Published : 03 Sep 2025, 05:49 PM
ভোরের আলো ফুটেছে। গ্রামের ধুলোমাখা কাঁচা রাস্তা। মাথায় ধানের আঁটি নিয়ে ফিরছেন কৃষক আবদুল হক। রাতভর ক্ষেতে পাহারা দিয়েছেন। সকালে একটু ক্লান্ত, তবু মুখে হাসি। এই ধানেই জুটবে সংসারের ভাত। এই ধান বিক্রির টাকায় চলবে ছেলের পড়াশোনা। তবু মনে ভয়, বাজারে যদি দাম না মেলে?
এই গল্প একা আবদুল হকের নয়। এ গল্প বাংলাদেশের লাখো কৃষকের। তারা শুধু নিজেদের সংসারই চালায় না। তারা পুরো জাতিকে খাওয়ায়। তাদের ঘাম আর ত্যাগেই দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের অর্থনীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)–এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কৃষি বাংলাদেশের জিডিপিতে অবদান রাখছে প্রায় ১২ শতাংশ অথচ শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, কৃষি শুধুই অর্থনীতির একটি খাত নয় এটি কর্মসংস্থানের প্রধান ভরকেন্দ্র। ধান, পাট, আলু, গম, ডাল, সবজি—এসব উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম। ইলিশ তো প্রকৃতিতে হয়, অন্যান্য মাছের চাষ হচ্ছে বহু বছর ধরে এবং মাছ উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
তবে গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুদ্র শিল্প, হস্তশিল্প, পশুপালন, কুটির শিল্প এবং রেমিটেন্সও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচির আওতায় নাটোরের ভেষজ, কুমিল্লার তাঁত, খুলনার কাঁকড়া কিংবা কুমিল্লার রসমালাই জাতীয় অর্থনীতিতে স্বতন্ত্র অবদান রাখছে। আবার নারী উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ছোট ব্যবসা শুরু করছেন। আসমা বেগম নামে নওগাঁর এক নারী নিজের বাড়িতে আচার বানানো শুরু করেছিলেন মাত্র ৫ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে। আজ তিনি তার গ্রামের আরও ২০ নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছেন। এ ধরনের গল্প গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি বাড়িয়ে দেয়।
রেমিটেন্সও গ্রামীণ জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যার বড় অংশই গেছে গ্রামীণ পরিবারে। রিপন হোসেন নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক প্রবাসী মালয়েশিয়ায় শ্রম দিয়ে যে টাকা পাঠান, তা দিয়ে তার গ্রামে স্কুলঘর তৈরি হয়েছে। ফলে শত শত শিশুর পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল বিপ্লব গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। কুমিল্লার কৃষক মনিরুল ইসলাম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ফসলের বাজারদর জানেন, সরাসরি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, “আগে দালালের হাতে সব বিক্রি করতে হতো, এখন আমি ঢাকায়ও ক্রেতা পাই।” এভাবে প্রযুক্তি গ্রামীণ জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ অর্থনীতি আসলে এক বহুমাত্রিক কাঠামো যেখানে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, কুটিরশিল্প, রেমিটেন্স, ডিজিটাল সেবা—সবকিছু একত্রে মিশে আছে। আবদুল হক কিংবা আসমা বেগমের মতো সাধারণ মানুষরা এই অর্থনীতির আসল নায়ক। তাদের ঘাম, শ্রম আর সংগ্রামকে যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় তবে গ্রামীণ অর্থনীতি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সংকট ও চ্যালেঞ্জ
শরীয়তপুরের কৃষক কায়েসউদ্দিন কয়েক বছর ধরে নদীভাঙনের শিকার হচ্ছেন। এক সময় তার চার বিঘে জমি ছিল, এখন সেটি গিলে নিয়েছে পদ্মা। বাধ্য হয়ে তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। কয়েক মাস আগে তিনি ধান ফলালেও আকস্মিক বন্যায় সব ভেসে যায়। বাজারে গিয়ে ক্ষতির কথা বললে দালালরা আরও কম দামে কিনতে চায়। কায়েসউদ্দিনের হতাশা যেন আজকের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি অথচ এই মানুষগুলোর শ্রমেই দেশের খাদ্য আসে অথচ তাদের জীবনই সবচেয়ে অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি একদিকে প্রবৃদ্ধির মেরুদণ্ড অন্যদিকে অসংখ্য সংকটে জর্জরিত। প্রথম বড় সংকট হলো অবকাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো প্রায় ৩৫% মানুষ কাঁচা রাস্তার ওপর নির্ভরশীল। বাজারে কৃষিপণ্য আনার জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন নেই, ফলে উৎপাদিত সবজির ২০–২৫% নষ্ট হয় (এফএও, ২০২২)। ঘনঘন লোডশেডিং কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম ব্যাহত করে। আবার ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল অর্থনীতির সুবিধা অনেকেই নিতে পারছেন না।
