Published : 01 Sep 2025, 02:22 PM
নির্বাচন কমিশন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথরেখা ঘোষণা করলেও দিনতারিখ এখনো স্পষ্ট করে বলেনি। যদিও ষাট দিন আগে তফসিল ঘোষণার কথা আছে পথরেখায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তরিক বৈঠকের পর আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচনের কথা শোনা গেছে, আকারে ইঙ্গিতে সেটাকেই প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হচ্ছে। তাহলে ধরা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ একটি সংসদ নির্বাচন পেতে যাচ্ছে।
এই নির্বাচন বহু আকাঙ্ক্ষিত। কেননা, শেখ হাসিনার শাসনামল সবার অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সংস্কৃতি থেকে যোজন যোজন দূরে রেখেছিল ভোটারদের। মানুষের প্রত্যাশা আগামী সংসদ নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, ভোটারদের অংশগ্রহণে মুখর।
যে কোন নির্বাচনের কয়েকটি অংশ থাকে– ক) নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল খ) ভোটার গ) আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ঘ) মিডিয়া ঙ) নির্বাচন কমিশন চ) নির্বাচনকালীন সরকার। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে এই পক্ষসমূহের মধ্যে সমন্বয়-স্বস্তি-সৌহার্দ্য-সক্রিয়তা দরকার।
বিশেষত নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি নির্বাচন নিয়ে স্বস্তিকর সুসম্পর্ক না থাকে তবে সেই নির্বাচন জটিল, কঠিন, সহিংস, উত্তেজনাময় এবং বিপন্ন হতে পারে।
ভোটারদের অংশগ্রহণ যে কোন নির্বাচনের মূল অংশ। নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ যদি অনুকূল না হয়, ভয়ভীতির পরিবেশ থাকে, জীবনের আশঙ্কা থাকে, নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তি থাকে–তবে হাজার চেষ্টা করেও ভোটারদের বিপুলভাবে ভোটের মাঠে আনা যায় না। তখন ভোটারদের অনুপস্থিতিতেই দিনের ভোট রাতে অথবা একের ভোট অন্যে দিয়ে দেবার হুজ্জতি চলতে পারে অবলীলায়।
নির্বাচনের স্কেলিটন বা কাঠামোগত অবয়ব নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পারফর্মেন্সের ওপর। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যদি আত্মবিশ্বাসহীন, কমান্ডহীন, রাজনৈতিকপক্ষপাতদুষ্ট হয়, জনমনে তারা যদি নির্ভরতা ও নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি তৈরি করতে না পারে, তবে ভোটাররা তো বটেই ভোট পরিচালনাকারী সকল পক্ষই নির্বাচন নিয়ে আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়ে। সুষ্ঠু ভোটের সকল সম্ভাবনাই মাঠে মারা যায়।
নির্বাচনে মিডিয়ার ভূমিকাও বিপুল। আমাদের এখানে মিডিয়া যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পায়নি, পেশাদারিত্বও গড়ে ওঠেনি, ফলে নির্বাচনে মিডিয়া ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করতে কতটা সফল হয়, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আবার হাল-আমলে নিয়ন্ত্রহীন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কমিশন হচ্ছে নির্বাচনের মূখ্য আধিকারিক প্রতিষ্ঠান। আইন, সক্ষমতা নিয়ে আমাদের এখানে নির্বাচন কমিশন চিরকাল, নির্বাচনকালীন সরকারের মুখের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার থাকলে অতীতে নির্বাচন কমিশন তার ইচ্ছেকেই বাস্তবায়ন করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তার ব্যত্যয় হয়নি। নিজস্ব সক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে এখানে নির্বাচন কমিশন কোনকালেই নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
নির্বাচনকালীন সরকারই আসলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মুখ্য ঘটনা। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী-রাজনৈতিক দল-নির্বাচন কমিশন-মিডিয়াসহ অপরাপর রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কতটা প্রভাব রাখতে পারে নির্বাচনকালীন সরকার তার ওপর নির্ভর করছে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা।
০২.
এখন দেখা যাক নির্বাচন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাস্তব অবস্থা কি? আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কি ভাবছে?
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সর্বশেষ মিটিং শেষে বলেছেন, “একটি শক্তি নির্বাচনকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। তবে নির্বাচন পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের তারিখ হিসেবে যেটা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেই তারিখেই নির্বাচন হবে।”
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সর্বশেষ মিটিং সেরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বললেন, “চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে এত বড় নির্বাচন (জাতীয় সংসদ) পরিচালনা করবে, তা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। দেশ একটি নীলনকশার নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারের লন্ডনে একটি দলের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিল, যা একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এতে সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং একটি দলকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের বৈঠক শেষে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম বলেছেন, “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং সাংবিধানিক ভিত্তির জন্য আগামী যে নির্বাচনটি হবে, সে নির্বাচনটি যেন অবশ্যই গণপরিষদ নির্বাচন হয়।”
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন নিয়ে এখন দৃ্শ্যমান তিন রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির কথার সুরে মিলের চাইতে অমিলই বেশি। বিএনপি জাতীয় সনদ নিয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আস্থাশীল নয়। পিআর পদ্ধতি নিয়েও তারা অপরাপর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একমত নন। জামায়াত নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত, কেননা নির্বাচনবিষয়ক তার ভাবনাও বিএনপির বিপরীত। এনসিপি চায় আগামী নির্বাচন হোক গণপরিষদ নির্বাচন। এনসিপির এই ভাবনা সংবিধানের পরিবর্তনে যেরকম র্যাডিক্যাল, বিএনপি তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি পাদপ্রদীপের আলোতে থাকা তিন রাজনৈতিক দল অনৈক্যের সুরেই গান গাইছে।
ফ্যাসিবাদের চাদর পরা বিতাড়িত আওয়ামী লীগ ব্যস্ত পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার বাসনায়, ফিরে আসার আগ্রাসী কৌশলে সে মগ্ন। আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে সে আশা দুরাশা। তবে, আওয়ামী ভোটব্যাংককে অনুকূলে আনার চেষ্টাও আমাদের সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভক্ত ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। জাতীয় পার্টিও আছে নানা চাপে। ফ্যাসিবাদের দোসর নামাবলি নিয়ে রাজনীতির মাঠে তারা কতটা সক্রিয় হবে সেটা একটা বিবেচ্য বিষয়। তাদের ভোটব্যাংক আওয়ামী পুনর্বাসনে ব্যবহৃত হবে না ছিন্নভিন্ন হবে সেটাও দেখার বিষয়। মোদ্দা কথা রাজনৈতিক দলগুলোর এখন যে অবস্থা সেটা সহমত–ঐক্যমতের বদলে বহুমত-বহুবিরোধের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব।
কাজেই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সভায় বড় বড় অফিসারদের নিয়ে যখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেই ফেলেন, “জাতীয় নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ও নিরাপদ হবে, তা নির্ভর করে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর”–সেটাও ভিন্ন চিন্তার উদ্রেক করে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাওয়া মাঠে থাকা সেনাবাহিনীর যে পারফর্মেন্স সেটা হতাশাজনক। সরকারি হিসাবই বলছে, এই অন্তর্ববর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১২৩ সংগঠন ১৬০৪ বার সড়ক অবরোধ করেছে। শুধু তাই নয় গনঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরের ওপর আক্রমণ, শাহবাগে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হামলা, জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনা প্রমাণ করেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সকল মাত্রা অতিক্রম করেছে।
এরকম অসহিষ্ণু-বিশৃঙ্খল-অনৈক্যের পরিবেশেও যখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম মিডিয়াকে বলেন, “ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সকল রাজনৈতিক দলকে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে আবারও তার প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নাই। কেউ যদি নির্বাচনের কোনো বিকল্প নিয়ে ভাবে, সেটা হবে এই জাতির জন্য গভীর বিপজ্জনক।”
এই ‘বিপজ্জনক’ আসলে কোন বিপদের ইঙ্গিত দেয় সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।
০৩.
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই গণতান্ত্রিক উত্তরণে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সকল রাষ্ট্রনৈতিক বিপন্নতাই তৈরি হয়েছে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের সঠিক ম্যাকানিজম তৈরি করতে না পারার কারণেই। ভালো নির্বাচন করার ব্যর্থতাই রাষ্ট্রকে ঠেলে দিয়েছে বিপুলতর বিপন্নতার দিকে।
বলাবাহুল্য বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সংকটময় সময়ে অবস্থান করছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বিরাজ করছে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। আমাদের অর্থনীতিও নানা দোলাচলে ঘুরছে। এখন দরকার রাষ্ট্রে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একমাত্র রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে টেকসই করার পথ খুলে দিতে পারে। অন্যথায় অর্থনীতিকেও মোকাবিলা করতে হবে বহুমুখীন সংকট ও অনিশ্চয়তাকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জুলাইয়ের ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান নতুন প্রজন্মের সামনে যে গণহত্যার স্মৃতি ও রাষ্ট্রনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে সেটাও বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যাসিবাদের বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কার না হলে এই নতুন প্রজন্ম নতুনভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে, সে আশঙ্কাও আছে। আমাদের ভোটের সংখ্যাতত্ত্বেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি সম্পূর্ণ নতুন ভোটার, যারা কখনই ভোট দেয়নি, দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই অচেনা নতুন ভোটারদের মনোভাবও আমাদের রাজনীতিতে অজানা।
০৪.
যদিও আমাদের সবার চোখ এখন নির্বাচনের দিকে, তবে ভোটের পথে যে ফুল বিছানো নেই সেটাও বুঝতে পারছি। আমরা চাই একটা সুষ্ঠু, অবাধ, নিরাপদ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য-উৎসবমুখর নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষগুলো-রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, মিডিয়া যদি জনমনে আস্থা অর্জন করতে না পারে, তবে নির্বাচন কি উৎসবমুখর হতে পারবে?
আমাদের বাস্তব আকাঙ্ক্ষা একটা উৎসবমুখর নির্বাচন। কিন্তু বর্তমানের বৈরিতা, অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তাবোধ আমাদের সেই বাস্তবতাবোধকে বিপন্ন করে তুলছে।
সকল পক্ষ সাবধান না হলে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে নিজেদের স্বার্থের উর্ধ্বে তুলে ধরতে না পারলে উৎসবমুখর নির্বাচনের স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেবে সেটাই ভাবনার বিষয়।