Published : 21 Feb 2026, 09:05 PM
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা ছিল ঢাকার মানুষের কাছে এক অকল্পনীয় ব্যাপার। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের সংখ্যা লোকমুখে এক অস্বাভাবিক স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে পুলিশের গুলিবর্ষণের ফলে ঠিক কতজন হতাহত, বিশেষ করে কয়জন শহীদ হয়েছিলেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তের আকরে লেখা আছে আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবদুল জব্বার ও শফিউর রহমানের নাম। একুশে ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে ঢুকে গুলি চালালে ঘটনাস্থলে নিহত হন রফিক ও জব্বার। বরকত মারা যান ওই দিন রাত ৮টায়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলিবিদ্ধ হলেও সালাম মারা যান ৭ এপ্রিল। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে নবাবপুর রোডে গুলিবিদ্ধ হন শফিউর। ওই দিনই সন্ধ্যা ৭টায় মারা যান তিনি।

রফিক উদ্দিন আহমেদ বায়ান্নর ভাষা আন্দোললেন প্রথম শহীদ। পুলিশের গুলি তার মাথায় লাগে। তাতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিহত হন। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ১৭ নম্বর কক্ষের পূর্ব দিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ২৬ বছর বয়সী রফিক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের হিসাব বিভাগের ছাত্র। পাশাপাশি পিতা আবদুল লতিফের প্রেসের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে। ওইদিন রফিকের মরদেহের ছবি তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক মীজানুর রহমান এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের আলোকচিত্রী আমানুল হক। রফিকের মরদেহের ছবি মীজানুর তোলেন ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে। আর আমানুল তোলেন এনাটমি হলের পেছনের একটি গোপন কক্ষে।

পুলিশ যখন ছাত্রবাসে ঢুকে গুলি চালায় তখন মীজানুরের পাশেই ছিলেন রফিক। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানেই বক্স ক্যামেরায় রফিকের ছবি তোলেন মীজানুর। রফিকের মরদেহ একটি গোপন কক্ষে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এই খবর আমানুল হক পান প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের কাছে। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুনের সহযোগিতায় সেই গোপন কক্ষে ঢুকে আমানুল তার জাইস আইকন ক্যামেরায় রফিকের ছবিটি তোলেন। ফিল্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় ওইদিন রফিকের ছবি তুলতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও শৌখিন আলোকচিত্রী রফিকুল ইসলাম, তিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছিলেন। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ভাষ্যে পাওয়া যায় শহীদ রফিকের অন্তিম মুহূর্তের বর্ণনা। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গেছে, সেখান থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে; মগজ গলে পড়ছে। লাশটা জরুরি বিভাগে না রেখে একটি গুদাম ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। গুমের উদ্দেশ্যেই ওখানে রাখা হয়েছিল লাশটা।
পুলিশের গুলিতে যে হত্যার ঘটনা ঘটে তা তৎকালীন সরকার অস্বীকারের চেষ্টা করে। নানাভাবে প্রচার করে, ছাত্রদের ওপর উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুলি চালানো হয়নি। গুলি চালানো হয়েছে আসলে পাল্টা প্রতিরক্ষার জন্য। ছাত্র হত্যার ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে সময় অস্বীকারের যে বয়ান তৈরি করে সেই বয়ানকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয় আমানুল হক আর মীজানুর রহমানের ছবি।

শহীদ আবুল বরকত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র। যখন গুলি চালানো হয় তখন তিনি ছিলেন মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ২০ নম্বর ব্যারাকে। তার ঊরু ও তলপেটে গুলি লাগে। রক্তে তার নীল রঙের হাফশার্ট ও খাকি প্যান্ট ভিজে যায়। ছাত্ররা যখন বরকতের রক্তাক্ত দেহ ধরাধরি করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান তখন আলোকচিত্রী আমানুল হক হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো। ক্রোধে, ক্ষোভে ছাত্ররা চিৎকার করে বলছে, ‘ওরা গুলি করেছে, ওরা মেরে ফেলেছে।’ ছাত্রদের ওই দলে ছিলেন রফিকুল ইসলাম ও মর্তুজা বশীর। বরকতের শরীর থেকে কলকল করে রক্ত বের হচ্ছে। গুলির ব্যথায় কাতর বরকত বারবার পানি পানি করছিলেন। তার সারা মুখে বৃষ্টির ফোটার মতো ঘাম। স্পষ্ট করে বললেন, ‘আপনারা পুরানা পল্টনে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে খবর দেন। ওখানে আমার বোন আর ভগ্নিপতি আছেন।’ রফিকুল ইসলাম কার যেন একটা সাইকেল নিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে যান। বরকতের ভগ্নিপতি বাড়িতে নেই, তাই বোনকে খবরটা দিলেন। সন্ধ্যায় হাসপাতালে আসেন তার ভগ্নিপতি। রাতে অপারেশন থিয়েটারে মারা যান বরকত।

আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর অঞ্চলের বাবলা গ্রামে। তার ডাকনাম আবাই। তার পিতার নাম শামসুদ্দিন ও মায়ের নাম হাসিনা বেগম। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে বরকত ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মামার বাসা বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে থেকেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে তার বড় বোন ও ভগ্নিপতিও থাকতেন।
৩৩ বছর বয়সী আবদুল জব্বার ছিলেন কৃষক। তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে। তিনি তার অসুস্থ মাকে নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসেছিলেন। মাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হুরমত আলীর কক্ষে উঠেন। হুরমত আলী মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ২০ নম্বর শেডের ৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন। একই এলাকার মানুষ হওয়ার সুবাদে হুরমত আলীর কক্ষে ওঠেছিলেন আবদুল জব্বার। বাইরে গন্ডগোল হচ্ছে শুনে ব্যারাক থেকে বের হয়ে একটু এগিয়ে যেতেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান ওই ব্যারাকেরই তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সিরাজুল হক ও ফজলে রাব্বি। ফজলে রাব্বির ভাষ্য, ‘২০ নম্বর ব্যারাকের সামনে রক্তাক্ত, লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তিকে আমি এবং কয়েকজন হাসপাতালে নিয়ে যাই। তাকে ছাত্র মনে হয়নি। কোনো চিকিৎসা দেওয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটে।’ সিরাজুল হকের বক্তব্যেও পাওয়া যায় অজানা তথ্য। জব্বারের রক্তে সিরাজুল হকের জামাকাপড় ভিজে যায়। তিনি তার রক্তভেজা শার্ট আর পায়জামা বারান্দার চালের বাতায় লুকিয়ে রাখেন যাতে পুলিশ এগুলোর সন্ধান না পায়।
পায়ে গুলি লাগে আবদুস সালামের। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাসের বেশি সময় ভুগে ৭ এপ্রিল তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। সালামের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে। বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি সালাম। দাগনভূঞা আতাতুর্ক হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে ওঠে আর্থিক অনটনে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল থেকে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে ‘পিয়ন’ পদে চাকরি করতেন। থাকতেন আজিমপুরের পলাশী ব্যারাকের ৩৬/বি নম্বর কোয়ার্টারে থাকতেন। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও মাতৃভাষার এই আন্দোলনে শামিল হয়ে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তপাতের ঘটনায় পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জমায়েত হয়। পুরনো কলা ভবনের ছাদে উড়ানো হয় কালো পতাকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা। শহীদের রক্তমাখা জামাকাপড় পতাকার মতো ঝুলিয়ে হাজার হাজার মানুষ যোগ দেয় প্রতিবাদী মিছিলে। ওইদিন পুরনো হাইকোর্ট, নবাবপুর, রথখোলা, বংশাল, সদরঘাট ও জনসন রোড এলাকায় মিলিটারি গুলিবর্ষণ করে।

২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ৬ রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে করে হাইকোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন শফিউর রহমান। তিনি চাকরি করতেন হাইকোর্টের হিসাবরক্ষণ শাখায়। সাড়ে ১০টার দিকে নবাবপুর রোডে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে ফের গুলি চলে। পুলিশের গুলি শফিউরের পিঠে এসে লাগে। গুলিতে তার শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার অ্যালিনসন তার অপারেশন করেন। কিন্তু গুলির আঘাতে কলিজা ছিঁড়ে যাওয়ায় অপারেশন ব্যর্থ হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় অসীমে পা বাড়ান শফিউর।