Published : 13 Feb 2026, 02:00 AM
মরে যাওয়া তিস্তার বালুচর ঢেকে গিয়েছে তামাকের সবুজ পাতায়। যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিষাক্ত তামাকের ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য। মুগ্ধ না হয়ে থাকার উপায় নেই।চরের সবগ্রামই তামাকে আচ্ছাদিত। পানিশূন্য তিস্তার বুক চিরে জেগে ওঠা চরগুলোয় ভাঙাগড়ার সংসারে ফসল তোলায় ব্যস্ত ছিল কৃষকরা। আবহমান নদী বিধৌত গ্রামীণ কৃষক সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান ব্যস্ত তামাকপাতা উঠানো ও রোদে শুকানোর কাজে।
উন্নয়ন বঞ্চিত এই অঞ্চলের মেঠোপথের দু’ধার জুড়েই চোখে পড়ছিল লম্বা রশিতে রোদে শুকাতে দেওয়া তামাকের পাতা। দেখতে মনে হচ্ছিল মলিন ধূতিকাপড়ের সামিয়ানা। বিবর্ণ পাতায় লেখা সংসারের চাকা সচলের গল্প। তাদের জীবনের গল্পের কাছে উন্নয়ন ও সংস্কারের গল্প অচ্ছুৎ কিংবা অধরা স্বপ্নের মতোই। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তাদের বারবার আশাহত করে তুলেছে। একদিকে হঠাৎ বন্যা, অন্যদিকে অতিরিক্ত খড়া এবং নদী ভাঙনের যন্ত্রণা বুকে চেপে দিনপার করা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট’ নতুন কোনো চমক নিয়ে আসেনি। আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপি ও জামায়াতের তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ‘কথার কথা’ হিসেবেই আখ্যায়িত। দীর্ঘদিনের প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় স্মৃতি পূর্ণ মগজে বেঁধেছে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। চোখের ভাষায় বুঝে নিতে হচ্ছিল, কেউ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন আনবে–এমনটা বোধহয় আশা না করাই ভালো।
খেতে-খামারে খেটে খাওয়া যুবক ও প্রৌঢ়ের দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যাওয়া ধুলোবালিময় পথ পাড়ি দিয়ে আমরা যখন রংপুরের তিস্তা অববাহিকার গংগাচরা উপজেলার চরের গ্রামগুলো পার হচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল নির্বাচনি আমেজহীন ফসলিজগতে বিচরণ করছি। বসন্ত আসি আসি, স্নিগ্ধ রোদটাও কড়া লাগছিল রোদে ঝলসে যাওয়া গ্রামীণ শিশুদের খসখসে ত্বকের মতো। বেঁচে থাকার দৈনন্দিনকার সংগ্রামে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি, তা খুব করেই অনুধাবন করছিলাম।
একদিকে সংসারের বিস্তর ব্যয় আর অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যুগের ডিশ টিভি ও ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানির পাতানো জৈবিকতার কিছুটা ছাপ তাদের ওপর প্রভাব ফেললেও, স্বল্প আয়ের সুবিধা বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর কাছে সংস্কারের অঙ্গীকারটুকু ঠিকঠাক পৌঁছায়নি কিংবা তা আমরা টের পাচ্ছিলাম না। গড্ডালিকায় প্রভাবিত রাজনৈতিক চেতনা অথবা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবিশ্বাস বা তথাকথিত রাজনীতিকদের ভাঁওতাবাজি কিংবা কথার ফুলঝুরি মেলায় ফুলানো রঙিন বেলুনের মতো এবার আর আকর্ষণ ধরায়নি। হাফ ছেড়ে বাঁচার তাগিদে ‘যায়ে আসুক, মুই ভালো থাকপার চাঁও’ বুলিতে দীর্ঘ দাড়ি বসিয়ে দিয়েছে তারা। আশাহীনের মতো নিথর আগ্রহ অধিকাংশকেই ভোটমুখী করতে পারেনি, বললে অসত্য দাবি করা হবে না।
