Published : 11 Dec 2025, 09:46 AM
হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে তার বড় ছেলে তারেক রহমানের দেশে আসার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তার ভেতরে সম্প্রতি লন্ডন থেকে এসেছেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান। তাই বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি এই নারীকে ঘিরে আবর্তিত হতে পারে—এমন সমীকরণও অনেকে মেলাচ্ছেন। অনেকে স্পষ্ট করেই জানতে চাইছেন, বিএনপির নতুন কাণ্ডারি কি জুবাইদা রহমান?
সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কিছুটা বলা দরকার। ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার ব্যক্তিগত চকিৎসক ও বিএনপির সিনিয়র নেতা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে বিদেশ নিতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে মেডিকেল বোর্ড দূরে ভ্রমণের জন্য (১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা আকাশপথে জার্নি) খালেদা জিয়ার শরীর উপযুক্ত মনে করলে তাকে বিদেশে নেওয়া হবে। এরপর ৮ ডিসেম্বর সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিতে ভাড়া করা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি আসছে না। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স অপারেটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার সকালে তাদের ঢাকায় নামার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু এয়ার অ্যাম্বুলেন্স অপারেটর সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে মঙ্গলবারের ওই স্লট বাতিল করার আবেদন করেছে বলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো পেছাল খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা। (সমকাল, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫)।
উল্লেখ্য, গত ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে রয়েছেন খালেদা জিয়া। তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত আছে। কিন্তু তার নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা ওঠানামা করছে। এর কিছু কিছু কখনো নিয়ন্ত্রিত, আবার হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কিডনির সমস্যার কারণে খালেদা জিয়ার শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল, সেটি বেড়েছে। কিডনির কার্যকারিতা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ফুসফুসেরও উন্নতি আছে। তিনি এখনো আশঙ্কা মুক্ত নন।
তবে খালেদা জিয়া ক্লিনিক্যালি ডেড বা তিনি আরও দিন কয়েক আগেই মারা গেছেন—সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কিছু খবর ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোকে ‘গুজব’ উল্লেখ করে তাতে কান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি সবাইকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, দেশনেত্রীর প্রতি আপনাদের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ আপনারা দয়া করে যে ফ্যাক্ট, সেটার বাইরে গুজব ছড়িয়ে কাউকে বিভ্রান্ত করবেন না।’
এটা ঠিক যে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এইসব গুজব ও বিভ্রান্তি ছাড়িয়ে গেছে তারেক রহমানের দেশে আসা না আসা বা আসতে না পারায়। বিশেষ করে সম্প্রতি তার নিজের একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস এই বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে। নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন: ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’
তারেক রহমান কী শর্তে লন্ডনে আছেন এবং দেশে আসতে গেলে তাকে কী কী শর্ত মানতে হবে—সেগুলো অত্যন্ত গোপনীয়। সুতরাং, তিনি চাইলেই যে দেশে আসতে পারবেন, বিষয়টা এত সহজ নয়। আর সে কারণেই তিনি লিখেছেন, এটা তার একার ওপর নির্ভর করছে না।
কিন্তু তার দেশে ফেরা না ফেরার এই দোলাচলে বিএনপির রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই লিখেছেন, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও মায়ের এমন সংকটকালে তারেক রহমানের দেশে না আসাটা রাজনৈতিকভাবে তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আবার তিনি না আসায় বা আসতে না পারায় যে তার ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে, প্রতিপক্ষ দলগুলোর নানাবিধ তির্যক মন্তব্য জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিএনপির রাজনীতি ও নির্বাচনি মাঠ কঠিন হচ্ছে—সেই হিসাব ও বিবেচনাটি তারেক রহমানের না থাকবার কোনো কারণ নেই। রাজনীতির এই অঙ্কটি তিনি যে বুঝতে পারছেন না, তা নয়। সুতরাং, তিনি কেন আসছেন না, আসতে পারছেন না বা তার আসায় কেন বিলম্ব হচ্ছে—তার সব উত্তর আমরা জানি না। অনেক প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না।
রাজনৈতিক জটিলতা শুধু একটি দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। তার ডালপালা থাকে অনেক। ফলে একজন সাধারণ মানুষ বা কোনো একটি ছোট দলের নেতা যেকোনো বিষয়ে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, বিএনপির মতো একটি দলের শীর্ষ নেতা—যিনি প্রায় দেড় যুগ ধরে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন, তার পক্ষে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্যিই কঠিন, যেখানে অনেক শর্তের বাইরেও তার জীবনের ঝুঁকির প্রশ্নটিও জড়িত। ফলে তারেক রহমান যদি আপাতত দেশে ফিরতে না পারেন তাহলে বিএনপির রাজনীতি কি জিয়া পরিবার থেকে ফসকে যাবে?
