজ এই বিপ্লব করছি, কারণ আমাদের আগের প্রজন্ম এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি তরুণরা এখন একনায়কত্বের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, তাহলে একদিন তারা আমাদের মতো বয়স হলে এবং এই নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আবার অস্ত্র হাতে নিতে বা নতুন কোনোও প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য হবে।”
সাউং এর সাক্ষাৎকার নেওয়ার মাঝেই হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে মাটির মেঝের ওপর মাচা পেতে রাখা বিছানায় এক নারী যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন। ২৯ বছর বয়সী মে কিয়ুত মন প্রসব বেদনায় ছটফট করছিলেন এবং তার ২৪ বছর বয়সী স্বামী রেইন চিত পাশে দাঁড়িয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন।
নার্সদের সহায়তায় ডা. সাউং হাসিমুখে একটি কন্যাসন্তান প্রসব করান। দম্পতি তাদের মেয়ের নাম রেখেছেন 'সু পায়ে', যার অর্থ 'পূরণ হওয়া ইচ্ছা'।
ভবিষ্যতে মেয়ের জন্য কেমন মিয়ানমার চান, জানতে চাইলে রেইন চিত বলেন, “একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক মিয়ানমার।” জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রেইন চিত দম্পতির বাবা-মা থাকায় এখনই স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে তাদের কাছে যেতে পারছেন না তারা।
তিনি বলেন, “আমার গ্রামের মানুষ জেনে গেছে যে, আমি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। আমার কিছু প্রতিবেশী, যারা সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করে তারাও বিষয়টি জানে।”
তবে হাসিমুখে রেইন চিত বলেন, “বিপ্লব শেষ হয়ে যখন শান্তি ফিরবে, তখন আমরা আমাদের মেয়েকে নিয়ে দুই পরিবারের সঙ্গেই দেখা করতে যাব।”