গ্রামের পর গ্রাম ও গ্রামীণ ছোট ছোট বাজার পেরুতে পেরুতে নির্বাচনি প্রচারণার বদলে যাওয়া চিত্র খুঁজছিলাম আমরা। প্রচার প্রচারণার ধরন পরিবর্তনে প্রার্থীদের পোস্টার চোখে পড়েনি সেভাবে। কাপড়ের ব্যানারের ছড়াছড়িও ছিল না কোথাও। এর মধ্য দিয়েই যতটুকু নির্বাচনি হাওয়া তাদের গায়ে লেগেছে, তার সিংহভাগটাই ধর্মীয় রাজনীতির বয়ান। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদের মত ‘বেহশত পাওয়া’ যায় প্রচারণায় কেউ কেউ ধর্মীয় রাষ্ট্রচিন্তায় ডুবেছে, তামাকের গন্ধের সঙ্গে সেই আভাসটুকু পাওয়া যাচ্ছিল তরুণদের শোরগোলে, নারীদের চলনে ও ভোটের লাইনে।

ভোটের পর্যবেক্ষক হিসেবে গন্তব্যে পৌঁছবার পর থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল সমানে সমান। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা ঘুরছিলাম নদী ভাঙনের শিকার তিস্তাপাড়ের ভোট কেন্দ্রগুলোতে। সব কেন্দ্রই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায়। সিংহভাগই অনুন্নত অবকাঠামো ও ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সিসি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত থাকায় স্বস্তি পাচ্ছিলাম কিছুটা। কয়েকটি কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের বডি ওন ক্যামেরাও আলাদা দৃষ্টি কেড়েছে আমাদের। শুধু দৃষ্টির অগোচরে ছিল কাঙ্ক্ষিত ভোটারের উপস্থিতি।
তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় কিছুটা নেটওয়ার্কে অগ্রসর দুর্গম এসব জনপদেও নির্বিঘ্নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন সংবাদপত্রগুলোয় বারবার চোখ বুলাতে পাচ্ছিলাম। নিউজ ফিডে ভেসে আসা দেশের নানা প্রান্তের নির্বাচনি সহিংসতা আমাদের উদ্বেগকেও বাড়িয়ে তুলছিল। নবাগত আগন্তুক ‘পর্যবেক্ষক’কেই পর্যবেক্ষণ করছিল ‘ভিলেজ পলিটিক্সের’ চতুর চোখগুলো। সন্দেহ ও অতি উৎসাহ আমাদের ঘাবড়ে তুলছিল বারবার। এর মাঝে ভোটকেন্দ্রে নিযুক্ত নির্বাচন কর্মকর্তাদের অনাগ্রহ কিংবা অবহেলা আমাদের খানিকটা অসহায়ও করে তুলেছে কোথাও কোথাও। বিভ্রান্তিকর তথ্য, তথ্য প্রদানে অসহযোগিতমূলক আচরণ উপেক্ষা করেই আমরা ভোটের আমেজ খুঁজে ফিরছিলাম। খুঁজছিলাম হারিয়ে যাওয়া ভোটের উৎসব। খুঁজে পাওয়া দুরূহই বটে। দিনশেষে মনে হলো, অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমাদের থেকে দূরে সরে রইল। বরাবরের মতোই ভোটের মাঠে তবুও সংঘাত, সংঘর্ষ পিছু ছাড়েনি, শুধু পিছু হটেছে ভোটারের দীর্ঘসারি।
কোথাও কোথাও উত্তেজনা, আবার কোথাও নিরুত্তাপ পরিবেশে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চিত ঘটনার আশঙ্কায় ভরা ছিল নির্বাচন। অদৃশ্য ভয়ে জেঁকে বসা ভোটাদানের উৎসবচিত্র ছিল দূর পরবাসী। কাঙ্ক্ষিত আমেজ চোখে পড়েনি নদীপাড়ের কেন্দ্রগুলোতে। দীর্ঘদিনের জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এসব অঞ্চলে লাঙ্গলে জোয়ার মেলেনি। উপযুক্ত প্রার্থীও ছিল না তাদের। আওয়ামী লীগ নিশ্চুপ ভূমিকায় থাকা সত্ত্বেও বিএনপি বাগে আনতে পারেনি উত্তরের ভোটের মাঠ। হরকা বন্যা এবং হঠাৎ ভারতের ছেড়ে দেওয়া পানিতে ডোবা ফসলের মতোই ডুবেছে ধানের শীষ। ভোটার টানতে পারেনি তারা। বরং ধর্মের ধ্বজা তুলে ভোটের পাল্লা ভারী করেছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী। ভোটার শূন্য মাঠেও অদৃশ্য কারিশমায় নির্বাচনি মাঠে তাদের পক্ষে জোয়ার এনেছে নারী ভোটাররা। আত্মবিস্মৃত কিংবা ইতিহাস বিমুখ জাতি হয়তো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বয়ান থেকে! তরুণ প্রজন্ম ভুলতে বসেছে নাকি ধর্ম ও জিরাফের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে সবটাই আমার চাই তত্ত্বে বেড়ে উঠছে, বোধগম্য নয়।