দ্বিতীয় বড় সংকট হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অভাব। বাংলাদেশে গড় কৃষিজমির পরিমাণ প্রতি পরিবারে মাত্র ০.৫২ হেক্টর (বিবিএস, ২০২২)। এই ক্ষুদ্র জমিতে উৎপাদন বাড়াতে হলে উন্নত বীজ, স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, কৃষি যন্ত্রপাতি দরকার। অথচ কৃষি গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৩%। এর ফলে কৃষকরা ফসলের রোগবালাই কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তনে দিশেহারা হয়ে পড়েন।
তৃতীয় বড় সমস্যা হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২–৩টি বড় বন্যা হয়, যা প্রায় ৩০–৪০% কৃষিজমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে (বিশ্ব ব্যাংক, ২০২১)। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন ১০–১৫% কমে যাচ্ছে। রুহুল আমিনের মতো হাজারও কৃষক এই বাস্তবতায় দিশেহারা। তারা জানে না আগামী মৌসুমে কী ঘটবে।
চতুর্থ সমস্যা হলো বাজারব্যবস্থার অনিয়ম ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম ঠিক করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। কৃষক ক্ষেতে ধান বিক্রি করেন ৬০০ টাকা মণ দরে, কিন্তু ভোক্তা ওই চাল কিনছেন দ্বিগুণ দামে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর ২০২১ সালের রিপোর্ট বলছে, কৃষকের উৎপাদিত শাকসবজির প্রায় ৬০% লাভ ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই দালালদের হাতে চলে যায়। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না, যা তাদের কৃষিচর্চা থেকে নিরুৎসাহিত করে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। দেশের এসএমই ঋণের অধিকাংশ বিতরণ করা হয় শহরে অন্যদিকে গ্রামে বিতরণের হার সন্তোষজনক নয়। ফলে গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংকটে পড়ে যায়। অনেক সময় তারা চড়া সুদের মহাজনী ঋণ নেয় যা তাদের আরও দারিদ্র্যের ফাঁদে ঠেলে দেয়।
এছাড়া শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি গ্রামীণ অর্থনীতির বড় প্রতিবন্ধক। বাংলাদেশের জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার শহরে ৮১.২৮%, আর গ্রামে ৭১.৫৬%। কারিগরি শিক্ষায় গ্রামের অংশগ্রহণ ১০%–এরও নিচে। ফলে গ্রামীণ যুবকরা নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারে না। তারা শহরে পাড়ি জমালেও সেখানে কম মজুরির কাজেই আটকে থাকে।
নারীর অবদানের স্বীকৃতি না পাওয়া আরেকটি বড় সংকট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, কৃষির ২১টি ধাপের মধ্যে ১৭টিতেই নারীরা কাজ করে। কিন্তু তাদের প্রায় ৪৬% শ্রম অবৈতনিক। কৃষিঋণ নিতে গেলে নারীর নামে হলেও অধিকাংশ সময় পুরুষরা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে নারীরা আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারেন না। অথচ এই নারীরাই গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু, কিংবা হস্তশিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে রাখছে।
সবশেষে উল্লেখযোগ্য হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বৈষম্য। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে গ্রামে উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি কমছে। যারা থেকে যায়, তারা মূলত বয়স্ক বা কম দক্ষ শ্রমিক। ফলে নতুন উদ্যোগ নেওয়া যায় না। একই সঙ্গে গ্রামে ধনী–গরিব বৈষম্য বাড়ছে। কিছু পরিবার রেমিটেন্স ও ব্যবসার কারণে উন্নত হচ্ছে অন্যদিকে ভূমিহীন পরিবারগুলো দিনমজুরিতে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
এই সব সংকট মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ ও করণীয়
কুমিল্লার এক তরুণ কৃষক রহমত ইসলাম কয়েক বছর আগেও হতাশায় ভুগতেন। ধান চাষে খরচ উঠে আসত না, দালালদের হাতে ন্যায্য দাম মিলত না। কিন্তু সম্প্রতি তিনি স্থানীয় একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সবজি বিক্রি শুরু করেছেন। এখন তিনি সরাসরি ঢাকার ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন, দামও পান দ্বিগুণ। তিনি বলেন, “আগে শুধু ক্ষেতে হতো, এখন মোবাইল ফোনই আমার নতুন বাজার।” রহমতের এই গল্প আসলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি—সঠিক সুযোগ পেলে গ্রামের মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই বদলাতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনার ক্ষেত্র অসীম। প্রথমেই আসে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষি উদ্ভাবন। ড্রোন দিয়ে জমি পর্যবেক্ষণ, সেন্সরভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, জৈব সার, উন্নত বীজ, এবং স্মার্ট কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করলে উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। সঠিক প্রযুক্তি ও চাষাবিদ্যা অনুসরণ করলে হাইব্রিড ধান থেকে ‘প্রায় ২০% বেশি ফলন’ পাওয়া সম্ভব (দ্য ডেইলি স্টার)।
কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে। ধান, ডাল, গম, ফলমূল—এসব কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে যদি প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো যায়, তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বহুগুণ বাড়বে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে (কালের কণ্ঠ)।
আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো ই-কমার্স। ডেটারিপোর্টাল — গ্লোবাল ডিজিটাল ইনসাইটস অনুসারে, ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৭৭.৭ মিলিয়ন জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪.৫% এর মধ্যে গ্রামীণ তরুণরা দ্রুত অনলাইন বাজারে যুক্ত হচ্ছেন। কৃষিপণ্য অনলাইনে বিক্রি করলে শুধু ন্যায্যমূল্যই পাওয়া যায় না বরং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়—প্যাকেজিং, ডেলিভারি, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি মিলিয়ে নতুন তরুণ উদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়। গ্রামে এখন ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র আছে, যা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বাজারে প্রবেশে সহায়তা করছে।
ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পেরও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। নকশিকাঁথা, তাঁত, বাঁশ-বেত, চামড়া এসব শুধু ঐতিহ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও এগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি যদি বাস্তবায়ন হয়, তবে প্রতিটি গ্রাম থেকে অনন্য পণ্য বেরিয়ে আসবে। যেমন টাঙ্গাইলের শাড়ি, নকশিকাঁথা, নাটোরের ভেষজ, খুলনার কাঁকড়া। এগুলো বিশ্ববাজারে গেলে গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়বে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও শক্তিশালী হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কৃষি শ্রমের ৬৮% অংশীদার নারী। অথচ তাদের বড় অংশই অবৈতনিক শ্রম দিচ্ছেন। যদি নারীদের জন্য আলাদা ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন। নওগাঁর আসমা বেগম যেমন ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে আচার বানানোর ব্যবসা শুরু করে আজ গ্রামের আরও ২০ নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন—এটাই নারীর শক্তি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাও ভবিষ্যতের করণীয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল ধান, খরা সহনশীল ডাল, বন্যা সহনশীল ঘরবাড়ি—এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে মানুষ টিকে থাকতে পারবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, উইন্ড টারবাইন গ্রামে ছড়িয়ে দিলে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানো যাবে, আবার পরিবেশও রক্ষা পাবে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও বিনিয়োগ জরুরি। ইউনেসকো-এর ২০২১ সালের তথ্যমতে, গ্রামে টেকনিক্যাল শিক্ষায় অংশগ্রহণ ১০%–এর নিচে। যদি কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ানো যায়, তবে তরুণরা কৃষির বাইরেও আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোগে যুক্ত হতে পারবে। ইতিমধ্যেই গ্রামে বসে অনেক তরুণ আপওয়ার্ক বা বা ফাইভার–এ কাজ করছেন। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিও ধীরে ধীরে ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাও জরুরি। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই কৃষিপণ্য ক্রয়কেন্দ্র, ফসল বীমা, ফার্মার্স কার্ড, সমবায় ভিত্তিক উৎপাদনের মতো উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে। একইসঙ্গে ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ ভিশন গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অবশেষে বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মেরুদণ্ড। শহরের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সত্যিকার উন্নয়ন শুরু হবে গ্রাম থেকে। আবদুল হক ধান চাষ করে, কায়েসউদ্দিন নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে, মনিরুল ইসলাম ই-কমার্সে নতুন বাজার খুঁজে নেয়—এরা সবাই মিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চালনা করছে। যদি আমরা তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য দিই, প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী করি, তবে দেড় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে উঠতে পারবে।