বাংলাদেশে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির যে ধারা, সেই ধারাবাহিকতায় একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতার আসনে বসেছেন খালেদা জিয়া। সুতরাং, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পরে বিএনপির রাজনীতিতে জুবাইদা রহমান প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, জুবাইদা রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কি না সেটি তার বিষয়। তবে জিয়া পরিবার যত বেশি সম্পৃক্ত থাকবে, বিএনপি ততই লাভবান হবে।’
বাংলাদেশে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির যে ধারা, তাতে তারেক রহমান দেশে ফিরতে না পারলে এবং জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন—এটি একটি জটিল প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিতে পারে। অনেকে মনে করেন, এই প্রশ্নের সহজ সমাধান সম্ভবত জুবাইদা রহমান। তখন তারেক রহমান দলীয় প্রধান হিসেবেই থাকবেন। একই ব্যক্তির দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে জুলাই সনদেও। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে চূড়ান্ত ডকুমেন্টটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে, তার ১৫ ধারায় বলা হয়েছে: ‘সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না।’
যদি পরবর্তী সংসদ সংবিধান সংশোধন করে এই বিধানটি যুক্ত করে তাহলে তারেক রহমানের পক্ষে একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে থাকা সম্ভব হবে না। আর তারেক রহমান যদি সত্যিই দেশে ফিরতে না পারেন তখন তিনি কি বিদেশে বসেই দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন আর জুবাইদা হবেন প্রধানমন্ত্রী?
দলীয় প্রধান হওয়ার জন্য দেশে থাকাটা জরুরি নয়। অনেক বছর ধরেই লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করছেন তারেক রহমান। সুতরাং তিনি দেশে না এলে বা আসতে না পারলে বিএনপির রাজনীতি অনিশ্চিত বা সমস্যায় পড়ে যাবে—এমন ভাববার কোনো কারণ নেই।
জুবাইদার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনাটি আগামী নির্বাচনের পরে না ঘটলেও দূর ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে তিনি যে সক্রিয় হবেন এবং একসময় তিনি যে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন—সেই ধারণাটি অনেকে করলেও এখানে আরও অনেক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। পারিবারিক রাজনীতির লিগ্যাসির বাইরেও এখানে আরও অনেক যদি-কিন্তুর সুযোগ রয়েছে।
গত জুন মাসে তিনি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়েছে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, ডা. জুবাইদা রহমান ভোটার হয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসার ঠিকানায়। যদিও তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন গুলশান-২ নম্বরের ঠিকানায়।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন প্রথমবারের মতো ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান লন্ডনে ছিলেন। এরপর তারা আর দেশে আসেননি বা আসতে পারেননি। ফলে ভোটারও হতে পারেননি।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় তারেক রহমানের নামও নেই। এ অবস্থাতেই গত ৩ নভেম্বর তাকে বগুড়া ৬ আসন থেকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছিল যে, তিনি দেশে আসার পরেই ভোটার হবেন। অবশ্য প্রার্থী ঘোষণার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ভোটার হওয়ার আইনগত বাধা নেই। কারণ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলে সময়ই ভোটার নম্বর উল্লেখ করতে হয়। অর্থাৎ মনোনয়পত্র দাখিলের আগে যেকোনো সময় ভোটার হওয়ার সুযোগ থাকবে। অন্য কোনো প্রার্থী বা সাধারণ নাগরিকের চেয়ে তারেক রহমান এই মুহূর্তে বিশেষ সুবিধা পাবেন—তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু রাজনীতি ও ভোটের মাঠের এই সব সমীকরণই ছাপিয়ে যাচ্ছে তারেক রহমানের দেশে ফেরা না ফেরা বা ফিরতে না পারার ইস্যুটি। সত্যিই তিনি কী কারণে আসছেন না, আসতে পারছেন না বা কবে আসবেন—তা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনার চেয়ে গুঞ্জনই বেশি।