কার্যক্রম স্থগিতাদেশ থাকা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিততিতে উত্তরবঙ্গে লাঙ্গল ও বিএনপির দিক থেকে সিংহভাগ ভোটার মুখ ফিরিয়েছে। সাধারণের অনেকেই ভোটের মাঠে নীরবে যোগ দিয়েছে জামায়াতে। লাঙ্গল ও নৌকার কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছে বিএনপিতে, তবুও বিএনপি আশানুরূপ সাড়া জাগতে পারেনি এই অঞ্চলে। গংগাচরা উপজেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এবার দেওয়া হয়নি। আমাদের দেখা তিস্তা চরাঞ্চলের ভোট কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিশেষত পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খানিকটা। যেসব অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে এমন ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নানা শঙ্কা ও রাজনৈতিক হিসেব মেলাতে তারা ভোট কেন্দ্রে এসেছিল। তাদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার চাপ ছিল সুস্পষ্ট। হিন্দু তরুণদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাও টের পাওয়া যাচ্ছিল, নদী ভাঙনে হঠাৎ উচ্ছেদ হওয়া গেরস্তের মতোই। একদিকে বিএনপি অপরদিকে জামায়াত এই দুই রাজনৈতিক শক্তির একটিকে বেছে নিয়ে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা তাদের জন্য খুবই কঠিন ছিল বলে ধারণা।

তিস্তা নদীর একদম তীরঘেঁষা চিলাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটার শূন্য মাঠ থেকে চোখ ফিরিয়ে বিস্তীর্ণ বালুময় নদীর দিকে দৃষ্টিতে ফেলতেই মনে হলো, নদীর মতোই বদ্বীপের মনুষ্য জীবন। কখন কোন দিকে কি কারণে বাঁক বদলে ছোটাছুটি শুরু করবে, তা আগাম নির্ণয় করা অসম্ভব। জোয়ার-ভাটার ভিন্ন দুই চিত্রের মতোই বদলে যাওয়া ভোটের জমিন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কোন দিকে নিচ্ছে, তার খানিকটা আভাস মিললেও আশাহত হতে ইচ্ছে করে না। বাঙালিয়ানায় বেড়ে ওঠা কৃষিজভূমিপুত্ররা তালেবানি কোনো গন্তব্যে ছুটবে ভাবা যায় না। ভাবা যায় না কৃষিতে প্রাণ সঞ্চার করা ‘নারী’ জীবন সংসারের ঘানি টানতে টানতে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হতে চাইবে। হিসেবে বে-হিসেব মেলাবার ফুসরৎ না হতেই চোখ ফেলি বাকি ভোটকেন্দ্রগুলোতে। একই দৃশ্য । বেশ কয়েক জায়গায় দেখলাম, যে কজন ভোট দিতে যাচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে হিন্দু নারী ও তরুণদের সংখ্যা বেশি। বেশ কয়েকজন হিন্দু নারী ভোটারের ভাষ্য মতে বুঝে নিলাম, তারা তাদের পরিবারের ভোট ভাগ করে দিয়েছেন। ভোটদানে তাদের উচ্ছ্বাস ঠিক কতটুকু ছিল, তা আমার অপরিপক্ক লেন্সে ধারণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
নির্বাচন এলে সবচেয়ে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনায় থাকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে তাদের কিছুটা উপস্থিতি লক্ষ্য করলাম, কেন জানি পর্যাপ্ত মনে হলো না! তাদের ঝিম ধরা কচ্ছপের মতোও মনে হয়েছে কখনো-সখনো। ভিন্ন চিত্রও ছিল দু এক জায়গায়। উভয় পক্ষের মাঝে উত্তেজনাও দেখা গিয়েছে মাঝেমধ্যে। কিন্তু সেটাও ভোটের আমেজ তৈরি করার মত ছিল না। চিরায়ত ভোট বলতে যা বোঝায় এবারের নির্বাচনেও তা লক্ষ্য করা যায়নি। শুধুমাত্র নগর জীবনের কিছুটা ছোঁয়া পাওয়া বাজার এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোয় লোকসমাগম কিছুটা চোখে পড়েছে। তবে সেটা উৎসব আমেজকে ইঙ্গিত করে না। এর মাঝে ভুটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ সাময়িক স্থগিত হতে দেখেছি। প্রথমে বিতর্ক শুরু বিএনপর এজেন্টকে নিয়ে। পরে প্রিসাইডিং অফিসারকে কেন্দ্র করে আপত্তি তুলেছে দুই পক্ষই। বেদগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে বিএনপি কর্তৃক ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিএনপি নেতা গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ উঠলেও সঠিক তথ্য পাইনি। তথ্য পাওয়া যায়নি জামায়াত-বিএনপির টাকার ব্যাগগুলো ভোট কিনতে কোথায় কাকে কত টাকা দিল তা নিয়েও।
বেশ কিছু কেন্দ্রে থমথমে পরিস্থিতি কাটিয়ে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোটারের আনাগোনা আর হয়নি। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতে নির্বাচনি পরিবেশ আরও ভাটা পড়ছিল। আমরাও উদ্বিগ্ন হচ্ছিলাম শূন্য মাঠের মতো অসীম আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে শা শা করে যাচ্ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদ্য কেনা তুর্কি ড্রোন । আমাদের দৃষ্টি ফাঁকি দেওয়া নির্বাচনের কোনো কারচুপির ফুটেজ তার কাছে পাওয়া যাবে কিনা, তা অবান্তর জেনেও ভাবছিলাম বারংবার।
আমাদের দেখা সিংহভাগ ভোটকেন্দ্রেই দুপুরের পর বিচ্ছিন্ন কিছু ভোটারের উপস্থিতি ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারের দেখা মেলেনি । বিশেষত বেলা একটার পর থেকেই অনেক কেন্দ্র ভোটার শূন্য হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আমরা যে ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করছিলাম, সেটিও তিস্তার চরের। তবে এখানকার মানুষের শহুরে ডুপ্লেক্স বাসাগুলোর মতো বাড়িসমূহ বলে দিচ্ছিল তারা বেশ বিত্তশালী। গ্রাম ঘুরে বুঝলাম তামাক ও চরের ফসলের টাকায় তারা বিত্তবান হলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ধনী হয়ে উঠতে এখনও সক্ষম হয়নি। এখানে ঝুঁকি রয়েছে, তাও আঁচ করছিলাম আমরা। কুড়িবিশ্ব্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষক হিসেবে আমাদের বেশ খানিকটা হয়রানির শিকার হতে হলো। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার যথাযথ সাড়া না দেওয়া এবং বিএনপি সমর্থকদের জেরা এবং ভুয়া পর্যবেক্ষক বলে অভিযোগ আমাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠল। পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সাংবাদিকের সহযোগিতায় পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলেও সরাসরি আমরা তথ্য সহযোগিতা পেলাম না। বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এই কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত জামায়াত বেশি ভোট পেয়েছে বলে ফল ঘোষণা হলো যখন, তখন সন্ধ্যা। আবছা আলো অন্ধকারে ভোটার উপস্থিতির দৃশ্য এবং ভোট কাস্টিংয়ের হিসেবে পরীক্ষার খাতায় না মেলা বীজ গণিতের সূত্রের মতো শাখাপ্রশাখা বাড়াতে লাগল। অদূরের এক ভোটকেন্দ্রের গণ্ডগোলে সহ-পর্যবেক্ষকদের আটকা পড়ার দুঃসংবাদে উৎকণ্ঠিত আমরা সুবোধ বালকের মতো ঘরের উদ্দেশ্য রওনা হলাম। আমাদের পেছনে কিংবা সম্মুখে তাড়া করে আসতে শুরু করল ভিন্ন কোনো বাংলাদেশ অথবা যেমন বাংলাদেশটা জুলাইয়ে আমরা চেয়েছিলাম! যা এখনও আমরা ঠিক করে জানি না!