Published : 31 Dec 2025, 01:03 AM
জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন কমিশন বলছে তারা প্রস্তুত। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বাস দিয়েছেন, এবারের নির্বাচন হবে একটি ‘সুন্দর’ নির্বাচন। এই ঘোষণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে প্রস্তুতির ব্যস্ততা। কোথাও নতুন জোটের হিসাব–নিকাশ, কোথাও পুরোনো সমীকরণে ভাঙচুর। কেউ দল গোছাচ্ছেন, কেউ দল ভাঙছেন, কেউ নতুন দলে ভিড়ছেন, আবার কেউ পুরোনো পরিচয় ছুঁড়ে ফেলছেন। এক কথায় রাজনীতি এখন পুরোপুরি গতিময়।
বড় দুই দলও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে তাদের মনোনয়ন তালিকা। তবে শেষ মুহূর্তের কাটাছেঁড়া আর বদল দলগুলোর ভেতরে ভেতরে নতুন অস্বস্তি ও জটিলতা তৈরি করছে। এটুকুই যদি বলা হয়, তাহলে সেটা হবে মোটা দাগের প্রতিবেদন—সংক্ষিপ্ত, নিরাপদ এবং খানিকটা নিরাসক্তও।
কিন্তু নির্বাচন মানে তো শুধু প্রস্তুতির খবর নয়। এর বাইরেও অনেক গল্প থেকে যায়। কিছু গল্প আছে উদযাপনের, কিছু দুঃখ আর হতাশার, কিছু প্রকাশ্য নীতিহীনতার, আবার কিছু এমন, যেগুলো যে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই তার অর্থ দাঁড়ায়। এই নির্বাচনের রাজনীতিও ঠিক তেমন, সংবাদে যা দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালেও আছে বহু প্রশ্ন, দ্বিধা আর অস্পষ্টতা।
এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি’
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের পরিচয় সংকটে ভুগছিল। দলটি জন্ম নেওয়ার পর থেকে মাঠের রাজনীতিতে নানান সূত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল পথে হাঁটেছে। জুলাই সনদ, গণভোট, মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন, আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণার দাবি—এসব ইস্যুতে দুই দলের অবস্থান ও কর্মসূচির ভেতরে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না।
তারপরও বাস্তবতা হলো, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীদের হাতে গড়া এনসিপির ওপর আস্থা রেখেছিলেন। কারণ, দলটি শুরু থেকেই ‘নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি’র কথা বলছিল। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া, সুশাসন প্রতিষ্ঠা আর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।
সেই আশা–ভরসার প্রেক্ষাপটেই বলা যায়, অবশেষে এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি’র নমুনা দেখতে পেল মানুষ। জামায়াতের নির্বাচনি জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তই আপাতত সেই নমুনা।
এই দেশে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর, ধর্মীয় রাজনীতির ধারক, পাকিস্তানপন্থি চিন্তা ও অবস্থানের উত্তরাধিকার—এই অভিযোগগুলো বহু বছর ধরেই জামায়াতকে ঘিরে আছে। সেই বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এনসিপিকেও এই সব কর্মকাণ্ডের দায়ভার ভাগ নিতে হবে।
এখানেই ভাঙনটা সবচেয়ে গভীর। নিজেকে ‘তরুণদের দল’ হিসেবে তুলে ধরা এনসিপির কাছ থেকে কেউই আশা করেনি যে, তারা নিজেদের রাজনীতিকে জামায়াতের কাছে কার্যত ইজারা দেবে। তাই অনেকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে তীব্র কটাক্ষ—‘নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি’ নয়, এটা ‘নতুন ইজারার রাজনীতি’।
এর ফলও চোখে পড়ার মতো। দেশের মানুষ হতাশ হয়েছে, আর সেই হতাশার ঢেউ সবচেয়ে জোরে আছড়ে পড়েছে এনসিপির ভেতরেই। দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মী প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছেন। সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ এনসিপির নারী নেত্রী ও সমর্থকদের কাছ থেকে। তাদের কাছে এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়, এটি আদর্শগত সংঘাত। সেই বেদনা ও ক্ষোভের ভাষাই যেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনের কথায় ধরা পড়ে—‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’
মান্নার মনোনয়নের হাসি–কান্না
পত্রিকার শিরোনাম—‘ঋণখেলাপির তালিকায় নাম স্থগিত, মান্নার নির্বাচনে অংশ নিতে আইনগত বাধা কাটল’। মান্নার সমর্থকরা, যারা তার প্রগতিশীল চিন্তাধারার ভক্ত, নিশ্চয়ই খুশিতে উদযাপন করছেন। মান্নাও নিশ্চয়ই নিশ্চিন্ত—বগুড়ার আসন থেকে বিএনপির অনুকম্পায় হয়তো অবশেষে তিনি জয়ের স্বাদ পাবেন। ছাত্র অবস্থায় তরুণদের ভোটে এত এতবার চাকসু-ডাকসুর ভিপি হয়েছিলেন, কিন্তু জাতীয় নির্বাচন প্রতিবারই তার সঙ্গে বৈরিতা করেছে।
কিন্তু সত্যিই কি উদযাপনের কিছু আছে মান্নার জন্য? যেখানে ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে হাসিনার লোকদের অনেকেই জেল খাটেছেন, সেখানে তিন মাসের জন্যই রেয়াত পাওয়াটা কি সত্যিই কোনো অর্জন? একজন প্রতিশ্রুতিশীল নেতা হিসেবে এটি দুঃখজনকই বটে। আমাদের দেশে রাজনীতি এখনো দ্বৈত মানদণ্ডের অধীনে চলে— যারা রাজনীতিতে শুদ্ধতার প্রবক্তা, তারা ঋণখেলাপি হবেনই-বা কেন?
তারেক রহমানের ব্রিটিশ গণতন্ত্রের দীক্ষা
ইউনূস সরকার আইনশৃঙ্খলা কতটা রক্ষা করতে পারছেন, সেটা এখানে টেনে এনে উপদেষ্টাদের বারবার লজ্জা দেওয়ার দরকার নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার যে আইনের বেআইনি প্রয়োগকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, সেটা উপেক্ষা করা যায় না। ফুটপাতে বসে সিগারেট টানার জন্য কয়জন তরুণীকে হেনস্তা পোহাতে হয়েছে! কয়েক জন লোক একজনকে ধরে থানায় আনলেই তাকে অপরাধী বিবেচনা করা হয়।
এবার দেখা গেল, তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে একজন শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন। যদি রাজনীতিবিদদের ‘চাদাঁবাজ’ বলার জন্য জেল যেতে হয়, তাহলে কমপক্ষে দেশের অর্ধেক মানুষই কারাগারে থাকতেন।
এক্ষেত্রে উদযাপনের খবর হলো শিক্ষক এ কে এম শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর তার মুক্তি চেয়ে বিএনপি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিজের মত প্রকাশের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা ও কারাগারে পাঠানো সঠিক হয়নি। এটি একদিকে দলের সাংবিধানিক দায়িত্ববোধের পরিচায়ক, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ।
আরও অনেকের মতো আমি আশঙ্কা করছিলাম, শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর দিনই বিএনপির কর্মীরা গিয়ে তার বাড়িঘরে ভাঙচুর করবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রয়োগ করে বিএনপি তা করেনি। আশা করি অন্যান্য বাড়াবাড়ির ক্ষেত্রেও বিএনপি সাধারণ জ্ঞান প্রয়োগ করবে। তারেক রহমান ব্রিটিশ গণতন্ত্র থেকে যদি কিছু দীক্ষা নিয়ে থাকেন, তা তার ও দেশের জন্য একটা বড় উপকারে আসবে।
আর ইউনূস সরকার? তারা হরদম লোককে থানায় ভরছে, ভৌতিক মামলায়। দেড় বছরে কিছু শিখতে পারেননি, আর বাকি দেড় মাসে কি শিখবেন—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।
রাজনীতিবিদদের ডিগবাজি
