Published : 01 Jun 2026, 07:04 PM
সকালে নিয়ম করে হাঁটার সময়ে আমি পারতপক্ষে পুরো নির্দিষ্ট সময় শেষ করার আগে থামি না। চিকিৎসকের পরামর্শ, সকালের হাঁটাটা একটানা হওয়া উচিত। তার ভাষায়, “ধর্ম পালনের মতো নিবিষ্টতায় হাঁটবেন”। আমি সেটা মানার চেষ্টা করি। কিন্তু মুশকিল হলো, হাঁটার সময় চারপাশে এত কিছু চোখে পড়ে যে, না থেমে থাকাটাই বড় সংকট। বিশেষ করে সকালের আধো-ঘুম ভাঙা প্রকৃতি এত রূপ নিয়ে হাজির হয় যে, ওই সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলানো কঠিন।
এখন যেখানে হাঁটি, ওই হাঁটাপথে নানা বুনো ফুল, নানান জাতের অচেনা লতা-গুল্ম এমন অগোছালো থাকে যে, ওই আগাছা-গাছায় ভরা পথে চোখ পড়তেই নানা ঢঙের সব বৈচিত্র্যময়তা ধরা দেয়। এক সবুজই জ্বালিয়ে মারে! পাশাপাশি নানা সবুজ লতা-গুল্ম-পাতা, অথচ প্রত্যেক সবুজে এত ফারাক—নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সাধারণ চোখে প্রকৃতির সবুজের এত ভিন্নতা মনকে নানান ভাবনায় রাঙিয়ে তোলে। প্রকৃতি, সৃষ্টি, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে জেগে ওঠা বহুরকমের প্রশ্ন মনকে উত্তেজিত করে তোলে।
কদিন আগেই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ গেল। মানুষ সামর্থ্যমতো পশু কোরবানি দিয়েছে। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশাল অর্থনীতি। বহু বছর পর একটি নির্বাচিত সরকারের গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে দেশজুড়ে মানুষ উৎসবে মেতেছে, চাঙ্গা হয়েছে অর্থনীতিও। যদিও এ সময়ে হামে শত শত শিশুর মৃত্যু, সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল প্রাণহানি, বস্তিতে আগুন কিংবা ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট আমাদের পুড়িয়েছে; তবু রাজনৈতিক সংঘাতহীন এক পরিবেশে মানুষ প্রিয়জনের কাছে ছুটে গেছে। সরকারও মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেছে। ফলে প্রকৃতির কিছু বৈরিতাকে মেনে নিয়েও মানুষ সাধ্যমতো ঈদ উদযাপন করেছে।
যদিও আমার এক সংশয়বাদীরা বরাবরের মতোই প্রশ্ন তুলেছে, “বাইরের পশুকে কোরবানি দিলেও মনের পশুকে কি কোরবানি দিতে পেরেছে বিশ্বাসী মানুষ?” প্রশ্নটা অবহেলা করার মতো নয়। তবে এই উৎসবগুলোর উসিলাতেই মানুষের মনে দয়া-মায়া জাগে। মানুষ তার ভেতরের পশুকে দমন করে আরও ভালো মানুষ হওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালায়। আর এই চেষ্টার মধ্য দিয়েই তো মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চোখে পড়ল এক অভাবনীয় দৃশ্য। প্রায় অর্ধেক কেটে ফেলা এক গাছ থেকে প্রাণবন্ত, সজীব ও দীপ্তিময় কিছু কুঁড়ি আর কচি পাতা গজিয়েছে। দৃশ্যটি আমার মন ও ভাবনাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। হাঁটার গতি কমিয়ে মোবাইলে এর একটি ছবি তুললাম। তারপর ফেইসবুকে পোস্ট করে লিখলাম, “একটা ছবি অনেক কথা। ছবিটা দেখে আপনার মনে কি কোনো ভাবনা জাগছে? সেই ভাবনাটা শেয়ার করবেন প্লিজ।”
আমাকে অবাক করে দিয়ে অনেকেই মন্তব্য করলেন। বুঝলাম, ফেইসবুক বন্ধুদের মন এখনো মরে যায়নি। ঈদের ছুটির আমেজেও এই ছবি দেখে তাদের মনে নানামুখী জীবনদর্শন জেগে উঠেছে। এক কবিবন্ধু মন্তব্য করলেন, “মাথাভাঙ্গা বীর/হইও না অধীর—/নূতন কুড়ি গজাবেই/তোমার বাগান/ কারা যেন সাজাবেই।”
উনিশ শতকের রেনেসাঁ নিয়ে কাজ করা এক প্রাবন্ধিক বন্ধু বেশ গভীর ভাব নিয়ে লিখলেন, “‘ছবি কথা কয়’—প্রবাদ আছে। কথাটার অর্থ কী? আমরা সমাজ থেকে কেবলি গ্রহণ করি! দিই কী কিছু? দায় কী আছে এই জগতের কাছে? এ জিজ্ঞাসা সহজ হয়তো, কিন্তু তার মর্ম কথা সহজ নয়! আমরা যারা এই জগৎ বিষয়ে উদাসীন, তারা কেবলি নিই! আর মনে মনে, কখনো-বা প্রকাশ্যে বলি— এ সমাজ আমাকে কী দিয়েছে? সমাজবিজ্ঞানী মর্গান এই মনকে বলেন 'অকৃতজ্ঞ'! এই মনই আসলে বন্ধ্যা— অন্ধ! কিন্তু যে-মন তা নয়, সে মনই আপনার অস্তিত্ব বিলীন করেও দিয়ে চলে জগতকে! দিয়ে সে তৃপ্ত হয় না! বলে—তোমায় এত যে ভালোবেসেছি, তবু আরো কেন ভালোবাসতে পারে না হৃদয়! ওই যে না দেবার প্রবণতা ও অকৃতজ্ঞতা— এই থেকেই এই নত মন বলে— বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় ‘তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’ এই হচ্ছে দায়ের জিজ্ঞাসা! আসল কথাটা কী? আসল কথাটা এই যে, নির্দয় হওয়া অমানবিক, কিন্তু কর্তব্যে নির্মমতা মানবিক! এটা বুঝতে হলে ভিতরে আলো চাই! আর সেটা স্বাভাবিকভাবে আসে না, ডেকে আনতে হয়।”
বন্ধুর এই মননশীল ভাবনা আমার ভেতরেও দোলা দিল। একটি উদীয়মান কুঁড়ি যে এত গভীর জীবনবোধের জন্ম দিতে পারে, তা ভেবে মন আনন্দে ভরে উঠল। অন্য বন্ধুদের মন্তব্যগুলোও ছিল দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক। কেউ লিখলেন, এই ছবি প্রকৃতির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা প্রকাশ করে—গাছ কেটে ফেললেও তার ভেতরের জীবনশক্তি শেষ হয় না। আরেকজন লিখলেন, “হতাশ হওয়া যাবে না। স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। অসম্ভব বলে কোন শব্দ নেই।” অন্যজনের মনের ভাবনা হচ্ছে, “সম্ভাবনা অপার, অবহেলিত কিছু থেকেও অনেক বড় কিছু হতে পারে, যা হয়ত কেউ কল্পনাও করেনি। আপাতদৃষ্টিতে শেষ হয়ে গেছে দেখালেও, অপার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া ঠিক না।” কারও মন্তব্য ছিল, টিকে থাকার লড়াই অসম্ভবকে সম্ভব করে, কিংবা ভেঙে পড়ার পরও জেগে ওঠা!
দেশে যখন পেট্রোল বোমার খতরনাক আক্রমণ চলছিল, তখন তার শিকার হয়েছিলেন আমার এক মানবদরদী বন্ধু। মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসা ওই বন্ধুর মন্তব্য ছিল, “দারুণ অর্থবহ এক ছবি। ধ্বংসের পরও নতুন প্রাণের সৃষ্টি, নতুন আশার আলো।” তার এই কথার রেশ ধরে অন্যরাও লিখলেন, শেষ বলতে কিছু নেই, প্রতিবন্ধকতা আসবেই, সর্বোচ্চ দিয়ে টিকে থাকতে হবে, যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরুর পথ তৈরি হয়, শূন্য থেকে শুরু করেও ভালো কিছু করা সম্ভব।
বাস্তবিকই জীবন যে এক হার না-মানা যুদ্ধ, এই ছবি যেন ওই ভাবনাই উসকে দিল। মন্তব্যের ঘরে উঠে এল ‘ফিনিক্স পাখি’, ‘Fighter’, ‘The Gaza situations!’, ‘Never give up! Fight to death’-এর মতো শক্তিশালী সব শব্দ।
ছবিটি অনেকের মনেই লড়াইয়ের জেদ আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা জুগিয়েছে। তবে আমার ভাবনা ছিল অন্য জায়গায়। চারপাশে যখন এত প্রতারণা, প্রত্যাশাভঙ্গ, নষ্ট রাজনীতি, দুর্নীতি, আর অবিচার—তখনো এই দেশের মানুষ জীবন নিয়ে এত ইতিবাচক স্বপ্ন দেখে কীভাবে? এর আসল উৎস কোথায়?
উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের দিকে তাকালাম। চোখে ভেসে উঠল ১৯৫২-এর ভাষার লড়াই, ১৯৬৬-এর স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। প্রতিটি সংগ্রামে সাধারণ মানুষের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এই দেশের মাটি রক্তে ভেজা, কিন্তু প্রতিবারই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা মাড়িয়ে এ দেশের তরুণরা নতুন স্বপ্নে জেগে উঠেছে। এই ইতিহাসই প্রমাণ করে, বাঙালির ডিএনএ-তেই ঘুরে দাঁড়ানোর বীজ বোনা আছে। এটাই এই জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। সে নুয়ে পড়ে, প্রতারিত হয়, কিন্তু কখনো হার মানে না। নতুন আশায়, নতুন প্রাণের সম্ভাবনায় সে বারবার জেগে ওঠে।
বাংলাদেশের কালজয়ী লেখক আহমদ ছফা তার অসামান্য উপন্যাস ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ’-এ আমাদের এই জাতীয় শক্তির রহস্য অনেক আগেই উন্মোচন করে গেছেন। বইটির একটি অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:
“গণকন্ঠ অফিস থেকে বেরিয়ে একরকম ঘোরের মধ্যে হেঁটে নওয়াবপুর রোডে চলে এলাম। বিপ্লবের সম্ভাবনা যখন অতলে তলিয়ে গেল, আমার স্বাদ-আহ্লাদ, স্বপ্ন-বাসনা সবকিছু তার সঙ্গে ছারখার হয়ে গেল। আমি অস্তিত্বের সবকিছু আগামী বিপ্লবের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলাম। আজকে অনুভব করছি, আমি গায়ে-গতরে তরুণ হলেও আমার ভেতরে বুড়ো মানুষের ইচ্ছে শক্তিও নেই। আমি হাঁটছি, কিন্তু কোন গন্তব্য নেই সামনে। অনেক সময়েই এমন হয়, মন নিজের ভেতর পাখা গুটিয়ে বসে থাকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যান্ত্রিকভাবে নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে।
নওয়াবপুর রোড থেকে হেঁটে গুলিস্তান চলে এলাম। ওখান থেকে বাসে চাপলাম। বাস শাহবাগ থামলে নেমে পড়লাম। সে সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে থাকতাম। তখন জিয়া হল মুজিব হল এগুলো জন্মায়নি। শাহবাগের পাশ থেকে আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের গোড়া পর্যন্ত সমস্ত জায়গাটা একদম ফাঁকা ছিল। শাহবাগ থেকে জাদুঘরের পাশ ঘেঁষে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার একটা চিকন রাস্তা ছিল। তখন গোটা কাঁটাবন এলাকা জুড়ে সারি সারি বস্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। কাঁটাবনের মসজিদটারও তখন জন্ম হয়নি। বাঁশের বেড়া এবং ঢেউটিনের একটা নামাজ ঘর ছিল। এই নামাজ ঘরের পাশ দিয়ে আরেকটি চিকন আলপথ মুহসিন হলের কোনায় গিয়ে ঠেকেছিল।
আমি শাহবাগের রাস্তা ধরে পশ্চিমমুখো হয়ে হেঁটে আসছিলাম। মনে মনে কাঁটাবন নামাজ ঘরটির সামনের পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে উঠবো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। হঠাৎ পথের উপর থেঁতলানো একটি বেগুন চারা দেখতে পেলাম। দেখে আমার বড় মায়া হল। আহা বেচারী বেগুনের শিশু চারাটি জুতোর তলায় থেঁতলে গিয়ে কী কষ্টই না জানি পেয়েছে। নিজের অজান্তে মাটিতে উপুড় হয়ে চারাটি তুলে নিলাম। কেনো এ কাজ করে বসলাম বলতে পারব না। হয়তো প্রাণবান জিনিসের অনুচ্চার আবেদন আমার ভেতরের কানে শুনতে পেয়েছিলাম। চারাটি হাতে নিয়ে পায়ে পায়ে আমি হোস্টেলে চলে গিয়েছিলাম। আমার পাতানো বোন শাহানা আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার হাতে ওটি কী? আমি বললাম, বেগুনের চারা। মানুষের পায়ের তলায় পড়ে থেঁতলে গিয়েছে। শাহানা বলল, আপনি থেঁতলানো বেগুনচারা দিয়ে কি করবেন? আমি বললাম, এটা দেয়ালের বাইরের কার্নিশের নীচে যে মাটিটুকু আছে সেখানে লাগিয়ে দেব। তুমি এক বদনা পানি দাও। শাহানা পানি এনে দিল। আমি দেয়ালের ওধারে গিয়ে চারাটা একটুখানি গর্ত করে পুঁতে দিলাম। আহা, হতভাগী শাহানা! আজকের দিনে তোমার চোখে চোখে তাকানোর ক্ষমতাও আমার নেই। আমার সঙ্গে যদি তোমার পরিচয় না হত হাবিবের সঙ্গে তোমার বিয়ে হতো না। হাবিব রোকেয়া হলের পাশে মোটরসাইকেল থেকে পড়েই মারা গেল। শাহানা বোনটি আমার, তোমার মন্দ ভাগ্যের জন্য আমার নিজেকে কেন দায়ী মনে হয়। আমি কি কখনো তোমার অকল্যাণ কামনা করেছি?
তারপরের দিন ভোরবেলা মর্নিং ওয়ার্ক সেরে আসার পথে কৌতুহলবশত দেয়ালের বাইরে চারাটি কেমন আছে উঁকি মেরে দেখলাম। অবাক কান্ড! দেখি চারাটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেছে। আমার মনে হল চারাটি লাজুক হাসি হেসে আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। এই থেঁতলানো চারাকে একটা রাতের মধ্যে এমন ভাবে উঠে দাঁড়াতে দেখে আমার ভেতরে একটা তোলপাড় হয়ে গেল। এই থেঁতলানো বেগুনের চারা যদি উঠে দাঁড়াতে পারে, আমারও তো হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার সম্ভাবনার সব পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। আছে, এখনো আমার আশা আছে। আমি আবার নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করতে পারি। গণকন্ঠ অফিস থেকে আসা অবধি আমার মনে একটা বেদনার অঙ্কুশ বর্ষার মতো ঝুলছিল। বিগত রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি। কেবল পায়চারি করেছি আর ভেবেছি কোথা দিয়ে কী ঘটে গেল। যেদিকেই তাকাই অন্ধকার দেখি। চারাটিকে এভাবে বেঁচে উঠতে দেখে আমার মনের পেশীসকল মনের ভেতর শিশুর হাত-পা ছোড়ার মত করে ঢেউ তুলতে লাগলো। এখনো আমি একেবারে আনকোরা তরুণ। যদি লেগে পড়ি কত কিছুই তো করতে পারি।”
শুভ কিবরিয়া লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক