Published : 20 Apr 2026, 08:45 AM
দেড় মাস ধরে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর যে মিছিল তৈরি হয়েছে, তা যেন ক্রমশ এক নির্মম পরিসংখ্যানে পরিণত হচ্ছে—৩৪, ১৭২, ২০৬। মৃত্যুর আসল সংখ্যা নিয়ে লুকোচাপা করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংখ্যা যাই হোক, সংখ্যাগুলো বাড়ছে, আর আমরা যেন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। অথচ মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান হতে পারে না। একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একজন মায়ের বুকফাটা কান্না, একটি ভবিষ্যতের অকাল সমাপ্তি।
হামের থাবায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নাকি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা? বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশক ধরে টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সাফল্য ও গর্বের গল্প লিখেছিল। একসময় যেখানে মাত্র ২ শতাংশ শিশু পূর্ণ টিকা পেত, সেখানে সেই হার ৯০ শতাংশের ওপরে তোলা হয়েছিল। এই সাফল্য কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি লাখ লাখ শিশুর বেঁচে থাকার গল্প। অথচ আজ, সেই দেশেই হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ, মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। খুব সঙ্গত প্রশ্ন: কেন এমন হলো? কীভাবে আমরা এখানে এসে দাঁড়ালাম?
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ১৭২, মোট ২০৬। আরও উদ্বেগজনক হলো, ‘সন্দেহজনক’ আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ৩৫২, যেখানে নিশ্চিত রোগী মাত্র ৩ হাজার ৬৫ জন। এই ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি আসলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতার ছবি। আমরা জানি না তারা ঠিক কীসে মারা গেছে, কারণ আমরা জানার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, সক্ষমতাও ছিল না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়ার কারণেই এই পার্থক্য। অর্থের অভাবে নমুনা সংগ্রহে ঘাটতি ছিল, এমনকি প্রথমদিকে তা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অর্থাৎ, আমরা জানতেই পারিনি কতজন আক্রান্ত, কতজন মারা যাচ্ছে, একটি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। যখন রোগ শনাক্তই করা যায় না, তখন নিয়ন্ত্রণের কথাই বা আসে কোথা থেকে?
এখানেই প্রথম প্রশ্ন: একটি সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরও কেন পরীক্ষার সক্ষমতা তৈরি করা গেল না? কেন প্রথম থেকেই পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি? কেন অর্থের অভাবে একটি মৌলিক জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম প্রায় থমকে গেল?
পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি এবং ২১ শতাংশ পেয়েছে মাত্র একটি ডোজ। অর্থাৎ, প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ টিকাবঞ্চিত বা অসম্পূর্ণ সুরক্ষায় ছিল। এই তথ্য আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরে: এই মৃত্যুগুলো অনিবার্য ছিল না। এগুলো প্রতিরোধ করা যেত—যদি টিকাদান কর্মসূচি সচল থাকত, যদি স্বাস্থ্যকর্মীরা মাঠে থাকতেন, যদি ভ্যাকসিন সময়মতো পৌঁছাত। এটা স্পষ্টতই গাফিলতিজনিত শিশুহত্যা!
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, অপারেশনাল প্ল্যান বাতিল হওয়ায় তহবিল সংকট তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত, যা কাগজে-কলমে গ্রহণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের অপিরনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই যে দেশের শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, এই কথাটা স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না কেন?
ওদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভ্রান্তিকর কথা বলেছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘বিগত দুই সরকারের গাফিলতিতে হাম ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু শিশুর মৃত্যু হয়। সময়মতো হামের টিকা না দিয়ে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে দুই সরকারই।’ তারেক রহমান টিকাদান কর্মসূচিতে গত ‘দুই সরকারের’ ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে হামের টিকা প্রদানের হার ছিল ৮৭ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে—২০২৪ সালেও এই হার ছিল ৮৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন টিকা কেনা বন্ধ করে দেয়। ফলে মজুত টিকা দিয়ে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আর যেসব শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এই সত্যটি অস্বীকার করে রাজনৈতিক স্বার্থে ইউনূস সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের ঘাড়েও দায় চাপানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ সত্যের অপলাপ মাত্র। সত্য স্পষ্টভাবে না বলে রাজনৈতিকভাবে দায় এদিক-ওদিক চাপানোর চেষ্টার ফলে প্রকৃত দোষীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, সরকার এখনো বিষয়টিকে সেই মাত্রায় গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশে হামের সংক্রমণ এখন স্পষ্টতই মহামারী (এপিডেমিক) পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সরকার একে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘প্রাদুর্ভাব’ (আউটব্রেক) বলে হালকা করে দেখাচ্ছে। অথচ সংজ্ঞানুযায়ী, মহামারী হলো এমন একটি রোগ যা অতি অল্প সময়ে বৃহৎ এলাকাজুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে হাম আর কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা জেলায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, যা কার্যত মহামারীরই রূপ। সারাদেশে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হওয়ার পরও হামকে মাহামরী হিসেবে ঘোষণা না করা শিশুদের মৃত্যুকে উপহাস করার সামিল।
সরকারিভাবে এখন টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাসে আনা হয়েছে এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকাদান শুরু হবে বলেও ঘোষণা এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত দেরিতে কেন? যখন মার্চের মাঝামাঝি থেকেই সংক্রমণ বাড়ছিল, যখন হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছিল, তখন কেন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হলো না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, যথার্থই বলেছেন, ‘আমি দাবি জানাচ্ছি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। রাজনৈতিক দোষারোপ নয়, প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি দরকার। কখন থেকে ব্যবস্থাটি ভাঙতে শুরু করল? কে জানত? কী করা উচিত ছিল কিন্তু করা হয়নি? সরকারি ভাবে না হলে, বেসরকারি ভাবে এই তদন্ত হওয়া দরকার।’
সত্যিকার অর্থেই দ্রুত হামে মিশু মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। কারণ, এখানে যে মৃত্যু ঘটছে, তা কোনো অজানা রোগের কারণে নয়। এটি এমন একটি রোগ, যার প্রতিরোধ বহু আগেই আমাদের হাতে ছিল। এই মৃত্যু তাই প্রাকৃতিক নয়—এটি মানবসৃষ্ট, অবহেলাজনিত।
সবচেয়ে করুণ সত্য হলো, যারা মারা যাচ্ছে তারা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। টিকা দেওয়া বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি, তারা কোনো ভুলও করেনি। তাদের একমাত্র অপরাধ—তারা এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ একসময় বিশ্বকে দেখিয়েছিল কীভাবে সীমিত সম্পদ নিয়েও একটি কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি গড়ে তোলা যায়। আজ সেই দেশই যদি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের হারায়, তবে তা শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি একটি জাতীয় লজ্জা।
সরকার শুধু বিগত দুই সরকারের ওপর দোষ দাপিয়েই দায়মুক্ত হতে পারবে না। এই মুহূর্তে প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং সর্বাত্মক উদ্যোগ। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে, স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঠে নামাতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে, এই সংকট থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো প্রতিরোধযোগ্য রোগ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, অপারেশনাল প্ল্যানগুলো স্থায়ী ও কার্যকর করতে হবে, এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত, একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: এই এতগুলো শিশু মৃত্যুর দায় কে নেবে?
যদি আমরা এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজি, যদি আমরা জবাবদিহি নিশ্চিত না করি, তবে এই সংখ্যা এখানেই থামবে না। আর প্রতিটি নতুন মৃত্যু আমাদের ব্যর্থতার আরেকটি প্রমাণ হয়ে থাকবে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের সুরক্ষায়। সেই পরীক্ষায় আমরা আজ ব্যর্থ। এখনই সময়, এই ব্যর্থতাকে স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটার। নইলে ইতিহাস শুধু আমাদের ভুলগুলোই মনে রাখবে—আর সেই স্মৃতির কেন্দ্রে থাকবে এই শিশুদের অকাল মৃত্যু।
এজন্য দায়ী—নীতিনির্ধারক, প্রশাসক, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা—তাদের প্রত্যেককে জবাব দিতে হবে। জনস্বাস্থ্যকে রাজনীতির বাজারের পণ্য বানানো যাবে না। আজ না থামলে আগামীকাল আরও ভয়াল মহামারী আসবে, আরও শিশু মারা পড়বে। এই মৃত্যুর পরোয়ানা বন্ধ করতে হবে এখনই। শিশুহত্যার এই মহাপাপের বিচার হোক। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে মিশু মৃত্যু প্রতিরোধে সমন্বিত ও সর্বাত্মক ব্যবস্থা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।