রাজনীতিতে 'নীতি' শব্দটা না থাকলেই বোধ হয় ভালো হতো। তাহলে আমাদের অনেক রাজনীতিবিদকে নিয়ে ডিগবাজির খবর লিখতে হতো না। মনোনয়ন নিয়ে ডিগবাজির তালিকা অনেক লম্বা, তবে ছোট করে লিখতে চেষ্টা করব।
নিজ দল 'বাংলাদেশ জাতীয় দল' বিলুপ্ত করে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, যাতে করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। আরেকজন দলীয় প্রধান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থও বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ভোলা থেকে নির্বাচন করছেন। তবে তিনি বাবার তৈরি দলটাকে এখনো বিলুপ্ত করেননি; ফন্দিফিকির খুঁজছেন কীভাবে নিজের প্রতীক বাদ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন।
কয়দিন আগেও যিনি ছিলেন নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, সেই মো. রাশেদ খাঁন, গণঅধিকার থেকে পদত্যাগ করে ভোট করছেন বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে। এতদিন পর তিনি সম্ভবত অনুভব করেছেন যে, গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি আরো ভালো দল। এলডিপির সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ান রহমানও একই পথ ধরে বিএনপি থেকে নির্বাচন করছেন।
এলডিপির চেয়ারম্যান বীর বিক্রম কর্নেল অলি আহমদও বসে নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমল থেকেই তিনি বিএনপির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এইবার নতুন করে নির্বাচনি হিসেব-নিকেশ করে যোগ দিলেন জামায়াত জোটে। এর আগে আরেক মুক্তিযোদ্ধা মেজর আখতারুজ্জামানও জামায়াতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই দুইজনকে ধিক্কার দিয়ে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা বললেন, 'মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দীর্ঘদিন জামায়াতকে রাজাকার বলে স্লোগান দিয়ে, আজ তারাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন!’
গণতন্ত্রের উদযাপন
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনেক রাজনীতিবিদের নাভিশ্বাস শুরু হয়ে গেছে। সবারই একই চিন্তা— কে কোথায় যাবেন, কার হয়ে নির্বাচন করবেন, যাতে করে নির্বাচনি বৈতরণীটা সহজ হয়। এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্তপর্ব মনে হয় সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে নাজুক অবস্থা, তাতে নির্বাচন কতটুকু 'সুন্দর' হবে কিংবা সুশৃঙ্খল হবে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ করেন। দেশের একটা বড় দলকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন হবে, তা কতটুকু অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এইসব নেতিবাচকতা বাদ দিলে নির্বাচনের অনেক ইতিবাচক দিকও আছে। যেসব দল অংশগ্রহণ করতে পারছে, তারা নির্বাচন নিয়ে দারুণ উজ্জীবিত; সবাই চাচ্ছে সংসদে যেতে।
যদি নির্বাচনকে সফল করে একটা কার্যকর সংসদ করা যায়, তাহলে আশা করা যায় ভবিষ্যতে আমাদের সকল সমস্যা সংসদে সমাধান করা হবে। তাতে নির্বাচনের পর শাহবাগের নৈরাজ্যবাদ, অবরোধ ও হৈচৈ বন্ধ হবে। পথচারীরা নিরাপদে হাঁটতে পারবেন, শাহবাগে গাড়ি চলবে নির্বিঘ্নে এবং হাসপাতালের রোগীরা নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন। আশা করা যায়, অচিরেই আমাদের মহামান্য সংসদ সদস্যরা সংসদে বসে দেশের সকল সমস্যার সমাধান করবেন এবং দেশের সাধারণ জনগণ গণতন্ত্রের জয়জয়কার উদযাপন করবেন!
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক